১৯৭১ঃ এ্যালেন গিন্সবার্গের সেই অমর কবিতা || যশোর রোডে সেপ্টেম্বর অ্যালেনগিন্সবার্গ অনুবাদ: লায়লাফারজানা
আকাশপানেতাকিয়েআছে লক্ষ অবুঝশিশু
ফুলে গেছে পেট, বড় গোল চোখÑঅবাকজিজ্ঞাসু
দীর্ঘ যশোর রোডধরেটানাবাঁশেরকুঁড়েঘর
বিষ্ঠাত্যাগের নেইজায়গা, বালিরআঁচড়।
বৃষ্টিতেকাঁদে লক্ষ পিতা,
লক্ষ মায়েরসীমাহীনব্যথা,
দুঃখ—ভারেআক্রান্তআজ লক্ষ লক্ষ ভাই,
লক্ষ বোনের কোথাও যে হায়যাবারজায়গানাই।
লাখোমাসি—পিসিতাকিয়ে দেখোরুটির অভাবে লাশ
লাখোমামা—কাকাশরীরেধরেছেমৃত্যুরআবাস,
গৃহহীনহয়েলাখোপিতামহবিমূঢ়, শোকাহত,
লাখোপিতামহী ভেতরে ভেতরেনীরবেউন্মত্ত।
কাদায়হাঁটেলাখোকন্যা,
লাখোশিশু কেড়েনিয়েছেবন্যা
লাখো মেয়েবমিতেডুবে দেখো ক্রন্দনরত,
লাখোপরিবারএকাহয়ে গেছে, শূন্য—আশাহত।
লক্ষ প্রাণÑ যাদের এই উনিশশ’একাত্তর
সূর্যেরনীচেযশোরসড়কেগৃহহীনধূসর।
লক্ষ প্রাণলাশহয়ে গেছে, লক্ষ লক্ষ পথিক
সক্ষমযারাপূব—পাকিস্তান থেকে কলকাতারদিক।
যশোর রোডেচলে দেখো ঐ ট্যাক্সি—সেপ্টেম্বর
কঙ্কালসার বলদ টানেকাঠকয়লার ভর
জলাবদ্ধ মাঠ, বৃষ্টিরনালা, উঠেছে ক্ষেতের পর
গোবরেরঘুঁটেগাছের গুঁড়িতে, প্লাস্টিকের কুঁড়েঘর।
ভেসেচলেছেপরিবার যেন হেঁটেচলা ভেজামিছিল
বড়—মাথা—ছেলে স্তম্ভিত সব, মুখেএঁটেছেখিল
হাড়েরখুলির গোলাকার চোখে ছেয়েছেনীরবতাÑ
মানুষের বেশেওরা যেনকালো ক্ষুধার্ত ফেরেশতা
ছেলেদেরপানেতাকিয়েকাঁদে শোক—জর্জরমা,
প্রবীণানানেরমতো দাঁড়িয়েÑহাড়—জিরজিরে পা
ছোট দেহেরমুখেরকাছেপ্রার্থনায়পাতাহাত
পাঁচমাসধরেবসতি সেখানে, নেই ন্যূনতমভাত
এক মাদুরেশূন্য পাতিলপ’ড়েরয়েছেএকা,
পিতার তোলাহাতআকাশে, ভাগ্যের এ কেমন লেখা!
মায়ের চোখেনামেঅশ্রুঅঝোরশ্রাবণীধারায়,
সে বেদনায়মামায়ারকান্নাআকাশ—পাতালফাটায়।
তালপাতারছায়ায়বসে দু’টিশিশুজড়োসড়ো,
তাকিয়েরয়আমারপানে, মুখে নেই কোনো স্বরও।
সপ্তাহে রেশনএকবার জোটে, চাল আর ডালশুধু,
যুদ্ধক্লান্ত ক্ষীণশিশুদেরতরে গুঁড়ো—দুধ এক মুঠো
সবজি কেনার না আছেটাকা, না পুরুষেরকাজহায়
চারদিনেরচালতারাতাইযতদিনপারেখায়
তারপরটানাতিনদিনধরেশিশুরাঅনাহারে
উগড়ে দেয় নতুনআহার, যদি না খায়ধীরে।
যশোর রোডে পা জড়িয়েমাআমারহাঁটুরকাছে
“মিস্টার, প্লিজ”বলেবলে সে বাংলাভাষায় কাঁদে,
মেঝেতেপড়েলুটোপুটিখায়পরিচয়পত্র ছেঁড়া,
শিবিরঅফিসের দরজায় স্বামীবিহ্বল দিশেহারা।
“খেলতে খেলতে খোকা মোরহায়বানেধুয়েছেপাতা,
এখনওরা আর দেবে না খাবার, কেড়েনিয়েছেভাতা,
টুকরোগুলো সব জমানোআছে সেলুলয়েডেরব্যাগে,
অবোধশিশুর খেলা যে আজমরণ—শাপহয়েজাগে।”
হাজারবালকচারপাশে দুইপুলিশকেঘিরেধরে,
প্রতিদিনইতারারুটিরআশায়এভাবেইভিড়করে
হাতেবড়বাঁশি আর লম্বা বাঁশেরলাঠিরবাড়িÑ
ক্ষুধার খেলায়পুলিশচালায়, ঠেলে সোজারাখেসারি।
লাইন ভেঙে কেউ লাফিয়েপড়েসবারআগে যেতে,
বৃত্তেরমাঝে এক রোগা ছেলেঢুকেপড়ে ওত পেতে।
কাদা—মাটিরমঞ্চে দুভাই নেচে ওঠে উল্লাসে,
প্রহরীরাবাজিয়েবাঁশিরাগেতাড়াকরেপিছে।
কেনশিশুরাআজএখানেএমনজটলাকরে,
হাসি খেলায়, ঠেলাঠেলিকরেএকটুঠাঁইয়েরতরে?
