৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্প ঃ ক্যানসাস নট উইদাউট লাফটারঃ ল্যাংস্টন হিউজ আবদুল্লাহ জাহিদ নিউইয়র্ক

বিশ শতকের প্রথমার্ধে আমেরিকার সাহিত্যভুবনে যে কজন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক নতুন ভাষা, নতুন চেতনা এবং নতুন আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ল্যাংস্টন হিউজ অন্যতম। কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সমাজ—পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি হার্লেম রেনেসাঁর প্রাণপুরুষদের একজন। তাঁর রচনায় বারবার ফিরে এসেছে আফ্রিকান—আমেরিকান জনগোষ্ঠীর হাসি—কান্না, বঞ্চনা, প্রেম, সংগ্রাম, সঙ্গীত ও স্বপ্নের গল্প।

১৯৩০ সালে প্রকাশিত নট উইদাউট লাফটার তাঁর প্রথম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। প্রকাশের পরই এটি ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে এবং হারমন গোল্ড মেডেল অর্জন করে। উপন্যাসটির পটভূমি ক্যানসাস স্টেটের একটি ছোট শহর স্ট্যান্টনÑযা মূলত লেখকের নিজের শৈশবের শহর লরেন্সের প্রতিরূপ। কিন্তু এটি কেবল একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠার গল্প নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, একটি সম্প্রদায়ের আত্মসংগ্রাম এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার এক মর্মস্পর্শী দলিল।

ল্যাংস্টন হিউজের নট উইদাউট লাফটার উপন্যাসের পটভূমি ক্যানসাস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য—পশ্চিমাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি গমক্ষেত, ছোট ছোট শহর, ধূলিমাখা রাস্তা এবং রেলপথের জন্য পরিচিত। উপন্যাসে স্ট্যান্টন নামে যে শহরের কথা বলা হয়েছে, সেটি আসলে লেখকের শৈশবের শহর ললেন্স—এর সাহিত্যিক রূপ।

অনেকের ধারণা, আমেরিকার বর্ণবাদ ও কৃষ্ণাঙ্গ জীবনের ইতিহাস মানেই দক্ষিণাঞ্চলের কথা। কিন্তু হিউজ দেখিয়েছেন, উত্তর বা মধ্য—আমেরিকাও বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতা থেকে মুক্ত ছিল না। ক্যানসাস ছিল দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। গৃহযুদ্ধের আগে এই অঞ্চলকে বলা হতো ইষববফরহম কধহংধং বা রক্তাক্ত ক্যানসাস, কারণ এখানে দাসপ্রথা—পন্থী ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তবু আইনি স্বাধীনতা কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করতে পারেনি।

উপন্যাসের ক্যানসাস তাই শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি একটি বৈপরীত্যের প্রতীক। একদিকে মুক্ত আকাশ, অসীম প্রান্তর, স্বাধীনতার স্বপ্ন; অন্যদিকে বর্ণগত বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতা।

গল্পটির সারক্ষেপ:

ক্যানসাসের ছোট্ট শহর স্ট্যান্টন। বিশ শতকের শুরুর আমেরিকা। শহরের এক কোণে কৃষ্ণাঙ্গদের পাড়া। সেখানে একটি ছোট্ট কাঠের বাড়িতে বাস করে স্যান্ডি নামে এক বালক।

স্যান্ডির পৃথিবী খুব বড় নয়। তার মা অ্যানি, বাবা জেস, নানি হ্যাগার এবং তিন খালা টেম্পি, হ্যারিয়েট ও জিমিÑএই মানুষগুলোকেই ঘিরে তার জীবন।

শৈশব থেকেই স্যান্ডি বুঝতে পারে, তাদের জীবন অন্যদের মতো নয়। শহরের সাদা মানুষদের বাড়ি বড়, রাস্তা পরিষ্কার, সুযোগ—সুবিধাও বেশি। আর তাদের পাড়ায় আছে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিদিনের সংগ্রাম।

