৩২ নিয়ে ৩৬ এতো শঙ্কিত কেন? আনিস আহমেদ
৩২ এবং ৩৬ যে কেবল সংখ্যা তা তো নয়, এই সংখ্যা দু’টি এখন বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আদর্শিকভাবে রাজনীতিতে বিপরীত মেরুবতীর্ ভূমিকার জন্য। সেই যে ১৫৮২ সালে ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরি নতুন ইংরেজি পঞ্জিকা প্রণয়ন করেছিলেন, সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমরা সেই পঞ্জিকাই অনুসরণ করে আসছি। তবে মাঝখানে বাধ সাধলো বাংলাদেশী জেন—জি’র কিছু তরুণ। তারা ২০২৪ সালের জুলাই মাসকে এগিয়ে নিলো আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত, আর সে বছরই আমরা পেলাম এক নতুন পঞ্জিকার পাতা যেখানে ৩৬ জুলাইয়ের জন্ম। এ জন্ম যে অবৈধ সে কথা সকলেই জানেন। তবে জুলাইয়ের আন্দোলনে জেন—জি’র কথিত বিজয় এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতিকে একীভূত করতে তারা মাসের দৈর্ঘ্যকে বাড়িয়ে দিল। বাংলাদেশের মানুষ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখলো ইংরেজি পঞ্জিকার এই অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন। তারিখের এই পরিবর্তন যে কেবল সংখ্যার বদল তাই—ই নয়, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের খোল—নলচে পাল্টে দেবার উদ্যোগ গ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুরুত্ব খর্ব করার জন্য জুলাই যোদ্ধা শব্দটিও এখন তাদের অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এই মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধার মধ্যে একটি সমীকরণ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। তবে এই সমীকরণ মুক্তিযুদ্ধকে খর্ব করার লক্ষ্যেই করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধ, যে যুদ্ধের কারণে বঞ্চিত বাঙালি তার অধিকার ফিরে পেয়েছিল। ৩৬’এর সমর্থকরা এখনও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলেই চলেছে এবং তারেক রহমানের সরকারকে ধমক দিয়েই চলেছে। এই জুলাই সনদের মধ্যে এমন বেশ কিছু ধারা রয়েছে যা মুক্তিযুদ্ধের আলোকে রচিত স্বাধীন বাংলার সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলো সেই জাতীয়তাবাদকে বিসর্জন দিয়ে এখন যখন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা বলা হয়, তখন দেশের মানচিত্রের কথাই কেবল বলা হয়, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি যা বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রধান উপাদান বাদ পড়ে যায়। আর ইচ্ছাকৃতভাবেই এগুলো পরিহার করে এমন এক বাংলাদেশ তৈরির চেষ্টা চলছে যেখানে বাঙালির নিজস্ব পরিচয় বিলীন হয়ে যাবে।
৩৬’এর এই নওজোয়ানরা এতোকিছু সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা সত্ত্বেও এখনও শঙ্কিত বোধ করছেভ কারণ তারা জানে যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বৈষম্য বিরোধিতার নামে নতুন করে সৃষ্ট কোনো বৈষম্যকে মেনে নেবে না, তারা কখনোই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কারো কোনো অবস্থানকে মেনে নেবে না। