যা দেখেছি যা বুঝেছি—৩০ || মনিরুল ইসলাম

অন্ন—বস্ত্র—বাস

আবির্ভাবের শুরুতে বৈরী পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য মানুষের মৌলিক চাহিদা ছিল অন্ন—বস্ত্র—বাসস্থান, পরে ‘সভ্য’ মানুষ যোগ করল শিক্ষা—স্বাস্থ্য—বিনোদন। অভাবী মানুষ খাদ্যভিক্ষা করলেও পোশাক এবং বসতির জন্য পথে নামে না। তবে বসন—বাসনের বঞ্চনাও তীব্র বেদনাদায়ক। যাক, প্রথম তিনটি যেহেতু মানবপ্রাণীর বেঁচে থাকার সাথে সম্পর্কিত, দশহাজার বছর পর এগুলি অর্জনে মানুষ এখন কী অবস্থায় আছে, একটু জানতে ইচ্ছা করে। আমার জ্ঞান হালকা, লেখাও তাই পাতলা হবে, তবে ভাল লাগবে।

খাদ্য

একদম আদিতে, পঁচিশ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের খাবার কী ছিল? আজকের শিম্পাঞ্জি যা খায়, তা—ই হয়ত: ফল পত্র পুষ্প বীজ চারা মূল নাটস্ সবজি পোকা মাছ মাংস। প্রথমদিকে কাঁচা, পরে সামান্য পুড়িয়ে। তবে প্রথম থেকেই মানুষ ছিল সর্বভূক। তারপর যখন তারা ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বে, স্থানীয় প্রাপ্যতা ও প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বৈচিত্র্য আনল আহারেÑবিশেষত তৈরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। 

দশহাজার বছর আগে শুরু করল কৃষিকর্ম: শিম ডাল গম বার্লি ছাগল গরু মাছ। আস্তেধীরে গড়ে উঠল রন্ধনশৈলী, যুক্ত হল মসলা পানীয় ও তৈজসপত্র। বৈচিত্র্য এল রান্নার উপকরণ ও প্রক্রিয়ায়, স্বাদ ও পরিবেশনে। খাদ্যগ্রহণে বাড়ল স্বাস্থ্য—সচেতনা, পরিবর্তিত হল জীবনদর্শন: ঊধঃ ঃড় ষরাব, হড়ঃ ষরাব ঃড় বধঃ। শুরু হয়ে গেল ধনী—গরিবের খানাপিনায় পার্থক্য। কারো দৈনিক খাদ্যব্যয় আধা—ডলার, কেউ জাফরান কোবেবীফ ক্যাভিয়ার বা ট্রুফেল দিয়ে একপ্লেট খাবার কেনে দশহাজার ডলারে। কেউ কেনে সহ¯্র ডলারে একবোতল পানীয়, কেউ পায় না একঅঞ্জলি সুপেয় জল। একদিকে অনাহার অর্ধাহারে বছরে মারা যায় এককোটি মানুষ, অন্যদিকে বছরে ১৩০ কোটি টন তৈরিখাবার বিনষ্ট হয় ‘বড়লোক’দের দ্বারা। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বন্টন এবং আহারের সময়ও এক—তৃতীয়াংশ খাদ্যের ওয়েস্টেজ হয়, যা পৃথিবীর ৮১৫ মিলিয়ন অভুক্ত মানুষ খেয়েও শেষ করতে পারবে না।

পরিচ্ছদ

বসন—ভূষণ—ফ্যাশনের কী অবস্থা? আদম—হাওয়ার পোশাক কি ছিল? অনাবৃত অবস্থায় স্বর্গচ্যুত হওয়ার পর লজ্জার জন্ম হল তাদের মনে, ফিগ—পাতা দিয়ে লজ্জা নিবারণ করল। পরে চরম আবহাওয়ায় দেহরক্ষার জন্য মানুষ পরিধান করল পশুর চামড়া ও পশম, বৃক্ষের পত্র বাকল ও ঘাসলতা। অনেক পরে এল অঙ্গালংকার ও পাদুকা, স্থান—কাল—লিঙ্গ—পেশা ভেদে প্রচলিত হল বাহারি বিচিত্র পোশাক।

আজকের দুনিয়াতে কিছু মানুষ আর দেহরক্ষার জন্য বেশভূষা ধারণ করে না, তারা করে বিত্ত বিলাস ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী। বড়লোকদের অঙ্গাবরণ ও দেহাভরণ ট্রেন্ড নিত্য দ্রুতপরিবর্তনশীল বলে এক্ষেত্রেও অপচয় হয় অকল্পনীয় অপরিমেয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে। অনেকে মিলিয়ন ডলারের পরিচ্ছদ পরে একদিন একবেলা, পরদিনই সে পাল্টিয়ে পরে নতুন আরেকটা। ভারতেই ইশা আম্বানির ওয়েডিং লেহেঙ্গার দাম নাকি পড়েছে মাত্র ৯০ কোটি রুপী! হীরামুক্তাস্বর্ণখচিত রেশমি বেহেস্তী পোশাকের বিপরীতে কারো গায়ে থাকে ছিন্নদীর্ণ অপর্যাপ্ত পরিধেয়। 