তার বাবা জেস একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। তিনি বিশ্বাস করেন, কোথাও না কোথাও এমন একটি কাজ পাওয়া যাবে যা তাদের জীবন বদলে দেবে। তাই তিনি এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়ান কাজের সন্ধানে। কখনো নির্মাণশ্রমিক, কখনো রেললাইনের কর্মী।

বাবা যখন বাড়িতে থাকেন, তখন স্যান্ডির পৃথিবী আনন্দে ভরে ওঠে। জেস গান করেন, গল্প বলেন, ছেলেকে কোলে তুলে নেন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয় না। একদিন তিনি আবার কাজের সন্ধানে চলে যান।

বিদায়ের সময় তিনি স্ত্রী অ্যানিকে বলেন, ‘অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফিরব। টাকা পাঠাব। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

কিন্তু মাসের পর মাস কেটে যায়। টাকা খুব কম আসে, চিঠিও আসে না নিয়মিত।

অ্যানি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সংসারের খরচ চালাতে তিনি সাদা মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করেন, তবু অভাব ঘোচে না।

এই কঠিন সময়ে পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন নানি হ্যাগার।

হ্যাগার একজন বৃদ্ধা কৃষ্ণাঙ্গ নারী। জীবনের অধিকাংশ সময় দারিদে্র্যর সঙ্গে লড়াই করে কাটিয়েছেন। তিনি জানেন, কাঁদলে অভাব দূর হয় না।

তাই তিনি সবাইকে আগলে রাখেন। অ্যানি কাঁদলে তিনি সান্ত্বনা দেন। স্যান্ডি ভয় পেলে তাকে বুকে টেনে নেন। পরিবারে ঝগড়া লাগলে তিনি মীমাংসা করেন।

হ্যাগারের বিশ্বাস, ঈশ্বর মানুষকে পরীক্ষা করেন, কিন্তু একেবারে ত্যাগ করেন না।

স্যান্ডি নানিকে খুব ভালোবাসে। তার কাছে নানি যেন একটি বিশাল বটগাছ, যার ছায়ায় সবাই আশ্রয় নেয়। কিন্তু পরিবারের সবাই নানির মতো নয়। স্যান্ডির খালা টেম্পি বেশ সচ্ছল। তিনি পরিচ্ছন্ন বাড়িতে থাকেন, নিয়মিত গির্জায় যান, সমাজে সম্মানিত। টেম্পির বিশ্বাস, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের উন্নতি করতে হলে সাদা সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হবে। ভদ্র হতে হবে, শিক্ষিত হতে হবে, বিতর্ক এড়িয়ে চলতে হবে।

অন্যদিকে হ্যারিয়েট যেন ঝড়ের মতো এক তরুণী। সে গান গায়, হাসে, নাচে, প্রেম করে, জীবনকে উপভোগ করে। তার কাছে পৃথিবী মানে স্বাধীনতা।

হ্যারিয়েটের উচ্ছলতা স্যান্ডিকে মুগ্ধ করে। যখন হ্যারিয়েট গান গায়, মনে হয় পুরো পৃথিবী যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

কিন্তু নানি ও টেম্পি প্রায়ই তার ওপর বিরক্ত হন। তাদের মনে হয়, হ্যারিয়েট খুব বেপরোয়া। একদিন হ্যারিয়েট পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের জীবন বেছে নেয়। এ নিয়ে বড় ধরনের অশান্তি শুরু হয়। নানি হ্যাগার কষ্ট পান। টেম্পি ক্ষুব্ধ হন। অ্যানি চিন্তিত হয়ে পড়েন।

আর ছোট্ট স্যান্ডি অবাক হয়ে দেখে, একই পরিবারের মানুষ কত ভিন্ন হতে পারে।

এদিকে স্কুলে গিয়ে স্যান্ডি আরেকটি পৃথিবীর মুখোমুখি হয়। সে বুঝতে শেখে, তার গায়ের রং তার ভাগ্যকেও প্রভাবিত করছে। অনেক সময় সাদা ছেলেমেয়েরা তাকে অবজ্ঞা করে। কখনো সে অপমানিত হয়। কখনো নিজেকে একা মনে হয়।

