২৫০ বছরের আত্মানুসন্ধানে আমেরিকা || ড. জীবন বিশ্বাস
২০২৬ সালের ৪ জুলাই, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী। ক্যালেন্ডারের পাতায় এই দিনটিকে কেন্দ্র করে সাজ সাজ রব উঠছে আটলান্টিক থেকে প্যাসিফিকের অববাহিকায়। রজত—জয়ন্তী কিংবা সুবর্ণ—জয়ন্তীর সীমানা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পা রাখলো তার ২৫০ বছর পূর্তির এক মাহেন্দ্রক্ষণে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের দ্বিপ্রহরে কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণাপত্রটি গ্রহণ করেছিল। যদিও চর্মপত্রের সেই ঐতিহাসিক দলিলে প্রতিনিধিদের কালির আঁচড় ও স্বাক্ষর পড়তে পড়তে আগস্টের ২ তারিখ গড়িয়ে গিয়েছিল, তবু ইতিহাসের এই সূক্ষ¥ চাতুর্যকে পাশ কাটিয়ে জুলাইয়ের চার তারিখটিই আমেরিকার রাজনৈতিক চেতনা ও নাগরিক স্মৃতির মনিকোঠায় স্বাধীনতার এক শাশ্বত প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে। আমেরিকার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের মহতী উদ্যোগের শঙ্খধ্বনি আজ চারদিকে। আমেরিকার এই আড়াইশো বছরের জন্মতিথিতে ৩৫০ মিলিয়ন আমেরিকান তাদের হৃদয়ের স্পন্দনকে এক সুতোয় বেঁধে নেয়ার আয়োজনে ব্যস্ত। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
আমেরিকার এই পরম লগ্নটিকে কেবল আকাশের বুকে বর্ণিল আতশবাজির ক্ষণস্থায়ী উৎসব, চটুল জাঁকজমক কিংবা অন্ধ দেশপ্রেমের সস্তা অলংকারে মুড়িয়ে রাখার উৎসব হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এটি মূলত গভীর নাগরিক আত্মদর্শনের এক পরম ক্ষণ। আড়াই শতক আগে স্বাধীনতার সেই অমোঘ সনদে ঘোষণা করা হয়েছিলÑসরকারের ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতার উৎস হলো জনগণের আন্তরিক সম্মতি। এই বাক্যটি সে যুগে কেবল এক বৈপ্লবিক উচ্চারণই ছিল না, বরং এর অন্তর্নিহিত শক্তি আমেরিকাকে পরিমাপ করার এক চিরন্তন নৈতিক মানদন্ড তৈরি করে দিয়েছিল। দাসপ্রথার কলঙ্ক, আদিবাসী উচ্ছেদের ট্র্যাজেডি, বর্ণবিদ্বেষ, নারীর ভোটাধিকারের দীর্ঘ লড়াই, নাগরিক ও শ্রমিকের অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কিংবা ইমিগ্রান্টদের আত্মীকরণÑসবকিছু মিলিয়ে আমেরিকার ইতিহাস আসলে এক চিরন্তন দ্বন্দ্বের মহাকাব্য। একদিকে তার আকাশচুম্বী বিত্তবৈভব ও গণতান্ত্রিক আদর্শ, অন্যদিকে রূঢ় বাস্তবতার ধুলোবালি। আমেরিকার প্রতিষ্ঠার ২৫০ বছর পর এর সমাজের প্রধান দায়িত্ব হলো, এই বিতর্ক শেষ হয়ে গেছে বলে ভান করা নয়, বরং এই চিরন্তন সত্যের মন্থনই যে এক জীবন্ত গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা, তা বিনম্রচিত্তে স্বীকার করা।
