ভ্রমণ গদ্য—৩ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ || শাহাব আহমেদ

বাথ শহর।

প্রায় দুই হাজার বছর আগে রোমানরা প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণকে ঘিরে গড়ে তুলেছিল স্নানাগার ও দেবী সুলিস মিনার্ভার মন্দির। তখন শহরটির নাম ছিল অ্যাকুয়ে সুলিস। দেবতার উপস্থিতির নিদর্শন হিসেবে প্রাচীন মানুষ যে উষ্ণ জলকে কল্পনা করেছিল, তা আজও মাটি ফুঁড়ে উঠে আসে।

সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে, দেবতারা সরে গেছেন, মানুষের ভাষা বদলে গেছে।

জল রয়ে গেছে ঠিকই।

সভ্যতার আয়ু মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক ছোট; প্রকৃতির আয়ু অনেক দীর্ঘ।

রোমান বাথের পাশেই বাথ অ্যাবি।

এর পশ্চিম দিকের সামনের দেয়ালে পাথরে খোদাই করা হয়েছে ধর্মীয় কাহিনী। দুপাশে পাথরের মই বেয়ে ফেরেশতারা কেউ স্বর্গে উঠছে, কেউ নেমে আসছেÑজ্যাকবের স্বপ্নের সিঁড়ির প্রতিরূপ।

শতাব্দীর ক্ষয়ে কোথাও তাদের মুখ মুছে গেছে, কোথাও ধড় আছে মাথা নেই। এই অসম্পূর্ণতাই যেন স্থাপনাটির বয়সের বলিরেখা। একহাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এর নির্মাণ, তারপরে ধ্বংস, সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের চিহ্ন তার গায়ে। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অসামান্য এই দেশ।

কোথাও প্রান্তর দিগন্তে আকাশ ছুঁয়েছে, কোথাও তা কচ্ছপের পিঠের মতো উঁচু, কোথাও তন্বীর নাভিদেশের মতো অবতল।

বিভিন্ন বর্ণের শস্যের খেত। কোথাও শস্য কেটে নেওয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে রং যোগ করেছে সবুজ গাছের সারি বা অনিরবচ্ছিন্ন বন।

আমাদের দেশে দেখা, রাশিয়া বা আমেরিকায় দেখা প্রান্তরের মতো নয়। বরং ইতালিতে যা দেখেছি, অনেকটা তার মতো।

ইউরোপের সৌন্দর্য নিজস্ব।

ইউরোপ আমাদের কী দিয়েছে?

সভ্যতা ও অসভ্যতাÑদুটোই।

কোনটা বড়?

এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ সব মহাদেশেই মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে বাস করেছে। তাদের নিজেদের যুদ্ধবিগ্রহ ছিল, নিজেদের সভ্যতা ছিল। কিন্তু মুনাফা ও সম্পদ অপহরণের পরিকল্পিত বৈশ্বিক ব্যবস্থা নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো যে পরাধীনতা, দাসব্যবসা, রোগ, ধর্মীয় জবরদস্তি ও লুণ্ঠন ছড়িয়ে দিয়েছিল, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

যিশুখ্রিষ্ট প্রচার করেছেন ভালোবাসা ও ক্ষমার কথা। অথচ তাঁর ধর্মও সাম্রাজ্যের অস্ত্র হয়েছে।

শুধু খ্রিষ্টধর্মই নয়Ñধর্ম, জাতীয়তাবাদ, সভ্যতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার—মানুষের মহান সব ধারণাই ক্ষমতাবানদের হাতে কখনও কখনও মুনাফার হাতিয়ার হয়েছে।

এই সত্য আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও কম নয়।

“জয় বাংলা”, “জয় বঙ্গবন্ধু”Ñআমার কাছে পবিত্র দুটো উচ্চারণ। কিন্তু দুর্বৃত্তের মুখে উচ্চারিত “জয় বাংলা” আমার “জয় বাংলা” নয়। দুর্বৃত্তের ব্যবহৃত “বঙ্গবন্ধু”ও আমার বঙ্গবন্ধু নন।

আমার বঙ্গবন্ধু একজন মৃত মানুষ, কোনো অভ্রান্ত পীর—আউলিয়া নন।

যেমন মৃত রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, লালনÑমানবতার মহান স্বপ্নদ্রষ্টারা।

তাঁরা মৃত।

তাঁদের বাণী মৃত নয়।

পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গার তীরে আমরা যে পাপের নগরী আজ দেখছি, তা একদিনে তৈরি হয়নি। আজ যে বীজ বোনা হচ্ছে, তার ফল দেখা যাবে ভবিষ্যতে।

তাই আজ প্রতিবাদ করে আজই অন্যায়ের প্রতিকার দেখতে চাওয়াটা হয়তো অবাস্তব।

আমেরিকা ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের বাইরে, কিন্তু তার আধুনিক রাষ্ট্র ও সভ্যতার প্রধান শিকড় ইউরোপেই। আদিবাসীদের ভূমি দখল, সম্পদ লুণ্ঠন, দাসশ্রমÑএসবের ওপরে দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে চোখধাঁধানো নগরী, প্রাসাদ, গির্জা।

