হুতি আন্দোলন: বিপন্ন উপত্যকার অজানা অধ্যায় || ড. জীবন বিশ্বাস
ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ও সৌদি আরবের মধ্যকার থেমে থেমে যুদ্ধকে প্রায়ই সুন্নি সৌদি আরব ও শিয়া ইরানের বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি রণক্ষেত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এ ব্যাখ্যার মধ্যে সত্যতা নেই তা নয়, কিন্তু এটিই সম্পূর্ণ সত্য নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আনসার আল্লাহ’ নামে পরিচিত হুতিরা প্রথমত ইয়েমেনের নিজস্ব ইতিহাসেরই সৃষ্টি, ইরানের সৃষ্টি নয়। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ, জায়দি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া, ইয়েমেনি রাষ্ট্রের ভঙ্গুরতা এবং দেশটির শাসনক্ষমতার অধিকার কার হাতে থাকবেÑএই দীর্ঘ দ্বন্দ্বের ভিতরেই এদের জন্ম। পরবতীর্তে ইরান হয়ে ওঠে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে সৌদি আরব প্রভাবশালী প্রতিবেশী থেকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শত্রুতে পরিণত হয়। হুতি আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সাদা (ঝধধফধ) হলো উত্তর—পশ্চিম ইয়েমেনের একটি পার্বত্য প্রদেশ ও শহর। এটি ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার উত্তরে সৌদি সীমান্তের কাছে অবস্থিত। সাদার (ঝধধফধ) পাহাড়ে যে সংঘাতের জন্ম, একসময় সেটিই রিয়াদ, সৌদি তেল—অবকাঠামো এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবাণিজ্য পথকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করে। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
জায়দিবাদ শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র শাখা, যার ঐতিহাসিক ভিত্তি উত্তর ইয়েমেনে। তবে এটি ইরানে প্রচলিত দ্বাদশী বা টুয়েলভার শিয়াবাদ থেকে মতবাদগতভাবে একেবারেই ভিন্ন। কয়েক শতাব্দী ধরে জায়দি ইমামরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় পার্বত্য ভূখন্ডে বিভিন্ন মাত্রায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রাখে। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরের প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লব শেষ ইমামকে উৎখাত করে উত্তর ইয়েমেনে জায়দি ইমামতন্ত্রের অবসান ঘটায়। কিন্তু জায়দি ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্য থেকেই যায়, বিলুপ্ত হয়নি। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অনেক জায়দি পন্ডিত মনে করতে শুরু করেন যে রাজনৈতিক কেন্দ্রায়ন এবং সৌদি—প্রভাবিত সালাফি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিস্তারের ফলে তাদের ঐতিহ্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই পটভূমি থেকেই আনসার আল্লাহর উত্থান। এর সাংগঠনিক শিকড় ১৯৯০—এর দশকে প্রতিষ্ঠিত জায়দি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন ‘বিলিভিং ইয়ুথ’—এর মধ্যে নিহিত। সাদার ধর্মীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হুসেইন বদরউদ্দিন আল—হুতি ধীরে ধীরে আন্দোলনের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মতাদর্শিক নেতায় পরিণত হন। তাঁর অনুসারীরা প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের সরকারের যেমন বিরোধিতা করতেন, তেমনি ইয়েমেনে অতিরিক্ত সৌদি ও মার্কিন প্রভাবকেও প্রত্যাখ্যান করতেন। ২০০৪ সালে সালেহ সরকার হুসেইন আল—হুতিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করলে সশস্ত্র সংঘর্ষ শুরু হয়। সে বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি নিহত হন কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর নামকেই ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহের পরিচয়ে পরিণত করে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সংঘটিত হয় বহুল পরিচিত ছয়টি সাদা (ঝধধফধ) যুদ্ধ।
পরবর্তী নির্ণায়ক পরিবর্তনটি আসে ২০১১ সালের আরব বসন্তের ধাক্কায়। এ সময় ইয়েমেনি গণআন্দোলনের পর সালেহের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে শুরু করে। হুতিরা পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও প্রস্তাবিত সাংবিধানিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তারা তাদের একসময়কার শত্রু সালেহের অনুগত কিছু সামরিক ইউনিটের সহযোগিতায় সানা দখল করে। পরে তাদের দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রায় প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বুহ মনসুর হাদি ও তাঁর সরকার রাজধানী ছাড়তে বাধ্য হন। হাদির অনুরোধে সৌদি আরব একটি সামরিক জোট গঠন করে এবং ২৬ মার্চ ২০১৫ ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করেÑলক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। একটি অভ্যন্তরীণ ইয়েমেনি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এভাবেই আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ নেয়।
সৌদি আরবের কাছে কৌশলগত হিসাবটি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। রিয়াদ তার দক্ষিণ সীমান্তঘেঁষা ইয়েমেনের জনবহুল উত্তর—পশ্চিমাঞ্চলে সৌদি নীতির বিরোধী এবং ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা একটি সশস্ত্র আন্দোলনের কর্তৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। অন্যদিকে হুতিদের কাছে সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপ তাদের বিদেশি আধিপত্যবিরোধী বক্তব্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী কর্তৃক ইয়েমেনে বিমান হামলা, গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ও নৌপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, এবং বন্দর ও আকাশপথে বিভিন্ন বিধিনিষেধ হুতি রাজনীতির কেন্দ্রীয় ক্ষোভে পরিণত হয়। রিয়াদের যুক্তি ছিল, অস্ত্র পাচার রোধে এসব পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, কিন্তু হুতিরা একে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে অবরোধ হিসেবে অভিহিত করে। এই বিধিনিষেধের বৈধতা ও প্রকৃতি নিয়ে বিরোধই আজও শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী অন্তরায় হয়ে রয়ে গেছে।
