কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—১৬ ব্যাংকনোটে যুদ্ধ ও শূন্যের মহোৎসব || আখতার আহমেদ রাশা
মুদ্রা সংগ্রাহকদের অ্যালবামে অতি—মুদ্রাস্ফীতির সময়কার একেকটি নোট যেন ইতিহাসের এক একটি জীবন্ত দলিল। এগুলো কেবল কাগজের মুদ্রা নয় বরং কোনো একটি স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক পতনের বাস্তব ও চাক্ষুষ প্রমাণ। এই নোটগুলোতে বিলিয়ন বা ট্রিলিয়নের মতো অবিশ্বাস্য সব সংখ্যা দেখা যায় কিংবা আগের নোটের ওপরই নতুন দাম সিল মেরে দেওয়া হয়। সংগ্রাহকরা এগুলো জমিয়ে রাখেন শুধু এর পেছনের আকর্ষণীয় ইতিহাস এবং সেই সময়ের সংকটের ভয়াবহতা অনুধাবন করার জন্য। যখন কোনো দেশে মুদ্রাস্ফীতি চরম আকার ধারণ করে, তখন সেই দেশের নোটগুলোর ওপর শূন্যের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা দেখতে যতটা অদ্ভুত, তার পেছনের ইতিহাস ততটাই চমকপ্রদ। স্বাভাবিক সময়ে নোটে মুদ্রিত সংখ্যার একটি সুনির্দিষ্ট আর্থিক মান থাকে। তবে ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়Ñভুল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতায় যখন কোনো দেশের অর্থনীতিতে ‘চরম মুদ্রাস্ফীতি’ বা ঐুঢ়বৎরহভষধঃরড়হ দেখা দেয়, তখন সেই কাগজের নোটের মূল্য কর্পূরের মতো উড়ে যায়। রাতারাতি নোটের গায়ে বাড়তে থাকে শূন্যের সংখ্যা। লাখ ছাড়িয়ে কোটি, কোটি ছাড়িয়ে বিলিয়ন, ট্রিলিয়ন কিংবা কুইন্টিলিয়নের দানবীয় নোট বাজারে আসে। আজ আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে কাগজের মুদ্রার এমন কিছু অবিশ্বাস্য ও হাহাকারের গল্প শুনব, যেখানে কোটি টাকার নোটও পরিণত হয়েছিল মূল্যহীন কাগজে। (পাঠকদের সুবিধার্থে এই প্রবন্ধে বড় সংখ্যার হিসাবগুলো আন্তর্জাতিক ‘শর্ট স্কেল’ বা আমেরিকান পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহার করা হয়েছে; যেখানে ১ বিলিয়ন = ১০০ কোটি এবং ১ ট্রিলিয়ন = ১ লক্ষ কোটি।)
চরম মুদ্রাস্ফীতির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া রেকর্ডটি গড়েছিল হাঙ্গেরি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ সালে দেশটির অর্থনীতি এমনভাবে ভেঙে পড়ে যে প্রতিদিন পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেত। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাঙ্গেরি সরকার বাজারে নিয়ে আসে ১০০ মিলিয়ন পেনগো (১০০,০০০,০০০ চবহমড়)—র নোট। কিন্তু তাতেও যখন কুলাচ্ছিল না, তখন তারা সংখ্যার পেছনে না ছুটে নতুন একক ‘মিলপেনগো’ (১০ লক্ষ পেনগো) এবং ‘বি.—পেনগো’ (১ লক্ষ কোটি পেনগো) চালু করে। এই সংকটের চূড়ান্ত ধাপে তারা বাজারে ছেড়েছিল ১০০ কুইন্টিলিয়ন বি.—পেনগোর নোট! সংখ্যাটি লিখতে ১—এর পিঠে ২০টি শূন্য বসাতে হতো। শেষ পর্যন্ত চরম মুদ্রাস্ফীতির কবলে পড়ে এই কাগজের টুকরোগুলো স্রেফ মূল্যহীন আবর্জনায় পরিণত হয়েছিল, যা ঝাড়ুদারদের রাস্তার ময়লার সাথে পরিষ্কার করতে হতো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানির (তৎকালীন ওয়েইমার প্রজাতন্ত্র) ওপর যখন বিজয়ী রাষ্ট্রগুলো বিশাল যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চাপিয়ে দিল, তখন জার্মান সরকার দেদারসে মুদ্রা ছাপাতে শুরু করে। এর ফলে ১৯২৩ সালে জন্ম নেয় বিখ্যাত ৫ বিলিয়ন মার্কের (৫,০০০,০০০,০০০ গধৎশ) মতো দানবীয় নোট। তখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, এক জোড়া জুতো কিংবা সামান্য কিছু খাবার কিনতে মানুষ ব্যাগে করে নয়, হাতগাড়িতে (ডযববষনধৎৎড়ি) করে টাকার বান্ডিল নিয়ে বাজারে যেত। কাঠের চেয়ে কাগজের নোট সস্তা হয়ে যাওয়ায় কনকনে শীতের রাতে মহিলারা ঘরের উনুনে জ্বালানি হিসেবে টাকার বান্ডিল ব্যবহার করতেন, আর শিশুরা ঘরের মধ্যে টাকার বান্ডিল দিয়ে খেলনা ঘর বানিয়ে খেলত!
