উৎসবমুখর পরিবেশে নিউইয়র্কে বর্ষবরণ

বাঙালী প্রতিবেদনঃ একটি গোছানো সুশৃঙ্খল সুনির্বাচিত গানের সমাহার সাজিয়ে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিল সাংস্কৃতিক সংগঠন আনন্দধ্বনি। কুইন্স সোশাল এডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টারের প্রযোজনায় এই অনুষ্ঠান হয় গত রবিবার সন্ধ্যায় কুইন্সের বেসাইডে কুইন্স বরো পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে। সুবিশাল মঞ্চের পুরো পশ্চাদপট জুড়ে ডিজিটাল স্ক্রিনে বর্ষবিদায় বর্ষবরণের ইমেজ। আর তার সামনে সারিতে বসেছে বছর বয়সী শিশু থেকে প্রায় ৭৫ বছর বয়সী ৬৩ শিল্পী। নারীরা পরেছে পার্পল রঙের শাড়ি। পুরুষরা একই রঙের পাঞ্জাবি। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন কুইন্স সোশাল এডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টারের সিইও ইঞ্জিনিয়ার মাহফুজুল হক এবং টিবিএন ২৪এর সিইও আহমেদুল বার ভুঁইয়া। এর পরপরই ইন্দ্রজিত চৌধুরীর বাজানো প্রায় ৩০ মিনিটের সেতার পুরো পরিবেশ নিমগ্ন করে তোলে। সেতারের রেশ ধরে প্রধান সংগীত পরিচালকং অনুপ বড়য়ার আলাপ শ্রোতাদের গান শোনার উষ্ণতা ছড়িয়ে দেয়। অনুপ বড়য়ার আলাপের রেশ ধরে সম্মেলক কণ্ঠে শিল্পীরা গেয়ে ওঠেনআলোয় আলোকময় করে

এইভাবেই আনন্দধ্বনি বঙ্গাব্দ ১৪৩৩কে স্বাগত জানালো। বিশাল এই হল ততক্ষণে ভরে ওঠে। উদ্বোধনকালে মাহফুজুল হক বলেন, নিউইয়র্কে অনেক অনুষ্ঠান হয়, আমি মনে করি আনন্দধ্বনির অনুষ্ঠানই সেরা। এই শিল্পীরা গত মাস ধরে মহড়া দিয়ে আসছে আজকের এই সন্ধ্যার জন্য। আহমেদুল বার ভুঁইয়া সকলকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান।

অনুষ্ঠানে কখনো সম্মেলক কণ্ঠে শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন, কখনো একক কণ্ঠে। এছাড়াও ছিল কবিতা আবৃত্তি এবং নাচ।

একক দ্বৈত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশন করেন রওনক খান, কানিজ ফারজানা, তরুণ চন্দ, রাজিব সরকার, কনিকা দাস, সুপ্তা শীল, হৃদয় চৌধুরী, লিলি মজুমদার, তুলি বিশ্বাস, পূর্বাশা রায়, মাহফুজ, পারিজাত, দেবযানী দেবনাথ, টুম্পা অধিকারী, রুনা রায়, রোমিও দাস, নবনীতা চক্রবতীর্, অনুপ বড়য়া, অর্ঘ্য সারথী সিকদার, প্রজ্ঞা বড়য়া, প্রিয়াংকা দাস, তমা চক্রবতীর্, রাজশ্রী সাহা রায়, সৈকত মুখার্জি, কৃষ্ণা তিথি, এবং কানেকটিকাট থেকে আসা শিল্পী . সেজান মাহমুদ। সবশেষ পরিবেশনা ছিল ঢাকা থেকে আসা নকুল কুমার বিশ্বাসের।

যেসব গান পরিবেশিত হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো একি অপরূপ রূপে মা, মধুর মধুর ধ্বনি, আপন হতে বাহির হয়ে, গঙ্গা আমার মা, কারার লৌহ কপাট, তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না, ধিতাং ধিতাং বলে, মা গো ভাবনা কেন, আমি অপার হয়ে, পথে এবার নামো সাথী, তুমি নব নব রূপে, পিউ পিউ বিরহী পাপিয়া, জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমরা এমনি এসে ভেসে যাই, সব কটা জানালা খুলে দাও, আমি বাংলায় গান গাই, প্রখর দারুণ অতি, যেখানে সেই দয়াল আমার, পিপাসা নাহি মিটিল, ফিরে চল মাটির টানে, আমার দেশের মাটি, এই বাংলার মাটিতে, বাঁধ ভেঙে দাও, জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, এই না বাংলাদেশের গান, আমার মন চলে যায় বাংলাদেশের, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই এবং এসো হে বৈশাখ।

. সেজান মাহমুদ তার নিজের লেখা সুর করাতবু ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি আমাদের ঢাকাগানটি গেয়ে শোনান। এই গানটি নব্বইএর দশকে বাংলাদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে এর কথায় তিনি কিছুটা যোগ করেছেন ২৪এর পর মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান মব সংস্কৃতির উত্থান তুলে ধরে। তার সাথে জিম্বা বাজায় সেজান মাহমুদের পুত্র প্রেম।

পুরো অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন মিথুন আহমেদ, গাগীর্ মুখার্জি, মেহের কবীর, নাসরিন শাহানা ডা. হাফসা ইমাম সিদ্দিকা। মিথুন আহমেদ আর গাগীর্ মুখার্জির আবৃত্তি হৃদয় স্পর্শ করে।

