মানুষ বুদ্ধিমান হতে পারেনি! || ড. জীবন বিশ্বাস নিউইয়র্ক

সমুদ্রের নীল জলরাশি যখন রক্তের মতো রাঙা হয়ে ওঠে, তখন পৃথিবীর মানচিত্রের ওপর দিয়ে এক হিমশীতল হাওয়া বয়ে যায়। ২০২৬এর এই মধ্যএপ্রিলের তপ্ত দুপুরে পারস্য উপসাগরের সেই সংকীর্ণ গ্রীবা, যাকে ভূগোলহরমুজ প্রণালিবলে চেনেÑসেখানে আজ নোনা জলের আছাড় খাওয়ার শব্দ নেই; বরং সেখানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে এক প্রলয়ংকরী অসম রণদামামা। তবে এই সংঘাত কেবল বারুদ আর ইস্পাতের আস্ফালন নয়, যেন এক গূঢ় অমীমাংসিত দার্শনিক সংকটের মূর্ত প্রকাশ। প্রশ্নটি পুরনো কিন্তু অমীমাংসিতÑআন্তর্জাতিক বিশ্ব কি আজও আইন, সার্বভৌমত্ব আর যুক্তির শৃঙ্খলে বাঁধা, নাকি শেষ পর্যন্ত সব আইন কেবল বলশালীর তরবারির কাছে নতজানু? আজকের উপসম্পাদকীয় সেই সংকটেরই এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ।

দৃশ্যপটটি বড়ই করুণ। গত এপ্রিল যে যুক্তরাষ্ট্রইরান যুদ্ধবিরতির কথা শোনা গিয়েছিল, তা যেন তাসের ঘরের মতো নড়বড় করছে। লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি বুটের শব্দ থামেনি। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের নৌবাণিজ্যের ওপর আরোপ করেছে নিশ্ছিদ্র অবরোধ। তেহরানও অবিচল; তাদের সোজা কথা, হত্যাযজ্ঞ সম্পূর্ণ বন্ধ না হলে এবং হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যের দ্বার যদি ইরানের জন্য শতভাগ উন্মুক্ত না হয়, তবে শান্তির কোনো তিলক কপালে জুটবে না। ফলস্বরূপ, যে জলপথ দিয়ে পৃথিবীর ধমনীর মতো তেল আর গ্যাস প্রবাহিত হতো, সেখানে আজ শ্মশানের নীরবতা। প্রতিদিন যেখানে ১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করত, সেখানে গত চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র সাতটি পালের দেখা মিলেছে। এটি কেবল প্রতীকী কোনো দ্বন্দ্ব নয়; যেন বিশ্ব অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরা এক নির্দয় বাস্তবতা।

একটু নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই দাবার বোর্ডের চালগুলো এখনও রহস্যময়ভাবে ইরানের আঙুলেই নিয়ন্ত্রিত। একে হয়তো প্রচলিত নৌযুদ্ধে তেহরানের বিজয় বলা যাবে না, তবে পরিস্থিতির রাশ তাদের হাতেই রয়ে গেছে। বীমার প্রিমিয়াম কত চড়বে, জাহাজ কোন পথ দিয়ে যাবে, আর কোন রাজনৈতিক শর্তে নাবিকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে তার অদৃশ্য কারিগর হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরান। রয়টার্সের তথ্য বলছে, চলাচল স্বাভাবিকের দশ শতাংশে নেমে এসেছে। ওয়াশিংটন ইরানের অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করতে পারে সত্য, কিন্তু সমুদ্রের বুক চিরে চলাফেরা করার যে সাহস, সেইনিরাপত্তার গ্যারান্টিদেওয়ার ক্ষমতা এখনও সে দেশের নাগালে আসেনি। প্রণালির ভেতরের ভয় আর অনিশ্চয়তা এখনও ইরানের এক অনন্য হাতিয়ার।

এই সংকটের গভীরতা বুঝতে পরিসংখ্যানের শুষ্ক গলি দিয়ে হাঁটতে হবে। হরমুজ কোনো সাধারণ জলপথ নয়; এটি বিশ্বের জঠরপূর্তির রসদ জোগায়। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়েই বিশ্বের প্রয়োজন মেটাতে যেত যা সারা বিশ্বের মোট তরল জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় একপঞ্চমাংশ। আর এলএনজি বা তরল গ্যাসের কথা না হয় বাদই দিলাম। বিকল্প পাইপলাইন বা অন্য কোনো পথ দিয়ে এই বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। তাই দেখা যায়, তেলের দাম কিছুটা কমে ব্রেন্ট ডব্লিউটিআই যথাক্রমে ৯৪.৪৯ ৯০.৫৯ ডলারে নামলেও ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ মোছেনি। মুদ্রাস্ফীতির যে রাক্ষস দরজায় কড়া নাড়ছে, তাকে সামাল দেওয়ার মন্ত্র কারোরই জানা নেই।

