উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—১৫ || ঈযধঢ়ঃবৎ ৪: ফিনটেক ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার: প্রথাগত ব্যাংকিং সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জন্য এআই—ভিত্তিক নতুন দিগন্ত || ড. আনিস রহমান
খ. এআই স্কোরিংয়ের গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি
বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিংয়ের পেছনে কাজ করে অত্যন্ত জটিল গাণিতিক মডেল। সাধারণত ‘সুপারভাইজড লার্নিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে এই মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যেখানে ঐতিহাসিক লেনদেনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অ্যালগরিদম শিখতে পারে কোন ধরনের আচরণ ঋণ পরিশোধের উচ্চ সম্ভাবনার নির্দেশক। এই ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত কিছু অ্যালগরিদম হলো র্যান্ডম ফরেস্ট (জধহফড়স ঋড়ৎবংঃ) এবং এক্সজি—বুস্ট (ঢএইড়ড়ংঃ)। র্যান্ডম ফরেস্ট মূলত একাধিক ডিসিশন ট্রি বা সিদ্ধান্ত বৃক্ষ তৈরি করে এবং তাদের গড় ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়, যা ডেটার জটিলতা সামলাতে অত্যন্ত কার্যকর। অন্যদিকে এক্সজি—বুস্ট হলো একটি শক্তিশালী গ্রেডিয়েন্ট বুস্টিং ফ্রেমওয়ার্ক যা ভুলের মাত্রা বা ‘লস ফাংশন’ কমানোর মাধ্যমে কাজ করে।
এক্সজি—বুস্ট মডেলের একটি সরলীকৃত গাণিতিক রূপ হলো:
ঙনল(θ)=খ(θ) + Ω(θ) ঊয়. (১)
এখানে খ হলো ট্রেনিং ডেটার লস বা ত্রুটির পরিমাণ এবং Ω(θ) হলো মডেলের জটিলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য রেগুলাইজেশন টার্ম। থেটা (θ)—কে এককভাবে প্যারামিটার (চধৎধসবঃবৎং) বা ওয়েট (ডবরমযঃং) বলা হয়। এই গাণিতিক নিপুণতার কারণে এআই মডেলগুলো তথ্যের মধ্যে থাকা অত্যন্ত গভীর ও অ—রৈখিক সম্পর্কগুলো খুঁজে বের করতে পারে যা মানুষের পক্ষে সহজে বোঝা সম্ভব নয়। মিশরের ফিনটেক কোম্পানি ‘এমএনটি—হালান’ (গঘঞ—ঐধষধহ) এই প্রযুক্তির এক সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছে যেখানে তারা গ্রাহকদের কেনাকাটার ধরন দেখে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঋণ অনুমোদন করতে পারছে এবং তাদের অনুমোদনের হার বর্তমানে ৬০ শতাংশেরও বেশি।
ফিনটেক (ঋরহঃবপয) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আর্থিক প্রতারণা শনাক্তকরণের মতো জটিল কাজগুলো মূলত কিছু শক্তিশালী গাণিতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। এই গাণিতিক কাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক একটি সমীকরণ হলো অবজেক্টিভ ফাংশন বা লক্ষ্য নির্ধারণী ফাংশন, যেটি ঊয়. (১) দ্বারা বর্ণিত। এই সমীকরণটি মূলত সুপারভাইজড মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলোর মূল চালিকাশক্তি, যা বিশেষ করে এক্সজি—বুস্ট (ঢএইড়ড়ংঃ) বা র্যান্ডম ফরেস্টের মতো ফ্রেমওয়ার্কে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এটি একটি মডেলকে শেখায় কীভাবে তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রেখে একই সাথে মডেলটিকে সাধারণ ও বাস্তবসম্মত রাখা যায়। নিচে এই সমীকরণের প্রতিটি অংশ এবং ফিনটেক সেক্টরে এর গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
লস ফাংশন খ(θ) এর কার্যকারিতা: প্রশিক্ষণের নির্ভুলতা নিশ্চিতকরণ
সমীকরণটির প্রথম অংশ খ(θ) হলো লস ফাংশন বা ট্রেইনিং লস। এর প্রধান কাজ হলো একটি মডেলের পূর্বাভাসের ত্রুটি বা ভুলের মাত্রা পরিমাপ করা। গাণিতিকভাবে এটি মডেলের করা প্রেডিকশন এবং ঐতিহাসিক তথ্যে থাকা প্রকৃত ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য গণনা করে। ফিনটেক প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো ফিনটেক প্রতিষ্ঠান একজন গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে, তখন খ(θ) নির্ধারণ করে যে মডেলটি অতীতের গ্রাহকদের তথ্য বিশ্লেষণ করে কতটুকু নির্ভুলভাবে ডিফল্টার বা খেলাপিদের শনাক্ত করতে পারছে।