এই অনুষ্ঠানে কোরাস গানের সম্মেলক আবহ বজায় ছিল, একক কণ্ঠের শিল্পীরাও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। নাচ পরিবেশন করে অন্তরা সাহা ড্যান্স ট্রুপের শিল্পীরা।

তবলায় ছিলেন পিনুসেন দাস, স্বপন দত্ত, অমিত দাস, হারাধন, কীবোর্ডে পার্থ গুপ্ত, অক্টোপ্যাডে রিচার্ড, গিটারে জোহান, মাহফুজ, মন্দিরায় শহীদ উদ্দিন।

অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন মেহের কবীর ডা. হাফসা ইমাম সিদ্দিকা।

আনন্দধ্বনির মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির ধারায় নিবেদিত অনুষ্ঠানটির মাঝামাঝি সময় পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের নিরাপত্তা কমীর্রা বাইরের গেট বন্ধ করে দেয়। সে সময় বাইরে শতাধিক মানুষ অপেক্ষা করছিল।

ইউনাইটেড নিউজ এজেন্সি জানাচ্ছে, নতুন বাংলা বছর ঘিরে নিউইয়র্কে বর্ণর্াঢ্য আয়োজনে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করা হয়। ফলে ম্যানহাটানের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে কুইন্সের নানা অনুষ্ঠানে দেখা যায় এক টুকরো বাংলাদেশ। দৃশ্যত চলতি সপ্তাহ নিউইয়র্ক সিটি রূপ নেয় প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনুষ্ঠানে। বিশ্বের রাজধানী হিসেবে খ্যাত নিউইয়র্ক সিটির প্রাণকেন্দ্র টাইমস স্কয়ার, বাংলাদেশীদের প্রাণকেন্দ্র জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজা, কুইন্সের কুইন্সবোরো পারফরমিং আর্টস সেন্টার (কিউপিএসি), উডসাইডের কুইন্স প্যালেস প্রভৃতি জায়গা হয়ে ওঠে নানা অনুষ্ঠানে বর্ণাঢ্য উৎসবমুখর। অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণকারীরা রং বে রংএর দেশীয় পোষাক পরে উপস্থিত হওয়ায় অনুষ্ঠানগুলো আলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। যা দেশীয় কৃষ্টিকালচারের স্বরূপ তুলে ধরে। সম্মিলিত মঙ্গল শোভাযাত্রা উদযাপন পরিষদ, এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইড, আনন্দধ্বনি, ড্রামা সার্কল নিউইয়র্ক, বাংলাদেশ ক্লাব বেঙ্গলি ক্লাব ইউএসএ, মানিকগঞ্জ কল্যাণ সমিতি, এবিসিএইচ আয়োজন করে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। খবর ইউএনএর। 

টাইমস স্কয়ারে বর্ষবরণ: বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইডের আয়োজনে বিশ্বের রাজধানী হিসেবে খ্যাত নিউইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র টাইমস স্কয়ারে গত ১১ এপ্রিল শনিবার দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বৈশাখী উৎসবের। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টাইমস স্কয়ারে দিনভর চলে গান, নাচ আর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শত কন্ঠে পরিবেশিত হয় বাংলা বর্ষবরণের বিশেষ গান। উৎসবের সূচনা হয় মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে। একইসঙ্গে কথাসাহিত্যিক শামসুদ্দিন আবুল কালামএর জন্মশতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিকদের শুভেচ্ছা বার্তা ভিডিও। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন উৎসব কমিটির আহ্বায়ক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া হায়দার, এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইডের  সভাপতি বিশ্বজিৎ সাহা সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল লিটন প্রমুখ। উৎসবে আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করে নেপাল, লাওস থাই কমিউনিটির শিল্পীদের অংশগ্রহণ। বহুসাংস্কৃতিক এই পরিবেশনা বাংলা নববর্ষকে এক বৈশ্বিক ¤প্রীতির মঞ্চে রূপ দেয়। একইসঙ্গেছয় ঋতু নান্দনিক উপস্থাপনায় বাংলার প্রকৃতি জীবনদর্শনের চিত্র ফুটে ওঠে।

এছাড়াও অপরাহ্নে উৎসবে গুণীজন সম্মাননা বিশেষ পর্বে প্রবাসী বাঙালির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সঙ্গীত পর্বে নেতৃত্ব দেন মহিতোষ তালুকদার তাপস। উন্মোচন করা হয়বৈশাখী মেলাশীর্ষক স্মারকগ্রন্থের। বিকেলে নাটক, মঙ্গল শোভাযাত্রা, লোকগান শাস্ত্রীয় নৃত্য পরিবেশিত হয়। সন্ধ্যার পর শিশুদেরশতকণ্ঠে বর্ষবরণএবং বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস সহ প্রবাসী শিল্পীদের সম্মিলিত পরিবেশনা উপস্থিত দেশীবিদেশী দর্শকশ্রোতাদের মুগ্ধ করে। রাত ১০টায় সমাপনী সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই টাইমস স্কয়ারের বাংলা বর্ষবরণ বর্ণাঢ্য আয়োজন। 

পরদিন রবিবার এনআরবি ওয়ার্ল্ডওয়াইডের আয়োজনে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে ডাইভারসিটি প্লাজায় দ্বিতীয় দিনের মত উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনেও বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস সহ প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। 

Related Posts