গল্প || জরায়ু’র অন্দরে || জেবুন্নেছা জোৎস্না, নিউইয়র্ক
একবার ভালোবেসেছি বলে পুনরায় ভালোবাসা পাপ নয়, সে প্রেমিক মাত্রই জানে। যখন সবুজ পাতারা লালচে—হলুদ ছাপায় বাতাসে উড়ে, আর চলার পথে সম্মুখে ঝরে বলে, ‘ওহে, যেওনা আমায় ফেলে’— হেমন্তে প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করা তখন সহজ নয়। পাতা ঝরার বেদনায় ভারী বাতাসের স্পর্শ যেন একদম ভেতরটা ছুঁয়ে যায়— ঠিক যেন প্রিয় মানুষটার ছোঁয়ার আমেজ বাতাসের দ্রবণে মিশে থাকে। অহনার গতানুগতিক সকালটা সবসময়ই খুব তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকে, তবু সে কখনও সাবওয়ের পথে যেতে যেতে সময়কে অবজ্ঞা করে কয়েক সেকেন্ড সামিল হয় পায়রাদের প্রাতরাশে; কখনও রাস্তা থেকে তুলে নেয় সদ্য মৃত ঝরাপাতাকে; কখনও থমকে দাঁড়ায় ঘাসের ব্লেডে চকচকে শিশির দেখে। খুব আলতো করে শিশির তুলে নেয় আঙুলে, তারপর সে দৈবজলকে ছুঁইয়ে দেয় ঠোঁটে, গলায়, গালে— অজানা এক ভালোলাগার তৃপ্তিতে সে শিউরে ওঠে। অহনা বিশ্বাস করে জৈবিক সত্তার পূর্ণতা অনেকটা নিজের ওপর নির্ভর করলেও, কখনও সে পূর্ণতা প্রাপ্তিতে প্রয়োজন হয় কোন অনুঘটকের। প্রকৃতির অনুঘটক ঋতু— যা তাকে একেক সময়ে সাজায় একেক রূপে। আর প্রতিটা ঋতুরই প্রেমে পড়তে হয় একই প্রেমিক হয়ে! শুধু অহনা সেই অনুঘটকের ছোঁয়ার অপেক্ষায় এতোদিন পরিপূর্ণ হয়নি এক পূর্ণাঙ্গ নারীতে।
আজকের সকালটা অহনার অন্যরকম— সাব্বিরের সাথে সে হাসপাতাল থেকে ফিরছে। ড্রাইভিং সিটে বসা সুদর্শন সাব্বিরকে সে কিছুক্ষণ পর পর মুগ্ধতায় দেখছে। গত এক যুগে এ মুগ্ধতা তাঁর একটুও কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। হয়তো, যে হেম—মেঘে ভালোবাসা জমে ছিলো, তার সাথে প্রেম হয়নি বলেই। ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে সাব্বিরকে ছুঁয়ে দিয়ে এই পড়ন্ত বেলার আনন্দকে ভাগাভাগি করা যায়— কিন্তু মনের—হাতের পেরিফেরাল নিউরনেরা বুঝি অসাড়— বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
হঠাৎ অহনার চিৎকারে সাব্বির গাড়িতে ব্রেক কষে। ভর্য়াত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে? সবকিছু ঠিক আছে তো? অহনা উউন্ডস্ক্রিনের বাইরে রাস্তায় আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, দেখো, দেখো বাতাসে শুকনো পাতারা কেমন জড়ো হয়ে দলবেঁধে উড়ে যাচ্ছে। মনে মনে সে বলে, আমারও খুব ইচ্ছে হয় তোমার সাথে এমনি জড়াজড়ি করে হাত ধরে হাঁটি, শুকনো পাতার স্তুপে তোমার সাথে ডুবি.. কিন্তু অহনা কখনোই নিজের অনুভূতির কথা বলতে পারেনি সাব্বিরকে। সাব্বির হাঁফ ছেড়ে হতবিহ্বল ভাবটা কাটিয়ে আবার গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বিড়বিড় বলে, পাগল!
হ্যঁা, অহনা তো সত্যিই পাগল.. পাগল বলেই হয়তো সে জানালার কাচ গলে মেঘেদের সাথে উড়ে যেতে পারে..