কখনও কখনও সেই গির্জার বেঞ্চে বসে অর্গানের সুর শুনলে মন গলে বেরিয়ে আসে।

কয়েক মুহূর্তের জন্য গাজার কথা, ইউক্রেনের কথা, ইয়েমেন, লেবানন বা অন্য কোথাও নিহত মানুষের কথা ভুলে যাই।

মানুষের তৈরি সৌন্দর্যের এই ক্ষমতাও অদ্ভুত।

যে সভ্যতা পৃথিবীকে শৃঙ্খল পরিয়েছে, সেই শৃঙ্খল থেকে মুক্তির বহু আধুনিক ধারণাও এসেছে এখান থেকেই।

রেনেসাঁ, আধুনিক বিজ্ঞান, বিবর্তনবাদ, সমাজতন্ত্র, আধুনিক গণতন্ত্রÑসবই এই মাটির সন্তান।

আমেরিকান বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, হাইতির বিপ্লব, রুশ বিপ্লবÑসবকটির পেছনেই ইউরোপীয় চিন্তার গভীর ছাপ।

লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। অনেক স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও মুনাফার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।

কিন্তু সবকিছু বৃথাÑতাও বলা যায় না।

শেষ দিন রকিকে নিয়ে বাকিংহাম প্যালেসের কাছে যাই। পার্ক ঘুরি।

নদীটা আহা কী সুন্দর!

জলের আয়নায় নত হয়ে মুখ দেখে উইলো। বিশাল মাছগুলো জল তোলপাড় করে। গম্ভীর, অভিজাত রাজহাঁসগুলো ইতিউতি সাঁতরায় আয়েশে।

ট্রাফালগার স্কোয়ারে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াই।

মাঝখানে আকাশের দিকে উঠে গেছে নেলসনের স্তম্ভ—১৮০৫ সালের ট্রাফালগারের যুদ্ধে নেপোলিয়নের ফরাসি—স্প্যানিশ নৌবহরকে পরাজিত করে ব্রিটিশ সমুদ্রশক্তির আধিপত্য নিশ্চিত করেছিলেন যে অ্যাডমিরাল নেলসন, তাঁর স্মৃতিতে।

সাম্রাজ্য তার বিজয় ভোলে না।

পাথরে তুলে রাখে।

তারপর টেমস নদীর তীর, টাওয়ার ব্রিজ, বিগ বেন ইত্যাদি দেখে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরি।

শ্বেতার এই প্রথম লন্ডনে আসা। অন্তত এটুকু দেখা তার দরকার ছিল।

কোনো মিউজিয়ামে যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

১৯৮৯ সালে পাঁচ মাস এই শহরে ছিলাম। তখন বহু মিউজিয়াম ঘুরে দেখেছি।

ইউরোস্টার ট্রেনে আড়াই ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ সেরে প্যারিস পৌঁছাই ২২ আগস্ট শনিবার দুপুরে।

পদ্মাতীরের যে গ্রামটিতে ধুতুরা—জোছনার দিনে কোনো একদিন গুটি গুটি পায়ে হাঁটত ছোট্ট জুয়েল, সেই জুয়েল এখন তার স্ত্রী ইভাকে নিয়ে অপেক্ষা করছে বাইরে।

আমরা যাত্রা শুরু করি নর্মান্ডির দিকে।

মন্ট সাঁ—মিশেল আমাদের গন্তব্য।

পথ দীর্ঘ।

গল্প করতে করতে গাড়ি চলে। বিস্তীর্ণ প্রান্তর, ভুট্টার ক্ষেত পার হয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লাগে হোটেলে পৌঁছাতে।

একটু বিশ্রাম নিয়ে বের হয়ে পড়ি আশপাশ দেখতে।

দিগন্তছোঁয়া ভুট্টার ক্ষেত ছাড়া আর কিছু নেই।

জুয়েল বলে, মিনিট চল্লিশ গাড়ি চালালে সমুদ্রসৈকত পাওয়া যাবে।

রওনা দিই।

ভুট্টাক্ষেতে দিনশেষের রোদ খেলে।

বেশ লাগে দেখতে।

গাড়ি আমাদের যেখানে নিয়ে আসে, সেখানে শুধুই ভুট্টার ক্ষেত।

কোনো সমুদ্র নেই।

জিপিএস কানা। নেট নেই।

সন্ধ্যা নামলে ফিরে আসাও কঠিন হবে।

তাই গাড়ি ঘোরাতে হয়।

হোটেলের পাশে নির্জন রাস্তায় কিছুক্ষণ হেঁটে ঘুমাতে যাই।

সকালে অজস্র মোরগ ডাকে। অবশ্য হোটেল থেকে শোনা যায় না। চারদিকে ঘুঘুর ডাক।

নাস্তা সেরে চেক—আউট করে মন্ট সাঁ—মিশেল চলে যাই।


Related Posts