১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় তারেক রহমান || ‘টাইম’র তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া
সাদিয়া মাহজাবীন ইমামঃ পাঁচ বছর পর টাইমের তালিকায় টানা তিন বছর ধরে থাকছেন বাংলাদেশের নেতারা। ২০২৬ সালে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বুধবার ১৫ এপ্রিলের ঘোষণায় জানা গেল তাঁর নাম। ২০২৫ সালে এই তালিকায় ছিলেন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহম্মদ ইউনূস। ২০২৪ সালে টাইমের ‘টাইম ১০০ নেক্সট’ তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। অর্থাৎ তিন বছর ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত সাময়িকী টাইমের প্রভাবশালীর তালিকায় থাকছে বাংলাদেশের কোনো না কোনো নেতার নাম। এর আগে ২০১৮ সালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জনের তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকা টাইম প্রকাশ শুরু করেছে ১৯৯৯ সালে। এই তালিকা তাদের অন্যতম প্রভাবশালী বার্ষিক আয়োজন হিসেবেই মনে করে গণমাধ্যমটি। এবং গোটা বিশ্বেও তা—ই মনে করা হয়। ১৯৯৯ সালে টাইম সাময়িকী আইনস্টাইনকে শতাব্দীর সেরা ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিবছর টাইম ১০০ জনের নাম ঘোষণা করে আসছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় তারা এই নির্বাচন করে তা নিয়ে আছে মানুষের কৌতূহল।
টাইমের প্রভাবশালী ব্যক্তি নির্বাচন প্রক্রিয়া
টাইম তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে নিজেদের সাংবাদিকদের কাছেও প্রকাশ করে না প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা। শেষ পর্যন্ত সম্পাদকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত মনে করা হলেও সে পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত হয়ে নাম পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সহজ না। পত্রিকার প্রধান সম্পাদক স্যাম জ্যাকবস টাইমের অনলাইন ভার্সনে প্রকাশিত ‘হাউ উই চুজ দ্য ২০২৬ টাইম ১০০’ শিরোনামের প্রবন্ধে লিখেছেন, প্রতিবছর ফলাফল ভিন্ন হতে পারে, তবে ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ সংখ্যাটি সবসময় একইভাবে শুরু হয়। প্রথমে টাইমের সাংবাদিকদের কাছেই নাম চাওয়া হয়। যারা সেই বছরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন, এমন ব্যক্তিদের নামের মনোনয়ন জমা দিতে বলা হয় সাংবাদিকদের। এরপর বার্তাকক্ষে নিজেদের মনোনয়ন দেওয়া ব্যক্তিদের পক্ষে—বিপক্ষে তর্ক—বিতর্কে নামেন সাংবাদিকরা। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে টাইম প্রতিযোগীদের নাম নিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ করে।
তবে জ্যাকবস ২০২৫ সালে টাইমের সম্পাদকীয়তে জানিয়েছিলেন, প্রভাবশালীদের সংজ্ঞায়িত করার মতো কোনো একক মাপকাঠি নেই। ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পায় সেইসব ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কথা, যাদের পদক্ষেপ প্রতিবছর বিশ্বকে নতুন রূপ দিতে ভূমিকা রাখছে। তাদের কেউ কেউ অনেকের কাছে সুপরিচিত, আবার কেউ কেউ কেবল নিজ নিজ ক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
মার্কিন সাময়িকীর সম্পাদক স্যাম জ্যাকবস জানিয়েছেন, সেই প্রভাবশালীদের খুঁজে বের করতে টাইম বিশ্বজুড়ে তাদের সম্পাদক, প্রতিবেদক এবং বিভিন্ন সূত্রের কাছ থেকে মতামত নিয়ে থাকে। তাদের পাঠানো সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে থাকে। ‘হাউ উই চুজ দ্য ২০২৬ টাইম ১০০’ শিরোনামের প্রবন্ধে জ্যাকবস বলছেন, ‘আমাদের ধারণা, খুব কম মানুষই এই ১০০ জন ব্যক্তির সবার সঙ্গে পরিচিত থাকবেন। আমরা বিশ্বাস করি, এটাই টাইম ১০০—এর আকর্ষণের একটি অংশ, যা এখন তার তৃতীয় দশকে পদার্পণ করেছে, এবং এটিই এর টিকে থাকার কারণ।’ অর্থাৎ নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয় হলেও এর প্রাথমিক পর্বগুলোতে মনোনয়ন, বাছাই এবং সংক্ষিপ্ত তালিকাকরণে থাকে সাংবাদিকদের মতামত দেওয়ার সুযোগ।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যতটা জানা যায়, এই তালিকায় কারা থাকবেন তার পরামর্শ আসে টাইমের আন্তর্জাতিক লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত কর্মী এবং আগের বছরের ‘টাইম ১০০’ তালিকায় স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে। আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা প্রকাশের কয়েক দিন আগে টাইম একটি অনলাইন জনমত জরিপ চালায়। তবে পাঠকদের ভোট সরাসরি চূড়ান্ত নির্বাচনে প্রভাব ফেলে না; এটি শুধু জনমানুষের পছন্দের একটি প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে। চূড়ান্ত তালিকাটি মূলত টাইম সম্পাদকদের দ্বারা নির্বাচিত হয়।
