সত্যকে ভয় সকলেরই

১৬৪৪ সালের ২৪ নভেম্বর কবি জন মিল্টন ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন বাক স্বাধীনতায় সেন্সর বা বিধি—নিষেধ আরোপের বিরুদ্ধে। সেই সময় সবেমাত্র মুদ্রণ যন্ত্র বা ছাপার মেশিন আবিষ্কৃত হয়েছে। আর তখনই বৃটিশ সরকার আদেশ জারি করে যে কোনো কিছু ছাপার আগে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। তখন বিখ্যাত কবি জন মিল্টন দীর্ঘ অকাট্য যুক্তিসহ একটি বক্তৃতা দেন। সেই ভাষণটি এতই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয় যে পরে বই আকারে প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাপি এর চাহিদা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কেন? কোনোকালেই কোনো দেশের শাসক সংবাদপত্র বা যে কোনো পদ্ধতিতেই হোক অনেক মানুষের হাতে পৌঁছে এমন প্রক্রিয়াকে আটকে দিতে চেয়েছে। আজো চায়। ১৬৪৪ সালে জন মিল্টন যে যুগান্তকারী বক্তব্য দেন তার ১৪৭ বছর পর ১৭৯১ সালের ১৫ ডিসেম্বর আমেরিকার সংবিধানের প্রথম সংশোধনী গৃহীত হয়। পরে তা পৃথিবীর স্বাধীনচেতা মানুষদের কাছে অবিসম্বাদিত ফাস্টর্ এ্যামেন্ডমেন্ট হিসাবে পরিচিতি পায়।

পৃথিবীর মানুষের জানা ইতিহাসে বাক স্বাধীনতার অজুহাতে যাকে প্রথম মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়, তিনি সক্রেটিস। মৃত্যুদন্ড দিলেও তিনি অমরত্ব লাভ করেন। হেমলক বিষ যখন মেলিটাস, এনিটাস আর লাইকনের প্রতিনিধিরা সক্রেটিসের হাতে তুলে দেয়, তিনি বলেছিলেন, ‘এদের ক্ষমতা এতটুকুই যে এরা মৃত্যুর আগে মৃত্যুদন্ড দিতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পরে আমার অমরত্ব ঠেকানোর ক্ষমতা তাদের নেই।’

ক্ষমতাসীনরা মানুষের মুখকে ভয় করেছে। লেখনিকে ভয় করেছে। বুদ্ধিকে ভয় করেছে। যখন ছাপার মেশিন আবিষ্কৃত হলো, তখন সেই যন্ত্রটিই হয়ে উঠল তাদের শত্রু। কারণ মুখের কথা সেইকালে পৌঁছত সীমিত সংখ্যক মানুষের কছে। মুদ্রিত কাগজ ছাপা হতো অনেক কপি। মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর এর প্রথম সুবিধা নেন ধর্মপ্রচারকরা। ধর্ম প্রচারের জন্য ধর্ম গ্রন্থ ছেপে ছড়িয়ে দেয়া শুরু হয়। এরপর আসে খবর প্রচারের বিষয়টি। খবর হিসাবে যেমন প্রাধান্য পেত ঘটনা—দুর্ঘটনা, তেমনই শাসকদের ভুলত্রুটি এবং দুনীর্তি বা স্বজনপ্রীতি। 

এর পরের ইতিহাসে সুন্দর সুন্দর কথা সংযোজিত হয়েছে, রেনেসাঁস, যুক্তির যুগ (এজ অব রিজনস), সংস্কৃতিবান হওয়ার যুগ (এজ অব এনলাইটেনমেন্ট), ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য। তার অর্থ সহজ ভাষায় এমনটিই হওয়ার কথাঃ মানুষ এগিয়েছে। মানুষ সত্যিই কি এগিয়েছে? সত্যিই কি তাদের সংকীর্ণতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, ঈর্ষা, দ্বেষ অবলুপ্ত হয়েছে? কিংবা নিদেনপক্ষে কমেছে? না কিছুই কমেনি। মানুষ যেমন ছিল তিন হাজার বছর আগে, তেমই আছে। কেবল যেসব দেশে কঠোর অবদমন এবং আইনের শাসন চালু করা গেছে, যেসব দেশে পুলিশি এবং গোয়েন্দাগিরি আঁটসাট সেসব দেশকে আমরা বলি সভ্য দেশ। সুযোগ পেলে আমেরিকার মত দেশে মানুষ কতটা জান্তব হয়ে উঠতে পারে তার একটি বড় উদাহরণ ১৯৭৭ সালে ইলেকট্রিসিটি আউটেজের সময় পৃথিবী দেখতে পেয়েছে। আর প্রতিদিনই এই ধরনের ঘটনা ঘটছে পৃথিবীজুড়ে। অতএব মানুষ না হয়েছে সম্মিলিতভাবে সভ্য না হয়েছে সংস্কৃতিবান। একক ব্যক্তি নিশ্চয় আছেন।

