দুইদিন ব্যাপি হয়ে গেল ডিসি বইমেলা

আসলাম আহমাদ খানঃ কুড়েঘর সাদৃশ্য ভবনটির চারপাশ ঘিরে ছিলো মনোরম এক প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা, ভেতরে ছিলো সাহিত্য সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রাণবন্ত পদচারণাÑ এমনই এক আবহে মেরিল্যান্ডের রিভার রোড ইউনেটেরিয়ান ইউনিভার্সিলিস্ট কনগ্রেশনাল চার্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দুইদিনব্যাপি ডিসি বইমেলা। ২৬ জুন, শুক্রবার, সন্ধ্যায় ফিতা কেটে এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে দুইদিনব্যাপি বইমেলার উদ্বোধন করেন কবি মানবাধিকারকর্মী ডা. তসলিমা নাসরিন। 

৩১ বছর ধরে নিজ দেশ থেকে নির্বাসিত তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। কিন্তু যেখানেই থাকি, বাংলা ভাষাই আমার একমাত্র আশ্রয়, আমার একমাত্র দেশ। রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারলেও ভাষা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।

তিনি আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি বাংলাতেই ভাবি, বাংলাতেই স্বপ্ন দেখি এবং বাংলাতেই প্রতিবাদ করি। ইউরোপে এক দশক থাকার পর ভাষার টানেই আমি পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হয়নি। তবুও আমার লড়াই থেমে নেই। আমি লিখে চলেছি মৌলবাদ ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এবং নারীর অধিকার বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া, লেখাই আমার বেঁচে থাকা।

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনবাংলা কেন্দ্রআয়োজিত এই বইমেলাকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘বই মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। যে সমাজের মানুষ বই পড়ে না, সেই সমাজ দ্রুত গুজব, কুসংস্কার আর স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়ে যায়। তাই বইমেলা আসলে সভ্যতার মেলা।

তিনি আরও বলেন— ‘আজ মোবাইলের স্ক্রিন বইয়ের পাতা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ গভীর পাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানরা যদি বাংলা পড়তে না শেখে, তবে তারা শুধু একটি ভাষা হারাবে না; তারা হারাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের মতো বিশাল এক মানবিক উত্তরাধিকারকে। এই সময়ে প্রবাসে বইমেলার আয়োজন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি শেকড় হারানোর বিরুদ্ধে এবং ভাষাহীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ লড়াই।

বইমেলার প্রধান অতিথি একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক, বীর মুক্তিযোদ্ধা . নুরুন নবী, শিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, সাংবাদিক নঈম নিজাম, নাট্যজন লুৎফুন নাহার লতা, মিনহাজ আহমেদ সাম্মু, একটিভিস্ট গোপাল সান্যাল, সাংবাদিক পিনাকী তালুকদার, কবি ফকির ইলিয়াস, কবি ফারহানা ইলিয়াস তুলি, ছড়াকার খালেদ শরফুদ্দীন, কবি মিশুক সেলিম, লেখক আবু সাঈদ রতন, রোকসানা ইয়াসমিন, শিশু সাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালি, আসলাম আহমাদ খান (এই প্রতিবেদক), বইমেলার অন্যতম আয়োজক সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সামিনা আমিন, লেখক সাংবাদিক আনিস আহমেদ, শিল্পী মনি দিনার, নাসরিনা আহমেদ মুন্না, ইরাজ তালুকদার সহ লেখক, পাঠক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সংগঠক সুধীজনের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ ছিল প্রথম দিনের আয়োজন। 

ছড়াকার মৃদুল আহমেদ সোনিয়া শারমিন সিরাজের উপস্থাপনায় প্রথম দিনের আয়োজন শুরু হয়সূত্রধর ডান্স একাডেমি শিল্পীর পরিবেশনায় কুচিপুরী নৃত্যের মাধ্যমে। মেরিল্যান্ড বাংলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করেন সমবেত সঙ্গীত। লেখক আবু সাঈদ রতনের সঞ্চালনায় শিশুকিশোরদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন জাহিদ আহসান রাসেল, নজরুল ইসলাম বাবু, ফোবানা চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী এবং বইমেলার পৃষ্ঠপোষক নুরুল আমিন বাবু। 

মেলার দুইদিনই বুকস্টলগুলোতে বিক্রি হয়েছে প্রচুর বই। এই আয়োজনে চলচ্চিত্র নায়িকা মৌসুমী সহ শোবিজ জগতের তারকারাও উপস্থিত ছিলেন।

বইমেলার দ্বিতীয় দিনের সূচনা হয় প্রাতরাশসাহিত্য আড্ডার মধ্য দিয়ে। বইমেলার আয়োজক সংগঠনবাংলা কেন্দ্রে পক্ষ থেকে সাহিত্যিক একটিভিস্ট নূরজাহান বোসকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। তাঁর হাতে সম্মাননা স্মারক ক্রেস্ট তুলে দেন . নুরুন নবী ডা. তসলিমা নাসরিন। শিল্পী সিলভিয়া পান্ডিত তসলিমা নাসরিনকে নিজের আঁকা ছবি উপহার দেন। 

সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা, সাক্ষাৎকার চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পর সঙ্গীত পরিবেশন করেন শাহ মাহবুব, বিন্দু কনা, রেশমী মির্জা, স্বপ্নীল সজীবসহ জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরা। 

অবিনাশী সুরধারা’— শীর্ষক দেশের গান পরিবেশন করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, তবলায় ছিলেন পিনুসেন দাস। গান কবিতার যুগলবন্দীতে দর্শকদের মুগ্ধ করেন দিনার মনি গোপন সাহা। নূরুলদীনের সারাজীবন নাটক থেকে পাঠ অভিনয় করেন নাট্যশিল্পী মিজানুর রহমান খান। 

নাট্যজন লুৎফুন নাহার লতারআমি বীরাঙ্গনা বলছিমুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আবেগঘন পরিবেশনা দর্শকদের নিয়ে যায় ইতিহাসের গভীরতম অনুভবে, যেখানে বেদনা, সাহস আত্মত্যাগের অনুরণন একাকার হয়ে ওঠে। পুরো আয়োজন জুড়ে ছিলো আবেগের স্রোত, যা বইমেলাকে পরিণত করে বাঙালির স্মৃতি, চেতনা আত্মপরিচয়ের এক মিলনমেলায়।

Related Posts