যদি এই লস ফাংশনের মান বেশি হয়, তবে বুঝতে হবে মডেলটি তথ্যের সঠিক প্যাটার্ন ধরতে পারছে না। তাই প্রশিক্ষণের সময় অ্যালগরিদমটি সবসময় এই খ(θ) এর মান কমানোর চেষ্টা করে। এটি নিশ্চিত করে যে মডেলটি প্রশিক্ষণ ডেটাসেটের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্ভুলতা অর্জন করেছে। তবে কেবল নির্ভুলতাই একটি মডেলের জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ অতিরিক্ত নির্ভুলতা অনেক সময় মডেলকে বাস্তব জগতের অজানা তথ্যের সামনে অকেজো করে দিতে পারে।
রেগুলেশন টার্ম Ω(θ) এর ভূমিকা: জটিলতা নিয়ন্ত্রণ ও স্থায়িত্ব
সমীকরণের দ্বিতীয় অংশ Ω(θ) হলো রেগুলেশন বা নিয়মিতকরণ টার্ম। এটি মূলত মডেলের জটিলতার জন্য একটি গাণিতিক জরিমানা (চবহধষঃু) হিসেবে কাজ করে। এর প্রাথমিক ও প্রধান কাজ হলো ‘ওভারফিটিং’ (ঙাবৎভরঃঃরহম) সমস্যা রোধ করা। ওভারফিটিং এমন একটি পরিস্থিতি যখন একটি এআই মডেল প্রশিক্ষণ ডেটা বা তথ্যের মধ্যকার অপ্রয়োজনীয় নয়েজ (ঘড়রংব) বা বিশৃঙ্খলাকেও মুখস্থ করে ফেলে। এর ফলে মডেলটি পরিচিত তথ্যে চমৎকার ফলাফল দিলেও যখন কোনো নতুন গ্রাহকের তথ্য তার সামনে আসে, তখন সে ভুল সিদ্ধান্ত দেয়।
বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিংয়ের ক্ষেত্রে যেখানে স্মার্টফোন মেটাডেটা বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের প্যাটার্নের মতো অসংগঠিত ডেটা ব্যবহার করা হয়, সেখানে Ω(θ) নিশ্চিত করে যে মডেলটি যেন কোনো একটি নির্দিষ্ট তথ্যের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেয়। এটি মডেলটিকে সরল এবং নমনীয় রাখতে সাহায্য করে। সহজ কথায়, এটি নির্ভুলতা এবং সাধারণীকরণের (এবহবৎধষরুধঃরড়হ) মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে। এটি মডেলটিকে এমনভাবে তৈরি করে যাতে এটি বিভিন্ন জনতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ওপর সমানভাবে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে।
সমীকরণের সামগ্রিক গুরুত্ব: নির্ভুলতা ও আস্থার ভারসাম্য
এই সমন্বিত অবজেক্টিভ ফাংশনের গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থিতিশীল মডেল তৈরি করতে সাহায্য করে। সমীকরণের উভয় অংশকে একত্রে মিনিমাইজ করার মাধ্যমে লেন্ডাররা এমন মডেল তৈরি করতে পারেন যা একদিকে যেমন উচ্চ উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স বা আইনি নিয়মকানুন মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় সরলতা বজায় রাখে।
প্রথাগত ব্যাংকিং সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য এই সমীকরণটি একটি আশীর্বাদ। এই জনগোষ্ঠীর তথ্যের ভান্ডার অনেক সময় সীমিত বা অসংগঠিত থাকে। যদি Ω(θ) এর সীমাবদ্ধতা না থাকত, তবে এআই মডেলটি হয়তো ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর আচরণ মুখস্থ করে ফেলত এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত দিত। এই গাণিতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে যে, যারা প্রথমবারের মতো ঋণের আবেদন করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও যেন এআই একটি স্বচ্ছ এবং ন্যায়সঙ্গত ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এই সমীকরণটি কেবল একটি গাণিতিক সূত্র নয়, এটি বিপুল পরিমাণ আচরণগত উপাত্তকে নির্ভরযোগ্য আর্থিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমেই ফিনটেক সিস্টেমগুলো কোটি কোটি মানুষের ডিজিটাল পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে তাদের আর্থিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হচ্ছে। এটি এআই—কে কেবল একটি ‘ব্ল্যাক বক্স’ হিসেবে নয়, বরং একটি জবাবদিহিমূলক এবং স্থিতিশীল প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
