যা দেখেছি যা বুঝেছি—১৮ || মনিরুল ইসলাম

অর্গানিক মানুষ

পরিণাম পরিণতিঃ পশ্চিমা সভ্যতা উন্নতির অনুকরণে নগরায়ন, বাড়াবাড়ি, বিকৃতি আস্তে আস্তে এশিয়াআফ্রিকাকে গ্রাস করবে। ইউরোপআমেরিকায় অর্গানিক মানুষ সরবরাহের উৎস ছোট হয়ে আসবে। ১৯৭০২০১৫ সময়ে মাত্র ৪৫ বছরে সামুদ্রিক প্রাণী অর্ধেক হয়ে গেছে। আদি পৃথিবীর চারপঞ্চমাংশ জঙ্গল সাফ হয়ে গেছে। মানুষ প্রকৃতিকে জয় করেনি, বিধ্বস্ত করেছে। পৃথিবীর সম্পদ সৌন্দর্য সব প্রাণীর সাথে শেয়ার করতে হবে। মানুষ একচেটিয়া ভোগ করলে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। যার যার ন্যায্য পাওনা তাকে দিতে হবে। পৃথিবী পৃষ্ঠ ভূগর্ভস্থ সম্পদ শেষ হওয়ার পর সমুদ্রপৃষ্ঠও লুণ্ঠিত হবে। তারপর মহাকাশ বিনষ্ট করবে। পৃথিবীর কি ক্রমোন্নতি হচ্ছে? সুখ শান্তি স্বস্তির পরিমাণ বাড়ছে? দারিদ্র্য কমলেও সুখ কেন বাড়ে না? কারণ, মানুষ আরঅর্গানিকনেই, ‘প্রাকৃতিকনেই।

ইতিহাস পড়ে আমরা যেমন মানবজন্মের শুরুতে যেতে পারি, তেমনি লক্ষণ দেখে কি মানবজাতির সমাপ্তিতেও যেতে পারি? মনে হচ্ছে মানবযাত্রা এভাবেই চলতে থাকবে এবং ক্রমান্বয়ে অন্য অনেক প্রজাতির মতো একদিন মানবপ্রজাতিও বিনাশের পথে যাবে। পৃথিবীর ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন প্রজাতির বিনাশবিলুপ্তির ঘটনা কারণসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেইসব কারণ মানবসমাজেও বিদ্যমান রয়েছেঃ দূষণ, খাদ্যাভাব, বিরূপ পরিবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী, প্রতিযোগিতা, হাইব্রিড... সুতরাং মানবযাত্রা অনন্ত অসীম হওয়ার কোনো কারণ নেই। মার্টিন রীজ তো তার ‘Our Final Hour’ গ্রন্থে বলেই দিয়েছেন, এই শতাব্দীতেই ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তির কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির আশংকা শতকরা পঞ্চাশ ভাগ

শুধু দশকশতক নয়, প্রয়োজনে সহ¯্র বছরের চিন্তা করুন। কয়েক হাজার বছরে আমরা যেমন এখানে এসেছি, আর কয়েক হাজার বছরে কোথায় গিয়ে পেঁৗছব? নষ্টের বিনাশের অনুঘটক হল যান্ত্রিক আধুনিকতায় সৃষ্ট ইনঅর্গানিক মানুষ। মানুষ হাইস্পীড ট্রেনে চড়ে বসেছে কিন্তু কোথায় তার গন্তব্য জানে না, জানতে চায় না। জগতের বিকাশ অন্তহীনভাবে অব্যাহত হতে পারে না, চলন্ত ট্রেন গিয়ে কখন কোন গহ্বরে পড়ে, সেটাই আমার ভাবনা। এদিকে খোলা চোখে দেখা যায় পৃথিবীর অবিচার নিষ্ঠুরতা দুঃখশোক বেড়ে যাচ্ছে, সূর্যতাপও বাড়ছে, পানি বাড়ছে। কবে যে এই পৃথিবী শুক্রমঙ্গলের মতো পরিত্যক্ত ঘোষিত হবে।