ইরান এই সমীকরণকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে, তবে হুতিদের কেবল ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে অভিহিত করলে বাস্তবতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল ইরান ও তার মিত্র নেটওয়ার্ক থেকে হুতিদের কাছে প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অর্থায়ন পৌঁছানোর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে হুতিদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থা বহিরাগত প্রযুক্তিগত সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে। কিন্তু আন্দোলনটির নিজস্ব নেতৃত্ব, নিজস্ব সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক লক্ষ্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাছাড়া হুতিদের জায়দি ধর্মীয় ঐতিহ্য ইরানের দ্বাদশী শিয়াবাদ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ ইয়েমেনের হুতি বা ‘আনসার আল্লাহ’—কে পুরোপুরি তেহরান—নিয়ন্ত্রিত সংগঠনের পরিবর্তে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইরানি—অংশীদার হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এককালের পাহাড়ি গেরিলা বাহিনী আজ আধুনিক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজবিধ্বংসী অস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোনের মালিক। রিয়াদ ও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় যখন সেই ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে আছড়ে পড়তে লাগল, যুদ্ধ আর সীমানার ভেতরে রইল না। যদিও ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এক যুদ্ধবিরতির ফলে সংঘাতের উত্তাপ খানিকটা কমেছিল, এবং সৌদি—হুতি আলোচনা আশা জাগিয়েছিল যে রিয়াদ হয়তো এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবেÑকিন্তু সেই স্বস্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী।
২০২৬ সালে সেই ভঙ্গুর ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। ১৩ জুলাই ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, একটি ইরানি বিমানকে অবতরণে বাধা দিতে তাদের বাহিনী সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালিয়েছে। হুতিরা এর দায় সৌদি আরবের ওপর আরোপ করে এবং সৌদি ভূখন্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে কয়েক বছরের সীমান্তপারের আপেক্ষিক শান্তির অবসান ঘটায়। এরপর ২০ জুলাই আনসার আল্লাহ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের ভাষায় একটি নৌ অবরোধ ঘোষণার কথা জানায়, যা ইয়েমেনের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের প্রতিশোধ বলে তারা দাবি করে। ঘোষণাটি লোহিত সাগরে সৌদি বাণিজ্যিক ও তেল পরিবহনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, যদিও এ ধরনের একটি অবরোধ ঘোষণা করা এবং সর্বাত্মকভাবে তা কার্যকর করার সামরিক সক্ষমতা একই বিষয় নয়।
সেপ্টেম্বর নাগাদ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করে হুতিরা বাব এল—মান্দেব প্রণালীর দিকে দ্রুত এগোতে শুরু করে। মারিব, জাওফ, তায়েজের পুরনো যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে ফের সংঘাতের আগুন জ্বলে ওঠে এবং সৌদি আরবও আবার বিমান হামলা শুরু করে। মানচিত্রের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কেন ইয়েমেন আর কেবল এক প্রান্তিক মরুভূমির গৃহযুদ্ধ নয়। বাব এল—মান্দেব প্রণালী হলো সেই সরু গলি, যা লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকে যুক্ত করেছে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে। ফলে এই উপকূলে হুতিদের আধিপত্য সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাদার নির্জন পাহাড় থেকে উঠে আসা এক জায়দি জাগরণ আজ গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার ক্ষমতা রাখেÑগত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এর চেয়ে বড় আশংকাজনক পরিবর্তন আর দেখা যায়নি।
কিন্তু এই কৌশলগত মানচিত্র ও রাজনৈতিক দাবার চালের নিচে চাপা পড়ে গেছে আসল সত্যটি। সেই সত্যের নাম ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্যমতে, ১ কোটি ৮০ লক্ষেরও বেশি মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, আর প্রায় ২২ লক্ষ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ধুঁকছে।
তাই আজ বিশ্বমানবতার তাগিদে হুতি—সৌদি যুদ্ধের আগুন নির্বাপণ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। কেবল বারুদের ধোঁয়া থামিয়ে কিংবা যুদ্ধবিমানের গর্জনে সাময়িক বিরতি দিয়ে কাক্সিক্ষত শান্তি আসবে না। তার জন্য প্রয়োজন ইয়েমেনের নিজস্ব উঠোনে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক মেলবন্ধন, সৌদি সীমান্তে আশ্বস্ত হওয়ার মতো সুদৃঢ় নিরাপত্তা বলয়, সমুদ্রবন্দর ও আকাশপথ ব্যবহারে স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট নীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ শাসনকাঠামোয় হুতিদের রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর এক দশকের আন্তর্জাতিক যুদ্ধের পর ইতিহাস আজ যে কঠিন সত্যটি সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে তা হলোÑ বাইরের কোনো পরাশক্তি ইয়েমেনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারবে না; অথচ, নির্মম সত্য এটাই যে, এই সংঘাতকে আর ইয়েমেনের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বন্দি রাখাও সম্ভব নয়। আরবের এই রক্তঝরা উপত্যকায় শান্তি না ফিরলে, বিশ্বের শান্তিও যে অধরাই থেকে যাবে!