কেনভয় আর উল্লাসেভরাতাদের এই অপেক্ষা?
এই কি সে ঘর যেখানে মেলেশিশুররুটি—দীক্ষা!
রুটি—দুয়ারে দাঁড়ানো লোকটি কেঁদে বেরিয়েআসে,
হাজারোবাচ্চাকান্নারসুরেসুর মেলায়পাশে।
এ কিআনন্দ? নাকিপ্রার্থনা? “আজ আর রুটিনাই!”
হাজারশিশুরমিলিতচিৎকারÑ“হুররেহুররেভাই!”
ছুটেযায়তারা তাঁবুর ঘরে, বয়োজ্যেষ্ঠেরাঅপেক্ষায়,
রাষ্ট্রেররুটিহাতেশিশুরাতাঁদেরবার্তাবাহক হয়।
“আজ আর নেইরুটি! নেই শৌচেরও কোনোঠাঁই!”
বেচারাশিশুÑঅসুস্থ আজ, পেটেজমেছেবিষ্ঠাই।
অপুষ্টিতেহাজার কঙ্কালÑমাসের পর মাস ক্ষয়,
এক ঝটকায়অন্ত্রের সব জলশুষে নেয়আমাশয়।
নার্স দেখায় রোগেরকার্ডÑলেখা“এন্টেরোস্ট্রেপ”,
সাসপেনশনচাইÑনইলে“ক্লোরোস্ট্রেপ।”
হাসপাতালেরখুপরিতেশরণার্থী শিবির,
মায়েরশুকনোবুকেনগ্ননবজাতকশুয়ে থাকে স্থির।
সাতদিনেরশিশুÑ চোখেবাতেরছাপ, বানরেরমতো ক্ষুদ্র।
গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস, রক্তে বিষক্রিয়াÑহাজারমৃত্যু অনিবার্য।
সেপ্টেম্বর, যশোর রোডেরিকশাচড়েযাই,
একই শিবিরেপঞ্চাশহাজারপ্রাণের দেখাপাই।
বানেরজলেবাঁশেরকুটিরসাজানোসারিসারি,
খোলা নর্দমা, ভেজাপরিবার—খাবারেরআহাজারি।
সীমান্তেট্রাকবন্যাকবলিত, পৌঁছায় না ত্রাণ,
ঘুচাতেআঁধারজলদি এসো, মার্কিন—দেবদূত—যান!
রাষ্ট্রদূত বাঙ্কার বলো, কোথায়তিনিআজ?
শিশুর খেলায়‘হেলিওস’কি তাঁর মেশিনগানেরত্রাস?
ইউএসএইডের হেলিকপ্টারআজতারা কোথায়?
গাঁজাপাচারে ব্যস্ত ওরাব্যাংককেরসবুজছায়ায়।
কোথায়আলোকিতআমেরিকার সেইবিমানবাহিনীআজ?
উত্তরলাওসে বোমা ফেলাইকিতাদেরদিন—রাতেরমূলকাজ?
কোথায়তারা, প্রেসিডেন্টের সোনার সৈনিক?
কোটিপতির নৌবহরÑদয়ালু, নির্ভীক?
এনেছেকিতারা ওষুধ—পথ্য, খাবার আর ত্রাণ?
নর্থ ভিয়েতনামেন্যাপাম ফেলেনাকিকরছে পেরেশান?
কোথায় মোদের সেইঅশ্রুঝরে যে পরের ব্যথায়?
বৃষ্টি ভেজাপরিবারগুলোযাবেবলো কোথায়?