এ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও ১০০ প্রভাবশালী নেতার তালিকায় আরও আছেন মার্কিন পোপ লিও চতুর্দশ, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইরানের চলচ্চিত্র পরিচালক জাফর পানাহি, মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই, নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি, ভারতের অভিনেতা রণবীর কাপুরসহ অনেকে। প্রতিবছরেই নির্বাচিত এই ১০০ জন সম্পর্কে লিখে থাকেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। এতে সেই ব্যক্তির পরিচিতি এবং নির্বাচিত হওয়ার পেছনে তাঁর কোনো ভূমিকার গুরুত্ব ছিল কিনা, তা উল্লেখ করা হয়। যেমন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে এবার লিখেছেন টাইমের সিঙ্গাপুর ব্যুরো অফিসের সম্পাদক ও ভূ—রাজনীতি বিশেষজ্ঞ চার্লি ক্যাম্পবেল।
বাংলাদেশের প্রভাবশালীদের নিয়ে যা বলেছে টাইম
গত ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত টাইমের ১০০ জনের তালিকায় স্থান পাওয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘মাত্র কয়েক মাস আগেও তারেক রহমান সবুজে ঘেরা লন্ডনের দক্ষিণ—পশ্চিমাঞ্চলে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে বাংলাদেশের স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে ৫৭ বছর বয়সী এই রাজনৈতিক উত্তরসূরি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী থেকে সম্ভাব্য জাতীয় নেতায় পরিণত হন। এই নিয়তি তিনি ফেব্রুয়ারিতে বাস্তবে রূপ দেন ১৭ বছর মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের মধ্য দিয়ে। এই বিজয়ের মাধ্যমে তারেক রহমান তাঁর মা খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চার্লি ক্যাম্পবেলের লেখা মুখবন্ধে।
তবে টাইমের এই তালিকায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যে সবসময় মানুষ স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছে এমন নয়। এমনকি এই তালিকায় থাকা অনেক প্রভাবশালীর ভূমিকা নিয়ে আছে কঠোর সমালোচনাও। চলতি বছরে প্রকাশিত তালিকায় থাকা কয়েকজন ব্যক্তির নাম নিয়েও আছে সেই বিতর্ক। এখানে একটা কথা থেকে যায়। টাইম কখনোই বলেনি প্রভাবশালী মানেই তারা শুধু ইতিবাচক চরিত্র হবেন। বরং এমন কেউ, যিনি গত এক বছরে সংবাদের শিরোনামে থেকে বিশ্বকে ভালো বা মন্দ— যে কোনোভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন— তারাই হতে পারেন।
প্রভাবশালী তালিকার বিতর্কিত ব্যক্তিরা
অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৮ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন যখন বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করে, সেখানেও অ্যাডলফ হিটলারের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৩৮ সালে মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার এবং জার্মানির সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের কারণে তাঁকে এই তালিকার শীর্ষে রাখা হয়েছিল। নাৎসি জার্মানির এই একনায়ককে বিশ্বশান্তির জন্য চরম হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে এ খেতাব দেওয়া হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্টালিনকে টাইম দুবার ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল। মূলত নাৎসি—সোভিয়েত চুক্তি এবং পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্বাচন করা হয়েছিল তাঁকে। তবে স্তালিনের একদিকে রাশিয়াকে কৃষিনির্ভর থেকে শিল্পোন্নত ও পরাশক্তিতে রূপান্তরের অবদান যেমন আছে, বিপরীতে তাঁর শাসনামলে গ্রেট পার্জ, গণহত্যা, রাজনৈতিক দমন—পীড়ন এবং দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু তাঁকে নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাই ম্যান অব দ্য ইয়ারে জোসেফ স্তালিনের নাম নিয়ে আছে বিতর্ক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার উঠে এসেছেন টাইমের প্রভাবশালীর তালিকায়। প্রতিবারই তা বিশ্বজুড়ে মেরূকরণ ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া অতীতে বাশার আল—আসাদ, কিম জং উন এবং তালেবান নেতা মোল্লাহ মোহাম্মদ ওমরের মতো নামও টাইমের ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় জায়গা পেয়েছে। টাইম কর্তৃপক্ষের মতে, প্রভাবশালীদের এই তালিকা কোনো সম্মাননা নয়, বরং এটি সমসাময়িক বিশ্বের একটি বাস্তবতা।