জার্মানির এই চরম মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা লেগেছিল ভূমধ্যসাগরীয় দেশ গ্রিসেও যা বিশ্ব ইতিহাসের পঞ্চম ভয়াবহতম অতি—মুদ্রাস্ফীতির দেশ হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এবং দখলদার বাহিনীর নির্মম শাসনে গ্রিসের জাতীয় মুদ্রা ‘দ্রাখমা’র মান একবারে ধূলোয় মিশে যায়। ১৯৪৪ সালের অক্টোবর নাগাদ দেশটির অর্থনৈতিক বিপর্যয় এমন চরম রূপ নেয় যে, মাসিক মুদ্রাস্ফীতি গিয়ে ঠেকে আকাশছোঁয়া ১৩,৮০০ শতাংশে! সহজ কথায়, যেকোনো জিনিসের দাম মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই শত গুণ বেড়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষের পকেটে থাকা টাকা এতটাই অর্থহীন হয়ে পড়েছিল যে গ্রিস সরকার বাজারে ১০০ বিলিয়ন দ্রাখমার মতো দানবীয় নোট ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু তাতেও হাহাকার কমেনি বরং সাধারণ মানুষের সারাজীবনের কষ্টার্জিত পুঁজি রাতারাতি মূল্যহীন কাগজে রূপ নেয়।
মুদ্রাস্ফীতির ইতিহাসে এক অনন্য ও নাটকীয় অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার শুরুর দিনগুলো। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধের ধাক্কায় দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন সোভিয়েত সরকার তখন দেদারসে কাগজের মুদ্রা (ঝড়াুহধশং) ছাপাতে থাকে যার ফলে রুবলের মান কাগজের চেয়েও সস্তা হয়ে যায়। অবস্থা এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে মাত্র তিন বছরের মধ্যে সরকারকে তিন—তিনবার নোটের গা থেকে ‘শূন্য’ কাটার (মুদ্রার পুনর্মূল্যায়ন) ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রথমে ১৯২২ সালে ১০,০০০ পুরনো রুবল বদলে ১টি নতুন রুবল করা হয় (অর্থাৎ রাতারাতি ৪টি শূন্য উধাও)। পরের বছরই আবার ১০০ রুবলকে বদলে করা হয় মাত্র ১ রুবল। অবশেষে ১৯২৪ সালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫০,০০০ পুরনো রুবলের বদলে ১টি স্থায়ী ও খাঁটি সোনালি রুবল (ঈযবৎাড়হবঃং) চালু করা হয়। পুরো হিসাবটা করলে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড় হবে—১৯২৪ সালের মাত্র ১টি স্থায়ী রুবল পেতে গেলে, ১৯২২ সালের আগের অবিশ্বাস্য ৫০ বিলিয়ন (৫,০০০ কোটি) রুবল জমা দিতে হতো!