গণতন্ত্রের প্রসঙ্গটি এর মধ্যেই আছে। কেউ চায় না তার দোষত্রুটি নিয়ে অন্যরা কথা বলুক। শাসকর তো চায়ই না। কিন্তু অন্যদের হাতে ক্ষমত না থাকলেও শাসকদের হাতে সেই ক্ষমতা থাকে। ফলে শাসকরা তা ব্যবহারও করে। এমন কি এই ফাস্টর্ এমেন্ডমেন্টের দেশ আমেরিকাতেও তার অপব্যবহার করে।

এদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই যে কৌশল ব্যবহার শুরু করেন, তাহলো তাকে যাতে কেউ ব্যর্থ বা অপশাসক বলতে না পারে তার জন্য সংবাদ মাধ্যমগুলো ‘ফেক’ বলে উল্লেখ করতে থাকেন। তার বা তার পলিসির বিরুদ্ধে কথা বলা মিডিয়াকে ‘ফেক’ বলে তাদের শত বছরের ঐতিহ্যকে, লিগেসিকে এবং ইন্সটিটিউশন হওয়ার গৌরবকে ধূলিসাৎ করার উদ্যোগ নেন।

এই সাথে বলে নেয়া প্রয়োজন যে, আমেরিকার স্বনামধন্য ও প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমগুলোও যে নিষ্কলুষ বা ‘সদা সত্য কথা বলিব’র মত নীতিবান তা নয়। অনেক খবর তারা নিজেদের স্বার্থে নিজেদের মত করে টুইস্ট করে, সে কনজার্ভেটিভই হোক আর লিবারেলই হোক। ইসরাইল—প্যালেস্টাইন সম্পর্ক আর সে কালের সোভিয়েট নীতি বা কম্যুনিস্ট নীতি নিয়ে তারা ধারাবাহিকভাবে মিথ্যাচার করে তাদের পাঠকদের বা শ্রোতা—দর্শকদের সাথে প্রতারণা করে গেছে, আজো যাচ্ছে। তবে স্বীকার করতে হবে পৃথিবীর অন্য দেশের হাজারো সংবাদ মাধ্যমের সাথে তুলনা করলে নিঃসন্দেহে আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই বিশ্বাসযোগ্য যোগ—বিয়োগ শেষে।

তবে বর্তমান প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদের ‘ফেক’ নিউজ আর দ্বিতীয় মেয়াদের অতি সম্প্রতিকালের তিনটি প্রধান সংবাদমাধ্যম সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাউকে হোয়াইট হাউজে নিষিদ্ধ ঘোষণাকে কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না। কোনো সংবাদ মাধ্যমেরই কারো চরিত্র হননমূলক মিথ্যা খবর দেয়ার অধিকার নেই। এর জন্য এদেশের আইন আছে। কেন প্রেসিডেন্ট আইনের আশ্রয় না নিয়ে এইসব স্বনামধন্য সংবাদ মাধ্যমকে হোয়াইট হাউজের চত্বরে নিষিদ্ধ করলেন, তার কোনো উত্তর কারো জানা নেই। তবে এসোসিয়েটেড প্রেস বলছে, তিন—চতুর্থাংশ আমেরিকান বলছে এদেশে প্রেস—ফ্রিডম অত্যন্ত কিংবা খুবই জরুরী। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী অর্ধেক আমেরিকান মনে করে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার যদি প্রেসের স্বাধীনতায় কড়াকড়ি করে, তাকে তারা সমর্থন করবে। এসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী আমেরিকার প্রেস ফ্রিডম বিষয়ে ডেমোক্রেট এন্ড লিবারেলরা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থানে। তবে তারাও ধোয়া তুলসি পাতা নয়।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে, সত্যকে সকলে ভয় পায়। যারা শাসক তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। তার চেয়েও বেশি ভয় পায় যারা দুনীর্তিপরায়ণ কিংবা যাদের দুর্বলতা আছে। যদি সকলেই রবীন্দ্রনাথের মত বলতে পারতঃ সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,/ সে কখনো করে না বঞ্চনা। রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছর বেঁচেছিলেন। শেষ বয়সে এ তার উপলব্ধির কথা, বিশ্বাসের কথা। এই সত্য তিনি অর্জন করেছিলেন সারা জীবনের সাধনা ও অর্জনের মধ্য দিয়ে।

Related Posts