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার হচ্ছে ৩২। এখন আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌঁছেছি যে ৩২ নম্বর বলার প্রয়োজন পড়ে না, কেবল ৩২ বললেই মানুষ বুঝে যায় এ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ঠিকানা। প্রকৃতপক্ষে ৩২ নম্বর তাঁর বাড়িও নয়, এ ছিল সেই সড়কের নম্বর যে সড়কে ছিল বঙ্গবন্ধুর সেই বাড়ি যাকে ৫ আগস্টের পর কয়েক দফা বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হলো, ইতিহাসে রি—সেট বোতাম টেপার কারণে। সেই ৩২ নম্বর সড়কের নম্বরও এখন পাল্টে গেছে কিন্তু মানুষ ভোলেনি ৩২—কে। কারণ ৩২ কোনো সংখ্যা নয়, ৩২ সেই আদর্শের নাম যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার। বঙ্গবন্ধুর সেই বাড়ির বারান্দায় এক সময়ে মানুষ দেখেছে তর্জনী তুলে নির্দেশ দিচ্ছেন বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই বাড়িতেই তাঁকে ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয়, এই বাড়িটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি—বিজড়িত জাদুঘর। ৩৬ এর নওজোয়ানরা ৩২কে গুঁড়িয়ে দিয়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে চলেছে।
চব্বিশের সেই তথাকথিত আন্দোলন শেষ হয়েছে দু’বছর আগেই কিন্তু ৩৬’এর প্রতিহিংসাপরায়ণ একদল তরুণ এখনও ৩২’এ শ্রদ্ধা জানাতে যারা যাচ্ছেন, তাদের উপর হামলা চালাচ্ছে এবং অনেককে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছে। ৩২’এর সেই বাড়িটি এখন আর নেই তবু অনেকেই যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, বঙ্গবন্ধু যে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলেন সে জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। কিন্তু কী অকৃতজ্ঞ ৩৬’এর এই ’ইনকিলাবী’ তরুণরা যে তারা নিজেদের জাতির পিতৃপরিচয় দিতে এখনও দ্বিধাগ্রস্ত? পাকিস্তানের জাতির পিতাকে তারা যতখানি স্বীকৃতি দিতে চায়, নিজেদের জাতির জনককে ঠিক সেই অনুপাতেই অস্বীকৃতি জানায়। প্রশ্নটা হচ্ছে ৩২’এর যে বাড়িটিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে সেই বাড়িটিকে নিয়ে তারা এখনও শঙ্কিত কেন? কারণ তারা এখন জানে যে ৩২’এর ওই বাড়ির ধ্বংসস্তুপ থেকে গ্রীক কিংবদন্তীর ফিনিক্স পাখির মতো বঙ্গবন্ধু জেগে উঠবেন, জেগে উঠবে তাঁর অমর—অম্লান আদর্শ। বঙ্গবন্ধু যে মরেও মরেন না সে কথা ৩২ বিরোধী ৩৬’এর ইনকিলাবিরা ক্রমশই বুঝতে পারছে, তাই তারা ত্রস্ত বোধ করছে। আর কেবল তারাই নয়, বর্তমান সরকারও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব, তাঁর আদর্শের প্রসার সম্পর্কে আশংকা বোধ করে, নইলে তারাই বা কেন পুলিশ নিয়োগ করে ৩২—এ যেতে বাধা প্রয়োগ করবে? মুক্তিযুদ্ধ ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে তারেক রহমানের বয়ান যতই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হিসেবে তার অবস্থানকে তুলে ধরুক না কেন, ইতিহাসে এর প্রমাণ রয়েছে যে বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক হিসেবে মেনে নিয়েই জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অতএব ৩৬’এর গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে ৩২—কে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি যতই মনে করেন না কেন যে বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে তার পিতা জিয়াউর রহমানকে স্বীকৃতি দেয়া যাবে, ততই তিনি নিজেকে নিয়ে যাবেন সেই বোকার স্বর্গে। সেটি সম্ভবত তিনিও জানেন। তাই পুলিশি পাহারায় ৩২—কে তিনি জনগণ থেকে দূরে রাখতে চান যাতে একদিকে তিনি যেমন জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা হিসেবে স্থাপন করতে পারেন, অন্যদিকে তেমনি ৩৬’এর ইনকিলাবিদের তুষ্ট করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রত্যাশার গুড়ে বালি। কারণ ৩২—কে বাদ দিয়ে কিছুই সম্ভব নয়।
আর সে জন্যেই তো ৩২ নিয়ে ৩৬এর এতো ভয়, কারণ তারা দেখলো ৩৬ স্থায়ী নয়, ৩২—ই কেবল চিরস্থায়ী।