আমেরিকার এই মহাজাগতিক গল্পের সবচেয়ে অমোঘ সত্যটি লুকিয়ে আছে তার শিকড়ে। এই দেশ কখনো শুধু রক্ত বা বংশপরম্পরার নিগড়ে বাঁধা কোনো ভূখন্ড ছিল না। এটি হলো দূর—দূরান্ত থেকে মানুষের আগমন, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রতিনিয়ত ভাঙাগড়ার এক অনন্ত চক্রের লীলাক্ষেত্র। আদমশুমারি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এখানে জন্ম নেওয়া মানুষের বাইরেও ভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২.৬ মিলিয়ন। আর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা ৫.২ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল শুষ্ক পরিসংখ্যানের খেরোখাতা নয়, এগুলো মূলত আমেরিকার সেই সনাতন জাদুকরী শক্তির সাক্ষ্য, যা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের মানুষের সুপ্ত আকাক্সক্ষা, ঘাম ও মেধাকে দেশের অর্থনৈতিক প্রাচুর্য, সংস্কৃতি ও যুগান্তকারী আবিষ্কারে রূপান্তর করতে পারে।
ইমিগ্রান্টরা এই সাম্রাজ্যের কেবল প্রান্তিক সেবক হয়ে থাকেননি, তাঁরা সুদৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন এর কেন্দ্রীয় বেদীতে। ‘ফরচুন ৫০০’ কোম্পানির তালিকায় চোখ বোলালে দেখা যায়, এর মধ্যে ২৩১টি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন কোনো না কোনো ইমিগ্রান্ট অথবা তাঁদের উত্তরসূরীরা। ২০২৪ অর্থবছরে এই অতিকায় প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে যে বিপুল রাজস্ব আয় করেছে, তা বিশ্বের বহু দেশের সম্মিলিত জিডিপির চেয়েও বেশি, এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। বিজ্ঞানের আলোছায়াময় জগতেও এই সত্য সমান উজ্জ্বল। গত একশত পঁচিশ বছরে রসায়ন, চিকিৎসা ও পদার্থবিজ্ঞানে আমেরিকার ঝুলিতে আসা নোবেল পুরস্কারের এক বিশাল অংশ অলঙ্কৃত করেছেন এ দেশে আসা ইমিগ্রান্টরা। আর বিংশ শতাব্দীর সূর্য ঢলার পর এই হার প্রায় ৪০ শতাংশে ঠেকেছে। সমাজতত্ত্বের এই পাঠ অত্যন্ত সরল ও অকাট্য; আমেরিকা যখনই বিশ্বমেধাকে উদার হৃদয়ে বরণ করেছে, তখন সে নিজে কখনো রিক্ত হয়নি, বরং তার নিজের দিগন্তই আরও প্রসারিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।
উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার আঙিনায় এই অবদানের রূপরেখা আরও স্পষ্ট। মার্কিন পেটেন্টধারীদের ওপর পরিচালিত দীর্ঘদিনের গবেষণায় উঠে এসেছে, ইমিগ্রান্টরা মোট উদ্ভাবকের সামান্য অংশ হলেও সামগ্রিক পেটেন্টের এক—চতুর্থাংশের কাছাকাছি অবদান তাঁদেরই। ২০২৫ সালের পেটেন্ট দপ্তরের প্রতিবেদনও এই সত্যই প্রমাণ করে। এর থেকে প্রতিপন্ন হয় যে, ইমিগ্রেশন কোনো দয়ার দান বা নিছক মানবিক প্রশ্ন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। নিরাপত্তার অজুহাতে যে রাষ্ট্র নিজের মনের জানালা ও জ্ঞানের দুয়ার বন্ধ করে দেয়, সে হয়তো একদিন টের পাবেÑনিরাপত্তার ভিতেই সে আসলে কুঠারাঘাত করে বসে আছে।
মানবসভ্যতার জ্ঞানভান্ডারে আমেরিকার বৈজ্ঞানিক জয়যাত্রা সম্ভব হয়েছে তার অনন্য বাস্তুতন্ত্রের কারণে। যেখানে সরকারি অনুদান, খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি উদ্যোগের সাথে এসে মিশেছে বহিরাগত মেধার প্রাণরস। গবেষণার পেছনে দেশটির বার্ষিক ব্যয় আজ প্রায় ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই অনন্য জ্ঞান—সংস্কৃতিই ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো—১১—এর পিঠে চড়িয়ে মানুষকে চাঁদের মাটিতে প্রথম পদচিহ্ন আঁকার স্পর্ধা দিয়েছিল, আরপানেটের হাত ধরে দিয়েছিল আধুনিক ইন্টারনেটের রূপ, এবং হিউম্যান জিনোম প্রজেক্টের মাধ্যমে উন্মোচন করেছিল জীবনের গোপন কোড। আর অতি সম্প্রতি মহামারীর ক্রান্তিকালে এমআরএনএ ভ্যাকসিনের অতি দ্রুত বিকাশ প্রমাণ করেছে, নিভৃত গবেষণাগারের মৌলিক বিজ্ঞান কিভাবে মানবজাতির রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারে।