তবু সে পড়াশোনা করে, বই পড়ে, মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে।

ধীরে ধীরে সে বুঝতে শেখে যে পৃথিবী শুধু সাদা—কালো নয়; মানুষের ভেতরেও অসংখ্য রং লুকিয়ে আছে। এই সময় স্যান্ডির জীবনে সবচেয়ে বড় শিক্ষক হয়ে ওঠে জীবন নিজেই।

সে দেখে, তার মা প্রতিদিন কষ্ট করেন। সে দেখে, নানি অভাবের মধ্যেও মর্যাদা ধরে রাখেন। সে দেখে, টেম্পি সম্মানের জন্য সংগ্রাম করেন। সে দেখে, হ্যারিয়েট স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। সে দেখে, তার বাবা ভালো মানুষ হয়েও দায়িত্বের কাছে বারবার হেরে যান।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্যান্ডি বড় হতে থাকে। তার চোখের সামনে নানি বৃদ্ধ হয়ে পড়েন। পরিশ্রমে ক্ষয় হয়ে যাওয়া শরীর আর আগের মতো কাজ করতে পারে না। পরিবারের সেই অদম্য শক্তির উৎস ধীরে ধীরে নিভে আসতে থাকে।

স্যান্ডি প্রথমবার উপলব্ধি করে, জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদেরও একদিন হারিয়ে যেতে হয়। এই উপলব্ধি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

অন্যদিকে তার বাবা জেস মাঝেমধ্যে ফিরে আসেন। কিন্তু প্রতিবারই স্যান্ডি বুঝতে পারে, বাবার স্বপ্নগুলো আর আগের মতো উজ্জ্বল নেই। জীবন তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। উপন্যাসের শেষভাগে স্যান্ডি আর শিশু থাকে না।

সে শিখে যায়, মানুষের জীবন কখনো সরল নয়। একই মানুষ একসঙ্গে ভালোও হতে পারে, দুর্বলও হতে পারে। একই পরিবারের মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও কষ্ট দিতে পারে। দারিদ্র্য মানুষকে ভাঙে, আবার শক্তও করে। বর্ণবাদ মানুষকে আঘাত করে, কিন্তু তার আত্মাকে পুরোপুরি হত্যা করতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা, স্যান্ডি শিখে যায় যে জীবন শুধু কান্নার নয়।

অভাব আছে। অপমান আছে। বিচ্ছেদ আছে। তবু আছে গান, ভালোবাসা, হাসি এবং আশা। এই উপলব্ধিই উপন্যাসের নামের অর্থকে সত্য করে তোলেÑ নট উইদআউট লাফটার।

অর্থাৎ, জীবনে যতই দুঃখ আসুক, মানুষ কেবল কান্না নিয়ে বাঁচে না। কোথাও না কোথাও একটি হাসি থেকে যায়। সেই হাসিই মানুষকে টিকিয়ে রাখে, সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়।

আর সেই হাসির সন্ধানেই ছোট্ট স্যান্ডির শৈশব থেকে যৌবনের পথে যাত্রা সম্পূর্ণ হয়।

নট উইদআউট লাফটার কোনো বীরত্বগাথা নয়, কোনো রহস্যোপন্যাসও নয়। এটি সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনসংগ্রামের গল্প।

স্যান্ডির শৈশবের মাধ্যমে ল্যাংস্টন হিউজ দেখিয়েছেন কীভাবে একটি শিশু পরিবার, সমাজ, বর্ণবাদ, ধর্ম, প্রেম এবং শিল্পের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় খুঁজে পায়।

উপন্যাসের শেষে স্যান্ডি শুধু বড় হয় না; সে পৃথিবীকে বুঝতে শেখে। আর সেই বোঝাপড়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে উপন্যাসটির সৌন্দর্য।

Related Posts