মধুচন্দ্রিমা বিএনপির, জামায়াতের কী? সাইফুর রহমান তপন

জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী মঙ্গলবার সরকারের সাফল্যব্যর্থতার একটা মূল্যায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। গত সোমবার সরকারের ছয় মাস পার হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ারের মতে, সে উপলক্ষেই তারা সরকার সম্পর্কে ওই মূল্যায়ন হাজির করেছেন।

আমরা জানি, গত ছয় মাস ছিল বিএনপি সরকারের হানিমুন পিরিয়ড বা মধুচন্দ্রিমা কাল। সাধারণত সময়ে সরকারের কড়া কোনো সমালোচনা করা হয় না। তবে সময়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সরকার যেমন দায় এড়াতে পারে না, তেমনি জনপ্রত্যাশাকে ভাষা দিতে বিরোধী দলও চুপ থাকতে পারে না। কিন্তু বলা যায়, জামায়াতসহ সংসদের সকল বিরোধী দল সময়ে ছিল প্রায় স্পিকটিনট। তাই প্রশ্ন উঠেছে, জামায়াত কেন জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে গিয়ে সরকারের মধুচন্দ্রিমায় নিদ্রামগ্ন থাকল

অস্বীকার করা যাবে না, ওই সময়ে যে বিষয়গুলো জনসাধারণের জীবনকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে, সেগুলোর ব্যাপারে সরকার কিছু বাগাড়ম্বর ছাড়া কোনো অগ্রগতিই ঘটাতে পারেনি। যেমন, প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে সরকার তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলনিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা (ডেইলি স্টার, ২৭ মে) এই তিন ক্ষেত্রেই সরকার কার্যত ব্যর্থ; এমনকি নিকট ভবিষ্যতে স্বস্তি মেলার মতো কোনো পরিকল্পনাও দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জুলাইয়ে দেশে পয়েন্টটুপয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, যা আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে জুনে তা ছিল দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে দশমিক ৬৬ শতাংশ। বস্তুত মূল্যস্ফীতি কমেছে মনে হলেও বাজারে নিত্যপণ্য আগের চেয়ে সস্তা হয়নি। মোটা চাল কিন্তু এখনও ৫৫৬০ টাকার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে; সরু চালের তো কথাই নেই। যে নাজিরশাইল আমি নিজে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ৭৫ টাকা কেজি দরে কিনতাম, তা এখন ৮৫ টাকা। আলু পেঁপে ছাড়া কোন সবজিটা ৮০ টাকার নিচে আছে? আর কোটিপতির সংখ্যা বাড়া ছাড়া অন্য মানুষদের আয় কি গত দুবছরে বেড়েছে? বরং সময়ে যে হারে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের রোজগারের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে; কলকারখানা বন্ধের কারণে যত মানুষ কাজ হারিয়েছেন, তাতে নতুন করে বহু লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। গত বছরের আগস্টে বেসরকারি সংস্থা পিপিআরসি এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছিল, দারিদ্র্য ২০২২ সালের ১৮ দশমিক শতাংশ থেকে বেড়ে তিন বছরে প্রায় ২৮ শতাংশ হয়েছে। বছরের আগস্টে সরকার কি বলতে পারবে, ওই ১০ শতাংশের কতজন দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছে?

অর্থনীতির কথা উঠলেই অন্তর্বর্তী সরকার এর আগের সরকারের ব্যর্থতার গীত গাইত। সরকারও একই গীত শোনায়। বাস্তবতা হলো, উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত বিনিয়োগ সংকট এখন আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে গভীরতর। বিদ্যুৎজ্বালানি সংকট এতটাই তীব্রতর যে, অনেকাংশে তা আসলেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গানের কথার মতোদেশটা দিনে অচল থাকে, রাতে হারিকেন!

অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়ের কথা তুললে তো গল্প ফুরাবে না। সরকার যতই দাবি করুকএসব সমস্যা তারা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে; তাদের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড কিন্তু তা থেকে তারা যে বেরিয়ে আসতে চায়, এমন সাক্ষ্য বহন করে না। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন সালিশ কেন্দ্র তার এই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদনে বলেছে, এই ছয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯টি, যা সরকার শূন্য বলে দাবি করেছে। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন থাকার সময় মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের; ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। একই সময়ে মব সহিংসতায় মারা গেছে ১২০ জন, যা বন্ধ করার জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট ছিল (বিবিসি বাংলা, ১৭ আগস্ট) কারণ বেশির ভাগ মবের ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে বিএনপি তার দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের নেতাকর্মীর নাম এসেছে। আরেকটি সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিএইচআরএসএস বলেছে, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫২৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সংখ্যাটা ছিল ৮৩০। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে ,৬২১ নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের ,০৪২টি ঘটনার তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি (বিবিসি, ১৭ আগস্ট)

সরকারি হিসাবে ডাকাতি দস্যুতা, ছিনতাই, অপহরণ চুরির মামলা কমেছে। কিন্তু প্রথম আলো বুধবার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা না হওয়ায় পরিসংখ্যানে মাঠের পুরো চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না। ঝামেলা মনে করে বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না। আবার কোনো কোনো থানা মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করে অথবা তদন্তের কথা বলেলিখিত অভিযোগরেখে দেয়। এসব অভিযোগের অনেকগুলো পরে মামলায় রূপান্তরিত হয় না।দৃশ্যত পুলিশের এখন একটাই কাজখুঁজে খুঁজেআওয়ামী দোসরগ্রেপ্তার করা এবং ক্ষেত্রে মবের সাহায্য নেওয়া।

দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণে থাকা হামের প্রবল প্রাদুর্ভাব দেখে কি তার দায় আগের সরকারের ওপর চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে? সরকার যখন দাবি করেছেটিকা দেওয়ার ফলে বহু জায়গায় হাম নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে এতে ৯০০এর বেশি শিশু মারা গেছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, পরিস্থিতি যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা সমন্বিত উদ্যোগ দাবি করছিল, তার অনুপস্থিতিই প্রধানত এর জন্য দায়ী। এখন আবার বাড়ছে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, সরকারি প্রশাসন প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো দুর্বলতা নিয়েই চলছে। গণঅভ্যুত্থানের পর বলা হলো, কেবল দক্ষ যোগ্য ব্যক্তিরাই গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিয়োগ পাবেন। বাস্তবে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশসহ সর্বত্র দলীয়করণ স্বজনতোষণ আগের চেয়ে বরং বেড়েছে।আওয়ামী দোসরখেদানোর নামে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব পদ বিএনপি জামায়াত ভাগাভাগি করে দখল করেছিল; গত ছয় মাস ধরে জামায়াত তাড়িয়ে সেগুলোনিখাদবিএনপি দ্বারা ভরাট করা হচ্ছে। 

লক্ষণীয়, মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামী যে আটটি খাতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে, সেখানে গণভোটের রায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অনীহার পাশাপাশি গ্যাসজ্বালানি সংকট, জননিরাপত্তা, উচ্চ দ্রব্যমূল্য, ব্যাংকিং খাতের সংকট, প্রশাসন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণসহ ওপরে বর্ণিত সব কটি বিষয় আছে। কিন্তু গণভোট জুলাই সনদসংক্রান্ত অভিযোগ ছাড়া অন্য বিষয়গুলোর কোনোটা নিয়েই সংসদে তারা পর্যন্ত কথা বলেনি। 

কেউ কেউ বলছেন, বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন মিত্রতার রাজনীতির করেছে জামায়াত; তার একটা প্রভাব জামায়াতের নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে থাকতে পারে। আবার কেউ বলছেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বিএনপিজামায়াত উভয়েরই সাধারণ শত্রু। তার পুনরুত্থান ঠেকানোর উদ্দেশ্য থেকেও তারাডোন্ট ডিস্টার্ববিএনপি সরকার পলিসি নিতে পারে। কিন্তু তাতে সরকারের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনতার হতাশা যেমন কমবে না, তেমনি তাতে জামায়াতও তার অবদান এড়াতে পারবে না। সব মিলিয়ে তাদের রাজনীতিই যে আরও গভীর খাদে পড়বে নাতা বা কে অস্বীকার করতে পারে!

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

Related Posts