যশোর রোডেরশিশুরাআজবুজলোবড় চোখÑ
মোদেরপিতামরে গেলে, করব কোথায় শোক?
কারকাছেবলো দয়া চাইবঅন্ন আর আশ্রয়ের তরে?
বিষ্ঠা—বানের নোংরানরকে কে রুটি পৌঁছাতেপারে?
লাখলাখশিশুএকা দাঁড়িয়েসঘনশ্রাবণধারায়!
লাখলাখশিশুযন্ত্রণায় কেঁদে চোখেরজল ঝরায়!
বাজো, হে বিশ্বেরজিহ্বা, তাদের শোকেরতরে,
বাজো, হে কণ্ঠস্বর, সেইঅজানাভালোবাসারতরে।
বাজো, হে ঘণ্টা, বৈদ্যুতিকযন্ত্রণারসুরে,
বাজো, হে বিবেকআমেরিকারÑমস্তিষ্কেরঘরে।
কত শিশুআজআমরাহারিয়েছি এই পথে?
কত কন্যারা, চোখেরসামনেরূপান্তরিত ভূতে?
কেমন আমাদেরআত্মা যে আজহারিয়েছে দয়ারটান?
বাজো, হে সঙ্গীত, যদি থাকেবুকেসাহস আর প্রাণÑ
কর্দমাক্ত কুঁড়েরপাশে, বালি—নর্দমায়হাঁটে
বিশালপাইপেঘুমায় তারা ভেজাবিষ্ঠারমাঠে।
কুয়োর পাম্পে অপেক্ষায়তারাÑহায়পৃথিবী, হায়!
মায়েরবুকেজড়িয়ে থেকেও শিশুরামরে ক্ষুধায়।
তবেকিঅতীতেনিজের সঙ্গেই এই করেছিআমি?
“কী করব, সুনীলকবি?”Ñবলে দাওতুমি।
চলেযাবো দূরে, রেখেযাবোপিছেনিঃস্ব রিক্ত হাত?
দেহ কামনারহিসাব মেলাবো এই কিবরাত?
কী এসেযায় আমাদের এই গাড়ি আর নগরেতে?
মঙ্গল গ্রহে খাদ্য—কুপনে কী মিলবে জগতে?
নিউইয়র্কে কত কোটিবসেডাইনিং টেবিলে?
সুরুয়া—শুয়োরেরমাংসচিবোয়মহাখুশিহিল্লোলে?
কত কোটিবিয়ারেরক্যানছুঁড়ে ফেলা হয় রোজÑ
ধরিত্রীরনীলবুকে কত তার দেনাÑখোঁজ?
চুরুটের ধোঁয়া, পিচঢালা পথে বিলাসীগাড়িরমায়াÑ
বিষিয়েতুলেছেবিশ্বকে আজ, নক্ষত্রে ফেলেছেছায়া
দীর্ঘশ্বাসে মেটাও তোমারবুকেরমাঝের যুদ্ধ,
নিজেরজিভেইচাখোনিজ—মানব—জাতিরঅশ্রু।
দয়া করো মোদের, তোমরাযারা দেখছ চলচ্ছবি,
‘টিভি গ্রহে’রসংসারে মোরা কোটিভুখা, ছায়ামূর্তি ।
কত কোটিশিশুরমৃত্যুরপরে তোমরাতবেবলো
পুণ্য—মায়েরাপরমেশ্বরের দেখাপাবেভালো?
কত সৎবাবা কর দেবে গড়তে সে ফৌজআবার,
বুকফুলিয়েযারা গোনেলাশনিজেরইমারণ—খেলার?”
কত আত্মামায়ারমাঝে বেদনায় হেঁটেযায়,
কত শিশু কেঁদে কেঁদে মরেঅলীক ব্যথায়?
কত পরিবারশূন্যচোখে দিশেহারা পথে পথে
কত ঠাকুমা ক্রমাগতপরিণতআজ ভূতে?
কত প্রেম গোঙায়এখানে—রুটি জোটে না মুখে?
কত পিসিদেরমগজফুটোহয়েছেবুলেটে?
মাটিতেছড়ানো কত শত বোনেরভাঙামাথারখুলি?
কত ঠাকুরদানিশ্চুপআজ, নেই যে মুখেবুলি?
কত পিতাআজমগ্ন দুঃখে,
কত পুত্রের নেই পথ সমুখে?
কত কন্যারমুখে জোটে না আজ আর কোনোভাতও,
কত কাকার পা ফুলেআজ অসুস্থ, আহত?
কত কোটিশিশুকাঁদছে পীড়ায়,
কত কোটিমাবৃষ্টিধারায়,
কত কোটিভাইআজডুবে গেছে চরম মনস্তাপেই,
কোটিবাচ্চার কোথাও যে হায়যাবারজায়গা নেই।