তার উদাস আত্মা যেন পর্বতের ধাক্কায় গলে যেতে চায় বৃষ্টিতে— কিন্তু কেউ অহনাকে পাতাদের মতো এমন মাতাল হয়ে কখনও পথ আগলে বলেনি, ‘এসো, বোসো কাছে এসে’, অথবা বাতাসের মতো সমূলে উড়িয়ে নিয়ে যায়নি আর্কষণের গ্র্যাভিটিতে। যদিও বা কেউ ডেকেছে, কাছে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। পুনরায় আঘাতের ভয়ে সে কেবল সম্পর্ক থেকে পিছিয়েই এসেছে— আর নিজের কেন্দ্রে মেঘে ঘনীভূত হয়ে চারপাশে এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলেছে— যে প্রাচীরের ইকো কখনও সমুদ্রের গর্জনে তাকে ডুবিয়ে ফেলে, কখনও ঝড় হয়ে ভেঙে টুকরো করে, কিন্তু অহনার পাজল মেলানোর ধৈর্য্য থাকায়, সে ঠিক আবার নিজেকে ফিরিয়ে আনে গতানুগতিক আদলে।
সাব্বির দুই সন্তানের বাবা হলেও, অহনা এই প্রথমবার মা হতে চলেছে। সাব্বিরের প্রথম স্ত্রী রোড এ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ার পর, সাব্বিরের শাশুড়ি ছোট দুই নাতি—নাতনীর দেখাশোনার জন্য অনার্স পড়ুয়া অহনাকে পছন্দ করে টেলিফোনে সাব্বিরের সাথে তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে অহনাকে নিউইয়র্ক পাঠিয়ে দেয়। অহনার মধ্যবিত্ত বাবার একটাই চাওয়া ছিলো যে, তাঁর মেয়ের পড়াশুনাটা যেন হয়। আর বিয়ের আগে সাব্বির অহনাকে বলেছিলো, সে তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী অহনাকে সব দেবে, শুধু সে কখনও মা হতে চাইবে না, আর এতে যদি সে সম্মত হয় তবেই বিয়েটা হবে।
অল্পবয়সী অহনা সেদিন বলেছিলো, আপনার দুই বাচ্চা তো আমারও সন্তান, এছাড়া দুটির বেশী তো সন্তানের প্রয়োজনও নেই।
বিয়ের পরই অহনা নিউইয়র্ক চলে আসে— শ্যামলা বর্ণের অহনা এয়ারপোর্টে সাব্বিরকে প্রথম দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলো না, এই এতো সুন্দর লোকটি তাঁর স্বামী। সাব্বিরের সাত বছরের মেয়ে জারা আর পাঁচ বছরের ছেলে জিসানকে মুহূর্তেই সে ভালোবেসে ফেলে। সে খুব দ্রুতই ওদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। সে খেলার ছলে ওদের খাইয়ে দেয়, বিকেলে পার্কে ঘুরতে নিয়ে যায়, স্কুলে নিয়ে যাওয়া—আসা করে, একসাথে গল্পের বই পড়ে, আর বন্ধের দিন মুভি দেখে। সাব্বির তখন খুব নিশ্চিন্ত মনে তার অফিসের ট্যুরগুলিতে যায়, এবং প্রতিবার অহনার জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে আসে। তবে অহনা বোঝে না এ উপহার ঠিক ভালোবাসার, নাকি কৃতজ্ঞতার।
অহনার প্রথম ভালোবাসা তাঁর স্বামী, সাব্বির। সে জানে তার ভালোবাসা একতরফা, কারণ সাব্বিরের হৃদয় জুড়ে এখনও তার প্রথম স্ত্রী। বিকেল হলে অহনা অস্থির হয়ে সাব্বিরের জন্য অপেক্ষা করে.. সাব্বির বাসায় এলে বাচ্চাদের সাথে ব্যস্ত হয়ে গেলেও অহনার সুবিধা—অসুবিধার তদারকি করতে ভোলে না, শুধু তার হৃদয়ের খোঁজটা যেন সে নিতে চায়না। অহনার নীরব একতরফা ভালোবাসা চুমুক দেয় সাব্বিরের চায়ের কাপের তলানির অবশিষ্টতে, কখনও তাঁর পানি পূর্ণ গ্লাসে এক চুমুকে ..কখনও বা লন্ড্রিরুমে সাব্বিরের কাপড়ে মিশে থাকা ঘাম আর পারফিউমের দীর্ঘ গন্ধ শুকে। ঝরাপাতার মতো অহনার হেমন্ত যায় ঝরে, নিস্ফলা বসন্ত তাঁর বৃত্তে ঘুরে ফিরে দূেও চলে যা। প্রতিবার ভ্যালেন্টাইনস ডে এলে, চারিদিক লাল—গোলাপি বেলুন, হরেক রকম গোলাপ আর ক্যান্ডি হাতে ছেলে—মেয়েরা হাত ধরে হাঁটে, রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি মুগ্ধ দৃষ্টিতে বসে থাকে ধোঁয়া ওঠা খাবারের সামনে, অথবা ট্রেনে কি অবলীলায় পাখির মতো জোড়া ঠোঁট ভালোবেসে মিশে যায়— এসব দেখে অহনার হৃদয়ে নোনা জলস্রোতের হিমেল তোলপাড় করে ওঠে— গোলাপের বাসি পাপড়ির মতো সে নেতিয়ে থাকে নিজের বাগানে।
