নিউইয়র্কে ষষ্ঠ ভাসানী সম্মেলনে বক্তারা || ভাসানীকে বাদ দিয়ে ইতিহাস লেখা যাবে না

নিউইয়র্ক (ইউএনএ)ঃ স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, মজলুম জননেতা হিসেবে খ্যাত মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী স্মরণে প্রতিষ্ঠিত ভাসানী ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক—এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ষষ্ঠ ভাসানী সম্মেলন। সম্মেলনে বক্তারা তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, মওলানা ভাসানী এমন একজন নেতা ছিলেন যাকে চিনতে—জানতে আরো গবেষণা করতে হবে, তাঁর ওপর আরো পড়াশোনা করতে হবে, জানতে হবে। বক্তারা বলেন, মাওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার হয়েছে, অপপ্রচার চলছে। তিনি কখনোই হিন্দু বিদ্বেষী নেতা ছিলেন না। ছিলেন হিন্দু—বৌদ্ধ—খ্রীষ্টান তথা সর্বস্তরের জনমানুষের নেতা। জাতীয় নেতা হিসেবে আমরা তাকে যথাযথ সম্মান জানাতে পারিনি। বক্তারা বলেন, কিন্তু সময় ফুরিয়ে যায়নি। মাওলানা ভাসানীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবী। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে স্মরণ করা উচিত। সম্মেলনে ১০ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়। 

গত ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনে প্রধান অতিথি ও প্রধান আলোচক ছিলেন ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, গবেষক প্রফেসর সলিমুল্লাহ খান। গেস্ট অব অনার ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয় উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশের অন্তর্বতীর্ সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া সাথী, ভাসানী চর্চা কেন্দ্র—কলকাতা’র প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার এবং ভাসানী গবেষক জুনাইদ এহসান।

ফাউন্ডেশনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমাম শিকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মূল পর্বের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হওয়ার পর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইনকের সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসের এবং ভাসানীর ওপর প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তফা করিম ফরিদ। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন ষষ্ঠ মওলানা ভাসানী আন্তর্জাতিক সম্মেলন—২০২৬ উদযাপন কমিটির পৃষ্ঠপোষক সৈয়দ টিপু সুলতান, আহ্বায়ক গিয়াস আহমেদ, বিশিষ্ট রাজনীতিক নাহিদুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সম্মেলন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব শাহাব উদ্দিন সাগর। 

অনুষ্ঠানে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের নেতা। ক্ষমতা দখলের চেয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য। 

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ভাসানীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ। তিনি ক্ষমতার কাছে যাননি; বরং ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন।

মওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশীয় শোষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও ভাসানী আজীবন সোচ্চার ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে তিনি একই সূত্রে দেখতেন। তিনি বলেন, ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ও চিন্তাধারাকে কেবল স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তাঁর জনমুখী রাজনীতি, মানবতাবাদী দর্শন এবং শোষণবিরোধী অবস্থান নতুন করে পাঠ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতের একজন নেতাকে স্মরণ করা নয়। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ দেশের কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসা।

মওলানা ভাসানীর মানবতাবাদী ও অসা¤প্রদায়িক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভাসানী কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় বা সা¤প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতি করেননি। হিন্দু—মুসলমানসহ বিভিন্ন স¤প্রদায়ের মানুষের মিলন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ধর্ম, স¤প্রদায় বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মময় জীবন আলোচনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কথাও তুলে ধরেন। বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার জনগণের সরকার বলেই তিনি সন্তোষে মাওলানার মাজার জিয়ারত করার পর টাঙ্গাইলে কৃষক কর্ড কর্মসূচীর উদ্বোধন করেন। 

সম্মেলন উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিনের মোড়ক উম্মোচনও করা হয় মূল মঞ্চে। কবিতা আবৃত্তি করেন সাদেক খান ও হারুন উজ জামান ভূঁইয়া। সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পী  মরিয়ম মারিয়া, নীলিমা শশী ও করিম হাওলাদার। এই পর্ব সঞ্চালনায় ছিলেন সম্মেলন উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক এসএম ফেরদৌস।

নতুন কমিটি গঠিত:

সম্মেলনে সংগঠনের কার্যকরী কমিটির মেয়াদ চলতি বছরে শেষ হওয়ায় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী ইমাম সভাপতি ও সাংবাদিক শাহাব উদ্দিন সাগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২০ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ মওলানা ভাসানী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। প্রসঙ্গত: আলী ইমাম দ্বিতীয়বারের মতো সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

২৫ সদস্যের কমিটির অন্য কর্মকর্তারা হলেন: সহ সভাপতি মোস্তফা করিম ফরিদ, সহ সভাপতি কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম, যুগ্ম সম্পাদক নাজমুল আলম শ্যামল, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম ফেরদৌস, কোষাধ্যক্ষ নূর আমিন, ওভারসিস সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, প্রচার, তথ্য ও  প্রযুক্তি সম্পাদক তানভির করিম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নার্গিস রহমান, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শিপন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সৌমিত্র দস্তিদার। কার্যকরী সদস্য— এম এ সাদেক, শাহ আলম দুলাল, খন্দকার ফরহাদ, মাহমুদ খান তাসের, কিউ জামান, আবদুর রহিম হাওলাদার, এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদ, ফারুক হোসেন মজুমদার, বাসেত রহমান, বিল্লাল চৌধুরী, মঈনুদ্দীন নাসের (পদাধিকার বলে সদস্য)। এই কমিটি ঘোষণা করেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসের। কমিটি ঘোষণার সময় জানানো হয় সম্মেলনোত্তর কার্যকরী কমিটির বৈঠকে উপদেষ্টা মন্ডলী গঠন করা হবে। এ কমিটি ২০২৭—২০৩০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে।

Related Posts