এখানেই আইনের কূটতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তেহরান হয়তো মনে করে, তাদের ভূখন্ডের কোল ঘেঁষে সমুদ্র বইছে বলে তারা এর একচ্ছত্র মালিক। কিন্তু আধুনিক সমুদ্র আইন বা টঘঈখঙঝএর ৩৭ ৩৮ অনুচ্ছেদ বলছে অন্য কথা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যবহৃত এই প্রণালিগুলোট্রানজিট প্যাসেজ’—এর অন্তর্ভুক্ত। এখানে কোনো রাষ্ট্র বলতে পারে না—‘অমুক আমার বন্ধু, তার জন্য পথ খোলা; তমুক আমার শত্রু, তার জন্য বন্ধ।সার্বভৌমত্ব মানেই সীমাহীন আধিপত্য নয়। আত্মরক্ষার অধিকার অবশ্যই আছে, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি কেটে দেওয়ার আইনি অধিকার কোনো মানচিত্রেরই নেই। হরমুজকে রাজনৈতিক দর কষাকষিরটোল প্লাজাবানিয়ে তোলাটা আন্তর্জাতিক আইনের বিচারে বড়ই দুর্বল এবং অন্যায় অবস্থান।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটিও বেশ ধূসর। আমেরিকার এই পাল্টাঅবরোধ কি তবে ধোয়া তুলসী পাতা? সান রেমো ম্যানুয়াল নামের যে আন্তর্জাতিক দলিলে নৌযুদ্ধের নিয়ম লেখা আছে, সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছেঅবরোধ হতে হবে সুনির্দিষ্ট, ঘোষিত এবং নিরপেক্ষ। কোনোভাবেই সাধারণ মানুষকে অনাহারে মারার বা বেঁচে থাকার রসদ থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশে সমুদ্রপথ বন্ধ করা যাবে না। জাতিসংঘ সনদও অন্য রাষ্ট্রের অখন্ডতায় আঘাত করাকে নিষিদ্ধ করেছে, যদি না সেখানে সশস্ত্র আক্রমণের প্রেক্ষাপট থাকে। তাই ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকেনৌচলাচল পুনরুদ্ধারের মহৎ চেষ্টানা বলে বরংবিদ্যমান উত্তেজনার ওপর গায়ের জোরের এক বাড়তি স্তরবলাই সঙ্গত।

এর সাথে জড়িয়ে আছে পরমাণু শক্তির সেই চিরচেনা জটিলতা। ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু ব্যবহারের দাবি কি তবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন? এনপিটি নম্বর অনুচ্ছেদ তো তাদের এই অধিকার দেয়। কিন্তু অধিকারের সাথে আসে দায়বদ্ধতা। আইএইএ সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০. কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম মজুত আছে। সংস্থাটি অসহায়ভাবে জানাচ্ছে, পর্যাপ্ত তথ্য আর প্রবেশের সুযোগ না থাকায় তারা বলতে পারছে না এই বিপুল তেজস্ক্রিয়তা কি শুধুই বিজলি বাতির জন্য, নাকি আড়ালে তৈরি হচ্ছে কোনো প্রলয়ংকরী মারণাস্ত্র। তেহরান নিজেই নিজের বিশ্বাসের ঘরটি পুড়িয়েছে যাচাইবাছাইয়ের প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে দিয়ে।

কিন্তু তাই বলে কি ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্র লাইসেন্স পেয়ে গেল যে তারা ইচ্ছামতো বোমা মেরে কোনো দেশের প্রযুক্তি ধ্বংস করে দেবে? জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ বলছে, সশস্ত্র আক্রমণ হলে তবেই পাল্টা আক্রমণের অধিকার জন্মায়।ভবিষ্যতে আক্রমণ হতে পারে’—এই কাল্পনিক আশঙ্কায় বাপ্রতিরোধমূলক নিরস্ত্রীকরণ’—এর নামে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এক ধরনের দস্যুতা। আরও করুণ রসিকতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলই একমাত্র রাষ্ট্র যারা এনপিটি বাইরে। এই বৈষম্য ইরানের ব্যর্থতাকে ক্ষমা করে না ঠিকই, কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বেরবোমা মেরে সোজা করোনীতিকে একচোখা শাসনের রূপেই প্রতিষ্ঠিত করে।

শেষ বিচারে বিশ্ব এক অন্ধকার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছে। হরমুজকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করার যে কৌশল ইরান নিয়েছে, তা যেমন আইনসম্মত নয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের জবরদস্তিমূলক নীতিও কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। সমাধান কোনো রণতরীর কামানে নেই, আছে আলোচনার টেবিলে। হরমুজকে উন্মুক্ত করতে হবে, আইএইএ পরিদর্শন হতে হবে কঠোর নিশ্ছিদ্র, আর ইরানকে দিতে হবে তাদের স্বচ্ছতার প্রমাণ। শান্তিপূর্ণ পরমাণু অধিকার আর মারণাস্ত্রের মধ্যে যে একটি সূক্ষ¥ সুতো আছে, সেটি যদি না চেনা যায়, তবে সমুদ্র আইন, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ আর বিশ্বব্যবস্থাসবই একদিন এই উত্তাল সাগরের অতলে চিরতরে তলিয়ে যাবে।

ইতিহাসের পাতায় তখন লেখা থাকবেÑমানুষ শক্তিমান হতে চেয়েছিল, কিন্তু বুদ্ধিমান হতে পারেনি।


Related Posts