অহনাকে সাব্বির ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করে দেয়, এবং বাসায় রান্না ও পরিষ্কারের জন্য একজন লোক রাখে। নিজের পড়াশুনা আর বাচ্চাদের দায়িত্বে সাব্বিরকে কাছে পাওয়ার আকাক্সক্ষা তার মনে নিষ্প্রভ জ্বলে। এছাড়া জারা তার বাবার পাশে অহনাকে একদমই সহ্য করতে পারে না— চেঁচামেচি—কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। বাসায় অথবা কোথাও বেড়াতে গেলে সাব্বির তাই অহনার থেকে একটু দূরেই থাকে। অহনার খুব খারাপ লাগে, যাদের ঘিরে তার এই সংসারবেলা, তারা ওকে মা ডাকে না, আন্টি বলে ডাকে। সাব্বিরকে ব্যাপারটা বলার পরে সে বললো, বাচ্চারা নিজে থেকে না ডাকলে সে জোর করতে পারবে না, মা হারা বাচ্চাদের তাতে মানসিক চাপ বাড়বে। নিজের ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি বাচ্চাদের মতিগতি বুঝে ওদের সাথে নিজেকে মানিয়ে চলতে অহনা রীতিমত শিশুদের মনোজগতের বইপত্রও পড়ে।
বাচ্চারা বড় হতে থাকে— অহনার পড়াশুনাও শেষ হয়। আর এই অবসরে অজান্তে অহনাকে মা ডাক শোনার এক তীব্র বাসনা তাড়িয়ে বেড়ায়। একদিন নির্লজ্জের মতো সাব্বিরকে বলে, আমার মা ডাক শুনতে ইচ্ছে করে। সাব্বির খুব নির্লিপ্ত কন্ঠে সেদিন বলেছিলো, আমাদের বিয়েটা হয়েছিলো সন্তানদের জন্য। তোমার মা হতে ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে মুক্ত করে দিই, তুমি স্বাবলম্বী, এখনো বিয়ে করতে পারো, এবং পাত্রেরও অভাব হবে না নিশ্চয়ই। অহনা আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটে মুষড়ে পড়ে।
সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে ট্রেন স্টেশনে গিয়ে এফ ট্রেন ধরে নামে রুজভেল্ট আইল্যান্ডে। সিটির কোলাহল থেকে দূরে শান্ত ও মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত দ্বীপটি তার প্রিয় একটি জায়গা। শেষ বিকেলে সূর্যাস্তের সময় স্কাইলাইনে চড়ে সে উপভোগ করে আকাশের কমলা ও গোলাপি রঙ, শহরের সুউচ্চ ভবনগুলোর ঝলমলে আলোয় নীচে বয়ে যাওয়া ইস্ট রিভারের চকচকে জল। তারপর হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হয় সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া ব্যস্ত রাস্তায় হরেক রঙের যানবাহন— অতি উঁচু থেকে নীচে নামতে নামতে মনে হবে যেন ডিজনীল্যান্ডের সেই স্পাইডার ম্যানের শ্বাসরুদ্ধকর রাইড। কয়েক মিনিটের মধ্যে এমন সবুজের সমারোহ, জল আর ব্যস্ত জীবনের দ্রুত পরিবর্তনশীল ভ্রমণ— মনকে নিমেষেই ভালো করে দেয়। সাব্বির ফোন দিলে সে ফিরে আসে বাসায়— নিজের জীবনকে কেমন অচেনা অদ্ভুত মনে হয়— সে যেন দামী ফুলদানিতে অবহেলার চর্চায় ফুটে থাকা গোলাপ, যার মালি কখনও চোখ তুলে দেখেনি সেই ফুলের সৌন্দর্যকে। সাব্বিরের অতিশয় যত্ন আর প্রেমের উদাসীনতায় সে বুঝতে পােও না এ সম্পর্কের কি নাম দেয়া যায়!