উপসংহারঃ পৃথিবীকে দেখলাম বুঝলাম, আধেক বা তারও কম। পৃথিবীতে আধেক সুন্দর, আধেক উপভোগ্যের। পাশাপাশি আছে আধেক অন্যায় অসঙ্গতি অত্যাচার অনাচার। দ্বিতীয়টা বাড়ছে বলেই পৃথিবী ভারসাম্য হারাচ্ছে, এই পৃথিবী ক্রমান্বয়ে জীর্ণ দীর্ণ হয়ে উঠছে। একদিকে মানবিক কারণে হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষ কর্তৃক প্রকৃতিকে বিরূপকরণের জন্য হচ্ছে। এই দুই ধারা অব্যাহতভাবে শক্তিশালী হলে পরিণতিতে পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য অসহ্য হয়ে উঠবে। অশিক্ষা অধর্ম দারিদে্র্যর জন্য নয়, পৃথিবী বাসযোগ্য থাকবে না প্রকৃতিবিকৃতি অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে। উন্নয়ন পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানবপ্রজাতি পৃথিবীকে ধ্বংস করবে, কোনো মেধাই একে রক্ষা করতে পারবে না। মানুষ অন্যসব প্রাণীকে ধ্বংস করছে, প্রকৃতির সবকিছু দূষিত হচ্ছে, আর মানুষকে নিশ্চিহ্ন করবে মানুষ নিজেইÑসরাসরি এবং তার কর্মের মাধ্যমে।

মানুষ পৃথিবীতে এসেছে সবার পরে, পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হবে সবার আগে। প্রখর বুদ্ধিমান, অতিচালাক, ভয়ঙ্কর লোভী বলেই এমনটি হবে। সে নিজেই নিজের ধ্বংসযজ্ঞ রচনায় ব্যস্ত। অতিমাত্রায় প্রকৃতিবিরোধী কাজ করায় প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবে। উন্নয়নেই বিনাশের বীজ উপ্ত হয়েছে, জন্মে যেমন মৃত্যুর কারণ নিহিত থাকে। শতসহ¯্র বছরের সম্মিলিত সঞ্চিত জ্ঞান কি মানুষকে সমূহ নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারবে? মানুষগ্রেট সারভাইভারকিন্তু সবকিছু যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, তখন কি স্টিফেন হকিং এর কথামতো অন্যগ্রহে চলে যাবে মানুষ? মানুষ বনায়ন করতে পারে, আমাজন বানাতে পারবে না। মাউন্ট এভারেস্ট, গ্রেট বেরিয়ার রীফ, ভিক্টোরিয়া ফলস বা মাসাইমারা সৃষ্টি করতে পারবে না। জ্ঞানবুদ্ধির তীব্রতা বাড়তে পারে, রবীন্দ্রনাথ বেথোভেন শেক্সপিয়ার সক্রেটিস সৃষ্টি করতে পারবে না। তেমনি অতিআধুনিক নগর সভ্যতাঅর্গানিক মানুষবানাতে পারবে না।

নিজের খোঁজে

He who knows others is wise; he who knows himself is enlightened: Lao Tzu

To know thyself is the beginning of wisdom: Socrates

There is nothing either good or bad, but thinking makes it so: Shakespeware

Life is a message. Heed it: African Sepedi proverb

মানুষ যেভাবে নিজেকে এবং অন্য সবকিছুকে বিশ্লেষণ করছে, মহাবিশ্বের আর কেউ কিছু করছে কিনা আমাদের জানা নেই। তবু আমরা বলি, নিজেকেই চিনলাম না। এতকিছু জানি অথচ নিজেকে জানি না, বুঝি না, দেখি না। এই দুঃখ অনেকের মতো আমাকেও পীড়া দেয়, নিজেকে খুঁজতে গিয়ে বড় অসহায় বোধ করি। অজ¯্র প্রশ্ন জীবনের: কখন, কত, কাকে, কার, কি, কিভাবে, কে, কেন, কেমন, কোথায়, কোন। সৃষ্টির প্রথম মানুষটিও হয়ত একই চিন্তা করেছে, সব উত্তর কোনোদিন মিলবে না। আমি অন্যকে চিনি নানাভাবে, অন্যেরা আমাকে চিনে বিভিন্নরূপে কিন্তু আমি আমার নিজেকে চিনি না ভাল। ভিন্নজ্ঞান অর্জিত হয়, আত্মজ্ঞান হয় না অথচ নিজেকে জানায়ই সুখস্বস্তি অন্তর্শক্তি বৃদ্ধি পায়, চিত্ত হয় তৃপ্ত প্রশান্ত। 