বসতি

দেখি তৃতীয় চাহিদা বাসস্থানের কি খবর। শুরুতে মানুষের স্বনির্মিত কোনো ঘর (ঐড়সব) ছিল না বলে পাহাড়ের গুহায়, গর্তে, গাছের আড়ালে ‘নিরাপদ’ আশ্রয়ে রাত কাটাত। চারলক্ষ বছর আগে শুরু করল বৃক্ষশাখা লতাপাতা খড় পাথর ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী গৃহনির্মাণ। কৃষিকর্মের সাথে শুরু হল স্থায়ী বসতি স্থাপন। প্রায় সব প্রাণী ‘ঘুমে’র জন্য একটা নিরুপদ্রব কুঠরি চায়। এই নিরাপত্তাবোধ এবং ঘুম ছাড়াও ঘরবাড়ির তৃতীয় প্রয়োজন হল ‘সন্তান উৎপাদন’। স্থলের এবং জলের প্রত্যেক প্রাণী প্রজনন মৌসুমে নীড় খোঁজে, ঘর বাঁধে। বুদ্ধিমান মানুষ বের করেছে চতুর্থ কারণÑবিশ্রাম তথা নির্বিঘ্নে প্রশান্তিময় অবকাশযাপন।  

এই গৃহাশ্রম হল একজন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় একান্ত নিজস্ব মৌলিক অধিকার। কিন্তু এজন্য একজন মানুষ, একটি দম্পতি বা পরিবারের কতবড় একটি আবাসনের প্রয়োজন, এই প্রশ্ন আমার প্রথম জাগে যখন ছাত্রজীবনে একটি ক্ষুদ্র খুপরিতে আমি পাঁচ বছর কাটিয়েছি। দ্বিতীয়বার প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠল যখন ব্রুনাইয়ের সুলতানের রাজপ্রাসাদ দেখি। পরবর্তীতে আমার ছেলেটার কথা ভেবে বাসা যখন একটা কিনলাম, তখন কোন ফাঁকে আমাকে বোকা বানিয়ে সে চলে গেল সাড়ে তিনহাতের ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে। চাকরির সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছে পৃথিবীর কয়েকটি রাজবাড়ি দেখার। এবার তাই মনে হল ‘ঘরবাড়ি’ নিয়ে কিছু চিন্তা করি, কিছু লিখি।

একজন মানুষের কতবড় বাড়ির প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা না গেলেও অনুমান করা যায়। বড়বাড়ি মালিকের নিরাপত্তা বাড়ায় না। যার চোখে ঘুম নেই, বড়ঘর বড়বিছানা দিয়ে তার ঘুম আসে না। প্রজনন প্রসবের জন্য তো ক্ষুদ্র সংকীর্ণ কোঠাই খোঁজে সব প্রাণী। সুতরাং নিরাপত্তা, ঘুম ও প্রজননের জন্য বড় পরিসরের বাড়ির দরকার নেই। এবার, অবকাশ ও বিনোদনের জন্য বাড়িটাকে বড় করা যায় কিন্তু কত বড়? আর অন্যসব কারণে যার মনে শান্তি নেই, বৃহদাকার সুবিস্তৃত বাড়ি দিয়ে প্রশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলেও তার মনে শান্তি প্রবেশ করাবে কীভাবে? সুতরাং মানুষ তার বাড়িটাকে বড় করে অন্য কারণেÑবিনোদন বৃদ্ধির জন্য। ভাল হয় যদি বিনোদন ও অবকাশযাপনের জন্য পুরো পৃথিবীটাকেই নিজের বাড়ি মনে করা যায়। তা করতে পারলে প্রকৃত নির্মল নিরুদ্বিগ্ন শান্তি আসবে মনে। সাধুরা কি সেজন্যই বানপ্রস্থে গমন করেন?

দুঃখ হল কোনো ঘরবাড়িই দীর্ঘদিন বসতিপূর্ণ থাকে না। কালের গর্ভে বিনষ্ট হয় অথবা অধিকাংশই কয়েক প্রজন্মের পর পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ঘরবাড়ি টিকে থাকলেও তৃতীয়—চতুর্থ প্রজন্ম আপনার কথা আর তেমন মনেও করবে না, সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার পারিপার্শ্বিক জীবন নিয়ে। আমার কতবড় বাড়ির প্রয়োজন, সেই বাড়িতে আমার কতকিছুর দরকার? এতকিছু করে কতদিন বেশি বাঁচতে ও কতটুকু বেশি উপভোগ করতে পারে মানুষ? বাড়ির নিরাপত্তার জন্য এতকিছুÑবাঙ্কার, সিসিটিভি, সশস্ত্র প্রহরীÑতবু সে মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে না।

মরক্কো এসে শুনি রাজার কোন শহরে কয়টি বাড়ি আছে, কেউ সঠিক বলতে পারে না। তবে আলিশান সুসজ্জিত বালাখানা দেখলাম রাবাত স্খিরাত কাসাব্লাঙ্কা মারাক্কেশ ফেজ তানজার নাদোর আগাদির ওজদা ও ইফরান শহরে, যাদের দৈনিক পরিচালন ব্যয় দশ লক্ষ ডলার। মাদ্রিদে স্প্যানিশ রাজার বসতবাড়ির আয়তন ১.৩৫ লক্ষ বর্গমিটার, যেখানে আছে ৩,৪১৮ কক্ষ। তিনবার সেখানে অতিথি হলাম রাজা—রানির দাওয়াতে। নবম শতাব্দীতে কর্ডোভার মুসলিম সুলতান মোহাম্মদ এর নির্মাণ শুরু করলেও সেখানে তিনি বসবাস করতে পারেননি। অনেকেই তার নিজের শখের নির্মিত বাড়িতে থাকার আগেই সাড়ে তিনহাত খোপে চলে যান। ১৫০ কোটি ডলারে ব্রুনাই সুলতান নির্মিত ‘ইস্তানা নুরুল ইমান’—এর আয়তন দুই লক্ষ বর্গমিটার, যার আছে ১,৭৮৮—কামরা। বাড়ি যত বড়ই হোক, রাষ্ট্রদূতের সাথে ঢুকে দেখি রাজার অডিয়েন্স রুম ছোট, অর্থাৎ কথা বলার জন্য মানুষ গৃহকোণই পছন্দ করে।

Related Posts