অহনা নতুন চাকরিতে যোগদান করে ভুলে থাকার চেষ্টা করে সম্পর্কের দ্বিধা—দ্বন্দ্বের এই রহস্যকে। কাজে তার বন্ধুত্ব হয় মিশেইলের সাথে। তাঁর বয়স আটষট্টি, কিন্তু এখনো দারুণ সপ্রতিভ এবং সবসময় দারুণ হাসিখুশি। একদিন দুপুরে লাঞ্চের সময় বেশ জমে ওঠে তাদের আড্ডা! সময় পেয়ে সে বলতে থাকে তার বিচিত্র জীবনের আখ্যান। মিশেইল বলেন, আমি চারবার প্রেগনেন্ট হয়েছিলাম, কিন্তু কোনো সন্তানের জন্ম দিইনি। একবার মিসক্যারেজ হয়েছে, আর তিনবার এ্যবরশন করেছি!
ভাবছো, কেন?
কারণ আমি জানতাম না কে ওদের বাবা!
আমি যখন হাইস্কুলে তখন ভলান্টিয়ারের জব করতাম অরফানেজে! যেখানে অধিকাংশ বাচ্চাই আফ্রিকান আমেরিকান, যারা জানেনা তাদের বাবা—মা কে!
ওদের কী যে কষ্ট .. আমার গায়ের রং সাদা দেখালেও, আমি নিজেও একজন আফ্রিকান আমেরিকান! আমার পরিবারের বন্ধন খুব দৃঢ় ছিল.. আমার জীবনে বির্পযয় নেমে আসে যখন আমি পর পর আমার প্রিয় মানুষ মা—বাবা আর বোনকে হারালাম।
স্বামী? ওহ্! আমি যখন মধ্য ত্রিশের তখন আমার ডিভোর্স হয়ে যায়। আর তারপর থেকে আমি একসাথে এতো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি যে আমি ঠিক জানতাম না, আমার সন্তানদের বাবা কে! তারপর যখন মনের মতো মানুষ পেয়ে আমি স্থিতু হলাম, মা হতে চাইলাম, তখন ইউটেরাইন পারফোরেশনের কারণে আমার জরায়ুর বাচ্চা ধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
অহনা জানালার দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে ভাবে, পাতার মতো বৃন্তচ্যুত অজস্র ভ্রম্নণ ঝরে পড়ে পৃথিবীতে, সেই শুধু পারলো না নিজের অন্দরে একবার তাকে রোপণ করতে!