তবুও, এই আড়াইশো বছরের সন্ধিক্ষণ কেবল অহংকারের নয়, তীব্র বিনয়েরও আহ্বান জানায়। বৈজ্ঞানিক বা অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয় যে পূর্বপুরুষের স্মৃতির ওপর ভর করে তা টিকে থাকবে। একে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন মুক্ত বুদ্ধিচর্চা, শিক্ষার প্রসার, নৈতিক প্রযুক্তির বিকাশ এবং সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। আমেরিকার আগামী দিনের পথচলা নির্ধারিত হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জলবায়ু সংকট মোকাবেলা এবং মহাকাশ অভিযানের মতো দুরূহ ক্ষেত্রে। আর এই সমস্ত অর্জনের জন্য কেবল কাড়ি কাড়ি অর্থই শেষ কথা নয়, প্রয়োজন অগাধ জনআস্থা এবং বিশ্বের তাবৎ মুক্তচিন্তার মানুষদের জন্য নিজের দরজা উন্মুক্ত রাখার অনন্য সাহস।
আমেরিকার এই ২৫০তম বার্ষিকীকে কোনো সমাপ্তি বা পূর্ণতার নিরেট স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। একে দেখতে হবে মেরামতের এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার হিসেবে। এই প্রজাতন্ত্রের প্রকৃত মহত্ত্ব কখনো ভুল না করার ভান করার মধ্যে লুকিয়ে ছিল না; বরং নিজের ভুলগুলোকে সাহসের সাথে চিহ্নিত করে এক সুদূরপ্রসারী ও উন্নততর ভবিষ্যৎ দাবি করার মধ্যেই ছিল তার সার্থকতা। আড়াইশো বছরের এই মোহনায় দাঁড়িয়ে আমেরিকা যদি শুধু তার অতীত বিজয়গাথার রোমন্থন করে, তবে সে কেবল আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে; আর যদি শুধু তার ঐতিহাসিক অন্যায়গুলোর গ্লানিতে ডুবে থাকে, তবে সে নৈরাশ্যের অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। আর তাই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে আমেরিকার ‘খোলানীতি’—কেই আবার আলিঙ্গন করতে হবে।
গভীর দেশপ্রেম কখনো উগ্র অহংকার বা তীব্র হতাশার জন্ম দেয় না; তা আসলে এক গভীর দায়িত্বশীলতার উন্মেষ ঘটায়। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই হোক এক নতুন শপথের দিনÑযেখানে থাকবে না কোনো বর্জনের রাজনীতি বা কোনো অন্ধ অহংকার। ইমিগ্রেশনকে বলির পাঁঠা না বানিয়ে আগের মতোই জড়িয়ে নেওয়া হোক পরম মমতায় এবং গভীর আস্থায়। এই দেশ পৃথিবীর সভ্যতার চাকা সচল রেখেছে তখনই, যখন সে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেছে এবং জ্ঞানকে সমাদরে বরণ করেছে। আগামী আড়াইশো বছরের ইতিহাস নির্ভর করছে এই প্রাচীন সত্যটিকে আমেরিকা কতটা বুকে আগলে রাখতে পারছে, ঠিক তার ওপর। ২৫০ বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমেরিকা ব্রতী হোক তার আত্মানুসন্ধানে।
পৃথিবীর সকল শান্তিকামী মানুষের জন্য আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস, ৪ জুলাইয়ের শুভেচ্ছা ।