মানুষনামক কী এক অদ্ভুত প্রাণী সৃষ্টি করেছে বিশ^কর্মা! অতলান্ত তার সুখবাসনা, এতই সে দুঃখকাতর, কী যে মধুর তার হাসি আর কান্না, কেমন যে উতলা করে তার স্নেহভালবাসা, কত যে তার আশা আর স্বপ্ন, নিরন্তর তার কর্মোদ্যোগÑআমি অবাক হয়ে নিজের দিকেই তাকিয়ে থাকি, আর ভাবি, মাত্র ৭০৮০ বছরের একটা জীবনে এতকিছু সে ধারণ করে কীভাবে? এই ক্ষুদ্র দেহের মধ্যে ক্ষুদ্র এক প্রাণ, ক্ষুদ্রতর এক মস্তিষ্কে কোমল ভঙ্গুর এক চেতনাÑতারই এত দেমাগ! পৃথিবীকে, বিশ্ববিধানকে, বিশ্ব¯্রষ্টাকে সে মানতে চায় নাÑবিদ্রোহ করে বলে ওঠে, ‘আমি বিদ্রোহী বিশ্ববিধাত্রীর  

যতই নীচহীন হোক অবস্থান, চলমান বিশে^ একটি অংশ আমি, তাই বিশে^ সাথে আমাকে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, বিশ^ নাট্যমঞ্চে আমার অংশটুকু অভিনয় করে যেতে হবে। সমাজে অন্যের কাছে আমি একজনপিতা’ ‘স্বামী’ ‘বন্ধু’ ‘ভাই’ ‘ভালমন্দ’ ‘সহকর্মী’ ‘রোগী’ ‘যাত্রী’ ‘দর্শক’ ‘মালিক’, ‘রাষ্ট্রদূতইত্যাদি অভিধায় পরিচিত কিন্তু নিজের কাছে আমি কে, কী রকম? অন্য অনেকের মতো আমারও খুব জানতে ইচ্ছা করে আমি কী? আমি কেন? আমি কতখানি, আমার শুরু শেষ কোথায়? দর্শন, ধর্ম, বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান সামান্য পড়লাম কিন্তু অন্যদের মতোই তাদের জবাবে আমারও আত্মতুষ্টি হচ্ছে না।  

পৃথিবীর জন্ম ৪৫৪ কোটি বছর আগে, সমুদ্র হয়েছে ৪৪০ কোটি এবংপ্রাণ’—এর উদ্ভব ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে। মানুষের জন্ম ৫০৭০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায়, সভ্যতার শুরু হল মাত্র দশহাজার বছর আগে। এই প্রাণময় পৃথিবীতে দশহাজার কোটি ধরনের জীবন/প্রজাতি আছে, মানুষ মাত্র এককোটি ধরনের প্রাণের খবর জানে, আমি যার একটি। 

রাসায়নিক জৈবরাসায়নিক উপাদান দিয়ে জীবদেহ গঠিত। এই জীবদেহস্থিত প্রাণ কী, জীবন কী? অনেকে বলেন এটা সজ্ঞান সচেতন ^াসপ্রশ^াসের শক্তি। জীবন হল এক বা একাধিক কোষ দিয়ে গঠিত মূর্ত অস্তিত্ব যার মধ্যে জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো বর্তমান: বিপাকক্রিয়া, ক্রমবর্ধন, পরিবেশে সাড়া দেয়া, জন্মদান করা, ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। আকার আকৃতি প্রকৃতি যা হোক, এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে লক্ষকোটি কোষ সম্বলিত জটিল বৃক্ষ প্রাণী সবারই জীবন আছে। ফুলও প্রকৃতির একটি আত্মা। মনুষ্য প্রজাতির অংশ বলে মানুষকে জানার আগ্রহ দমিয়ে রাখতে পারি না। কতকিছু যে আছে এই দেহভান্ডারে: মাংস রক্ত রস নিঃশ্বাস পরিপাক রেচন স্নায়ু প্রজনন হাড়। দৃশ্যমান মানবের মধ্যে যে অদৃশ্য নিয়ামকসমূহ রয়েছে, এই নিবন্ধে শুধু তাদের প্রতিই ক্ষুদ্র আলোকসম্পাত করব। 

Related Posts