হঠাৎ করেই সাব্বিরের প্যানক্রিয়াস ক্যান্সার ধরা পড়ে। দ্রুত অপারেশন করে তাঁর প্যানক্রিয়াসের হেড বাদে বাকি সবটাই ফেলে দিতে হয়। কেমোর কারণে সাব্বিরের সব চুল পড়ে যায়, ভ্রম্ন সাদা হয়ে তাঁকে বেশ বয়স্ক দেখায়। ছেলে—মেয়ে যে যার মতো ব্যস্ত নিজেদের পড়াশুনা নিয়ে। সাব্বিরের চিকিৎসাকালীন এই সময়ে অহনার সার্বক্ষণিক সেবা শুশ্রম্নষায় সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে।
জারা ইউনিভার্সিটির ডর্মে থাকে। ছুটিতে বাড়ি এলে একদিন খুব অনুতপ্ততায় অহনাকে স্যরি বলে। বলে, আমি ছোট ছিলাম, তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি আমি বাবার থেকে তোমাকে সব সময় দূরে রেখেছি! আন্টি, আমি এজন্য দুঃখিত। তুমি বাবার সাথে সম্পর্কটা ঠিক করে নাও প্লিজ। জিসান বাইরে যাওয়ার আগে বা ঘরে ঢুকেই অহনাকে একটা হাগ দিয়ে বলবে, ‘আই লাভ ইউ আন্টি’। আজকাল সাব্বির চা খেয়ে অর্ধেকটা অহনাকে দিয়ে বলে, এটা বেশ মজা হয়েছে, বাকিটা তুমি খাও। অহনা বুঝতে পারে, সাব্বির এখন নমিত অহনার হৃদয়ের কাছে। কিন্তু বেলায় বেলায় অবহেলায় অহনার চাওয়া পাওয়ার নৌকাটি যে হলদে রঙের বিষন্নতার বাদাম তুলে বহু দূর ভেসে গেছে..।
অহনার এক যুগের বিবাহ বার্ষিকীতে সাব্বির তাকে বলে, আমার অনুপস্থিতিতে তোমার যাতে কোনো সমস্যা না হয় তার সকল ব্যবস্থা আমি করেছি, কিন্তু তোমার মনের অপূর্ণ ইচ্ছের জন্য আমি কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না! অহনা, তুমি এবার মা হবে।
অহনা বিস্মিত হয়ে বলে, কিন্তু কিভাবে? তোমার ভ্যাসেকটমী করা, এছাড়া তুমি ক্যান্সারের রোগী।
সাব্বির উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে, তুমি হয়তো জানো না ক্যান্সার রোগী অথবা যাদের একেবারে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তারাও এখন ইচ্ছে করলে ইন ভিট্রো গেমেটোজেনেসিস পদ্ধতিতে সন্তান নিতে পারবে। শরীরের ত্বক অথবা রক্ত থেকেই স্পার্ম অথবা ডিম্বাণু তৈরি করা হয়। তোমাকে বলিনি, আমি স্পার্ম তৈরির জন্য অলরেডি স্যাম্পল দিয়ে এসেছি। আমার স্পার্ম তৈরি, এখন শুধু তোমার ডিম্বাণু সংগ্রহ করে দুটির মিলনে ভ্রম্নণ তৈরি করে আইভিএফ পদ্ধতিতে তোমার জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হলেই তুমি আমার সন্তানের মা হবে।
হঠাৎ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় অহনা তেমন আনন্দ বা উচ্ছ্বাস উপলব্ধি করতে পারেনা— সে যেন মেনেই নিয়েছিলো তার নিয়তিকে।
আজ ওরা দুজনে হাসপাতালে গিয়েছিলো রেগুলার চেকআপে। ডাক্তার বললো, সবই ঠিক আছে, আর চারমাস পরই অহনার জঠর থেকে সাব্বিরের সন্তান পৃথিবী স্পর্শ করবে। ফেরার পথে রুজভেল্ট আইল্যান্ডের পাশে গাড়িটি থামিয়ে সাব্বির বলে, চলো একটু হেঁটে আসবে নদীর ধারে। ওরা চলে আসে পাথরের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা দ্বীপের লাইট হাউসে। চারপাশ জলের গন্ধ আর নদীর স্রোতের কলকল শব্দ। অহনা সাব্বিরের হাত ধরে শুকনো পাতায় নূপুর পায়ে হাঁটে যেন ইস্ট রিভারের শান্ত জলে ঢেউ তুলে হারিয়ে যাবে দূরগামী জাহাজে .. অহনা আজ এই পৃথিবীতে একা নয়, জরায়ুর অন্দরে এক অলৌকিক টিকটিক অস্তিত্ব টের পাচ্ছে—
