১৬ বছরের দোহাই দেওয়ার আগে ভিত্তিচিত্রটি দিন মোহাম্মদ গোলাম নবী
সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং ৪৯ পৃষ্ঠার ই—বুক প্রকাশ করেছে— ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’। সরকারের কাজ জনগণের সামনে তুলে ধরার এ উদ্যোগ ইতিবাচক।
ই—বুকের ভূমিকাতে সেই কথাই বলা হয়েছে। সেখানে সরকার নিজেকে ‘জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, প্রথম ১৮০ দিনের সাফল্যের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরার উদ্দেশ্যে এই প্রকাশনা। পুরো নথিটি পড়তে গিয়ে পুরোনো প্রশ্নটি আবার জেগেছে। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার দেশটা ঠিক কী অবস্থায় পেয়েছিল?
ছয় মাস পরে সরকার কত দূর এগিয়েছে, তা জানতে হলে ছয় মাস আগের অবস্থানটিও তো জানতে হবে! নথিতে বলা হয়েছে, আগের সরকার দেশকে আমদানিনির্ভর ও ঋণনির্ভর করে তুলেছিল এবং বর্তমান সরকার ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন এবং দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ পেয়েছে। কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু ভিত্তিচিত্র নয়; অবস্থার বর্ণনামাত্র।
‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? ১৭ ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি কত ছিল? বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত ছিল? ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কত ছিল? সরকারের দেশি—বিদেশি ঋণের পরিমাণ কত ছিল? রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি কী ছিল?
একইভাবে ‘দুর্বল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ বলতে সুনির্দিষ্টভাবে কী পেয়েছিল সরকার? বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কত উৎপাদন সক্ষমতা, কত প্রকৃত চাহিদা, কত বকেয়া, কত ক্যাপাসিটি চার্জের দায় এবং কতগুলো চুক্তির বোঝা সরকার পেয়েছে? এসব তথ্য এক জায়গায় আনাই হলো ভিত্তিচিত্র।
সরকারের ১৮০ দিনের প্রতিবেদনে অনেক তথ্যই আছে। সরকারি ব্যয় কমাতে গাড়ি কেনা, বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ প্রভৃতি খাতে বিধিনিষেধের কথাও বলা হয়েছে। এসব অবশ্যই জনগণের জানা দরকার। সমস্যা হলো বর্তমান সংখ্যার পাশে শুরুর সংখ্যাটি নেই। এই তুলনা ছাড়া অগ্রগতি বোঝা কঠিন। এখানে রাজনৈতিক সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।
সরকারের কোনো কাজ প্রত্যাশিত গতিতে না এগোলে মাঝেমধ্যেই আগের ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মকাণ্ডের কথা বলা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বা ব্যর্থতার কথাও আসছে। আগের সরকারগুলোর ভুল থাকলে অবশ্যই বলতে হবে। অপরাধ হয়ে থাকলে তদন্তও করতে হবে। রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়ে থাকলে তার হিসাবও জনগণকে জানাতে হবে। শুধু দোষারোপে সমস্যা অন্য জায়গায়।
যেমন কোনো মন্ত্রণালয় বলল, আগের সরকার খাতটি ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। নাগরিক হিসেবে আমার প্রশ্ন হবে: কতটা ধ্বংস করে দিয়ে গেছে? বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নিল, তখন অবস্থা কী ছিল? তারপর ছয় মাস, এক বছর কিংবা পাঁচ বছর পর দেখতে চাইব, বর্তমান সরকার সেখান থেকে কত দূর এগোলো? এটিই তো জবাবদিহি।
আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার সরাসরি আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব নেয়নি। মাঝখানে প্রায় দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকার ছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভিত্তিচিত্র তৈরি হলে আমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারতাম— ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত কী হয়েছে; অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কী পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান সরকার কী উত্তরাধিকার পেয়েছে। তখন দায়ও সঠিকভাবে নির্ধারণ সম্ভব হতো।
নতুন সরকার এসে আগের সরকারের ব্যর্থতার কথা বলা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো সমস্যা। এভাবে সরকার বদলায়, অভিযোগ বদলায়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির সুষ্ঠু হিসাব তৈরি হয় না। এ সংস্কৃতি বদলানো দরকার।
প্রতিটি নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে জাতীয় ভিত্তিচিত্র প্রকাশের রীতি চালু করা যেতে পারে। অর্থনীতি, ব্যাংক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, অবকাঠামো— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের নির্দিষ্ট সূচক সেখানে থাকবে।
আরও ভালো হয়, সেই তথ্য শুধু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে না রেখে পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং প্রয়োজনে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের তথ্য ও বিশ্লেষণের সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করা হলে। তাহলে পাঁচ বছর পরে সরকারের নিজের সাফল্যের দাবি প্রতিষ্ঠা করাও সহজ হবে।
বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনের নথিতে একটি বাক্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে: এই ই—বুক শুধু ছয় মাসের বিবরণ নয়, এটি ‘ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তি’। ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করার আগে অতীত থেকে পাওয়া ভিত্তিটিও জনগণকে জানানো দরকার। কারণ কোনো সরকার কোথায় যেতে চায়— সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছে— সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৬ বছরের দোহাই দেওয়ায় আপত্তি নেই, যদি সেই ১৬ বছরে কী ক্ষতি হয়েছে তার তথ্য দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ভুলের কথা বলাতেও আপত্তি নেই, যদি কোন সিদ্ধান্তে কী ক্ষতি হয়েছে সেটি বলা হয়। আপত্তি শুধু এক জায়গায়— দোষ থাকবে, হিসাব থাকবে না।
বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর ধরে রাজনৈতিক বক্তব্য শুনেছে। এখন তাদের তথ্য পাওয়ার সময় এসেছে। সরকারের ছয় মাসের অর্জনচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে। এবার সরকারের পক্ষ থেকে আরেকটি নথি প্রকাশ করা হোক ‘১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছিলাম।’
তখন জনগণ এই সরকারের মেয়াদ শেষে ২০৩১ সালে নিজেরাই বুঝতে পারবে, দেশটা কোথায় ছিল আর কোথায় পৌঁছেছে। আর স্বচ্ছতা ছাড়া জবাবদিহি ও উন্নয়ন কোনোটাই সঠিকভাবে হয় না।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
