২৪ বছর পর আবারো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল যুক্তরাষ্ট্র
স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল এক অপূর্ণ স্বপ্নের গল্প। ২০০২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর বারবারই থেমে গেছে তাদের নকআউট যাত্রা। কখনো প্রতিপক্ষের শক্তিতে, কখনো নিজেদের সীমাবদ্ধতায়। কিন্তু এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন দুই ফরয়ার্ড ফলারিন বালোগুন ও মালিক টিলম্যান। একজন গোল করে পথ খুলে দিলেন, অন্যজন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের শেষ স্পর্শ হিসেবে ফ্রি—কিকে গোল করে নিশ্চিত করলেন জয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২—০ গোলে হারিয়ে ২৪ বছর পর আবারো বিশ্বকাপের নকআউটে জয় তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র। বেঁচে রইল তাদের ‘আমেরিকান ড্রিম’।
স্বাগতিকদের কোচ মরিসিও পচেত্তিনোর জন্য ম্যাচটি ছিল প্রত্যাশার পরীক্ষা। ইনজুরি কাটিয়ে দলে ফিরেছেন অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ান পুলিসিক, নিয়মিত একাদশের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ও ছিলেন ফিট। অন্যদিকে বসনিয়ার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে খেলার সুযোগ পেয়েছিল। তাই শুরু থেকেই ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে চেয়েছিল সের্গেই বারবারেজের দল।
ম্যাচের প্রথম কয়েক মিনিটে সেই পরিকল্পনার ছাপও দেখা যায়। গোলরক্ষক নিকোলা ভাসিলজ লম্বা বল তুলে দিচ্ছিলেন অভিজ্ঞ এদিন জেকোর দিকে। জেকো সেগুলো নামিয়ে সতীর্থদের আক্রমণে যুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। সে কৌশল থেকেই ম্যাচের প্রথম সুযোগ তৈরি হয়। এরমেদিন ডেমিরোভিচের শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন মার্কিন গোলরক্ষক ম্যাট রিস। এরপর আলাজবেগোভিচ কর্নার থেকেই অলিম্পিক গোলের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেখানেও সতর্ক ছিলেন রিস। শুরুর সেই চাপ কাটিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আগের ম্যাচগুলোর মতো প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যেই গোল না এলেও বলের দখল, পাসের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণের ধার সবই ছিল পচেত্তিনোর দলের হাতে। ফলারিন বালোগুন প্রথম বড় সুযোগটি পেলেও বক্সের ভেতরে বল ঠিকভাবে সংযোগ করতে পারেননি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য। অ্যান্টোনি রবিনসন কাছ থেকে শট নিয়েও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি। অন্যদিকে মার্কিনদের উঁচু প্রেসিংয়ের সামনে বসনিয়া যেন দুই—তিনটি পাসও একসঙ্গে খেলতে পারছিল না। মাঝমাঠে ওয়েস্টন ম্যাককেনি, টাইলার অ্যাডামস ও মালিক টিলম্যানের চাপে বারবার বল হারাচ্ছিল বলকান প্রতিনিধিরা।
সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছেন বালোগুন। কখনো পেনাল্টির আবেদন করেছেন, কখনো অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়েছে। একটি আক্রমণে টিলম্যান দুর্দান্তভাবে বল উদ্ধার করে ম্যাককেনিকে দেন, সেখান থেকে বালোগুন বল জালে জড়ালেও ভিএআরের সিদ্ধান্তে গোলটি বাতিল হয়। তবু থেমে থাকেননি তিনি।
প্রথমার্ধের একেবারে শেষ দিকে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। টিলম্যানের নিখুঁত থ্রু পাস, রাদেলজিচের হালকা ডিফ্লেকশন আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বক্সের ভেতরে শরীর দিয়ে ডিফেন্ডারকে আড়াল করে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন বালোগুন। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল তার তৃতীয় গোল। বিরতির যোগ করা সময়ে ব্যবধান আরো বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সার্জিনিও ডেস্টের ক্রস থেকে নেয়া শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটেন বসনিয়ার কোচ বারবারেজ। মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে তিনজনকে বদলি নামান। ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়েন অভিজ্ঞ অধিনায়ক এদিন জেকো। মাঝমাঠেও আনা হয় নতুন মুখ। লক্ষ্য ছিল সংখ্যায় বাড়তি শক্তি এনে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা। এর পরই নাটকীয় মোড় নেয় ম্যাচ। একটি কঠোর ট্যাকলের জন্য সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন বালোগুন। মুহূর্তেই নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হন তিনি। ১০ জনের দলে পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্র। সংখ্যাগত সুবিধা পেয়ে বসনিয়াও নতুন করে সাহস ফিরে পায়। দীর্ঘ সময় পর তারা কয়েকটি ভালো আক্রমণ গড়ে তোলে এবং মার্কিন রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে।
তবে খেলোয়াড় কম নিয়েও ভেঙে পড়েনি পচেত্তিনোর দল। বরং রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রেখে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ওঠে তারা। ম্যাচের শেষ দিকে পুলিসিক বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেই গোল বাতিল হয়। তাতে অবশ্য হতাশ হওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
শেষ পর্যন্ত ব্যবধান দ্বিগুণ করেন টিলম্যান। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি—কিক থেকে অসাধারণ শটে বল জালে জড়িয়ে ম্যাচের ভাগ্য চূড়ান্ত করে দেন তিনি। পুরো ম্যাচে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, বল উদ্ধার, সুযোগ তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত গোল সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের অন্যতম স্থপতি টিলম্যান।
এ জয়ের মাধ্যমে ২৪ বছর পর আবারো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল যুক্তরাষ্ট্র। ২০০২ সালে শেষবার তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার শেষ ষোলো নিশ্চিত করল পচেত্তিনোর দল। পরের রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। সেই ম্যাচ ফিরিয়ে আনবে ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের স্মৃতি, যখন শেষ ষোলোয় অতিরিক্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়েছিল বেলজিয়ানরা। এবার সেই হারের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ থাকবে মার্কিনদের সামনে। আর সেই লড়াইয়ে জয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলে সম্ভাবনার দল হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র। এবার সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার পথে আরো একটি ধাপ এগিয়ে গেল। বালোগুনের গোল, টিলম্যানের নৈপুণ্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে এখনো বেঁচে আছে তাদের বহু প্রতীক্ষিত ‘আমেরিকান ড্রিম’।