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী চরম মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৯৯৩ সালের শেষভাগে তারা বাজারে ছাড়ে ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যার নোট—৫০০ বিলিয়ন (৫০০,০০০,০০০,০০০) দিনারা! ৫—এর পিঠে ১১টি শূন্য থাকা এই বিশাল নোটটিতে স্থান পেয়েছিলেন দেশটির শিশুসাহিত্যিক ও কবি জোভান জোভানোভিচ জুমায়। একজন সংগ্রাহক হিসেবে এই নোটটির দিকে তাকালে মুদ্রাস্ফীতির এক চরম অবক্ষয় চোখে পড়ে। সরকারের কাছে তখন নতুন নোটের নকশা করার মতো সময় বা অর্থ কোনোটিই ছিল না। তাই তারা আগের একটি সাধারণ নোটের ব্যাকগ্রাউন্ডের রঙ সামান্য বদলে, তাতে কেবল শূন্যের সংখ্যা বাড়িয়ে এই নোটটি বাজারে ছেড়ে দেয়। কিন্তু নির্মম সত্য হলো প্রতি ১৬ ঘণ্টায় যেখানে পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেত, সেখানে এই ৫০০ বিলিয়ন দিনারার নোটটির আয়ু ছিল বড়জোর কয়েক দিন। এই বিপুল অঙ্কের টাকা পকেটে নিয়ে বাজারে গিয়েও সাধারণ মানুষ এক লিটার দুধ বা এক হালি ডিম কিনতে পারত না। এটি পরিণত হয়েছিল স্রেফ একটি মূল্যহীন রঙিন কাগজে।
চরম মুদ্রাস্ফীতি কেবল দূর অতীতের কোনো গল্প নয়, আমাদের এই একবিংশ শতাব্দীও এর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবে সরকারের ভুল অর্থনৈতিক নীতি ২০০৮ সালে দেশটির মুদ্রাকে পাতালে নামিয়ে আনে। জিম্বাবুয়ে সরকার প্রথমে ৫০ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তীতে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট বাজারে ছাড়ে। এই নোটগুলোর ওপর প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ‘ব্যালেন্সিং রকস’—এর ছবি ছিল যা এক নির্মম রসিকতা। কারণ দেশটির অর্থনীতি তখন পুরোপুরি ভারসাম্যহীন!
একই চিত্র আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক সময়ে খনিজ তেলে সমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলাতেও। ২০২১ সালে তারা বাজারে আনে ১ মিলিয়ন (১০ লক্ষ) বলিভারের নোট যা দিয়ে বড়জোর এক কাপ কফি কেনা সম্ভব হতো। সেখানে মানুষ কাগজের নোটের কোনো মূল্য না পেয়ে তা দিয়ে পার্স, ব্যাগ বা নানারকম হস্তশিল্প তৈরি করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে শুরু করে; কারণ নোটের ফেস ভ্যালুর চেয়ে সেই কাগজের তৈরি ব্যাগের দাম অনেক বেশি পাওয়া যেত।
তবে মজার ব্যাপার হলো, মুদ্রার গায়ে বড় সংখ্যা মানেই কিন্তু অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব নয়। যেমন—ইন্দোনেশিয়ার বাজারে বর্তমানে ১ লক্ষ (১০০,০০০) রুপিয়ার নোট বেশ দাপটের সঙ্গেই চলছে। এটি কোনো অর্থনৈতিক ধসের ফল নয়, বরং দেশটির দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক মুদ্রা মানের ধারাবাহিকতা। এই একটি নোটের ক্রয়ক্ষমতা বেশ ভালো এবং এটি একটি অত্যন্ত স্থিতিশীল অর্থনীতিকে নির্দেশ করে।
অর্থনীতির ইতিহাসে এই বিশাল অঙ্কের নোটগুলো হয়তো চরম ব্যর্থতা, হাহাকার এবং মানবীয় সংকটের প্রতীক। কিন্তু একজন মুদ্রা সংগ্রাহক বা ইতিহাসপ্রেমীর চোখে এই নোটগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। যে কাগজের মুদ্রা একসময় একটি জাতিকে দেউলিয়া করে দিয়েছিল সময়ের বিবর্তনে আজ তা বিশ্বজুড়ে সংগ্রাহকদের অ্যালবামে এক অনন্য স্মারক হিসেবে বেঁচে আছে। এই নোটগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অর্থনীতির মৌলিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুধু কাগজের বুকে বড় বড় সংখ্যা আর শূন্য ছাপালেই সম্পদ তৈরি হয় না, প্রকৃত সম্পদ থাকে মানুষের পরিশ্রমে আর স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায়।
