তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রীত্বের দুই মাস || চাওয়া—পাওয়ার হিসাব নিকাশ

ঢাকা থেকেঃ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুই মাস পার করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়া তারেক রহমান শুরু থেকেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেন। ইতোমধ্যে টাইম ম্যাগাজিনে ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় নাম উঠেছে। ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়ার মতো অনেক ইতিবাচক কাজও করেছেন। তার পরও সাধারণ মানুষ মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি হিসেবে অনেক প্রশংসনীয় কাজ করলেও সরকারের কাছে মানুষ আরও কিছু প্রত্যাশা করছে। বিশেষ করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং সেক্টর সংস্কারে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো দলের নেতাকর্মী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের জনগণের সেবা করছেন নাকি দেশ শাসন করছেনএই বার্তাটাই এখন পর্যন্ত অনেক নেতাকর্মী অনুধাবন করতে পারছেন না। এদিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সবকিছুতেই সরকারকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।

আশাজাগানিয়া ইশতেহার দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ভূমিধস বিজয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রধানমন্ত্রীর আসনে স্টিয়ারিং ধরেন তারেক রহমান। এর আগে দেশে ফিরেই বিশাল জনসভায়আই হ্যাভ প্ল্যানবলে দেশের মানুষের মধ্যে স্বপ্ন জাগিয়ে তোলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। দায়িত্ব নিয়েই ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম মুয়াজ্জিনদের সম্মানি প্রদান, ক্রীড়াবিদদের কার্ড ভাতা প্রদান, কৃষক কার্ড বিতরণ, সরকারি দলের কোনো এমপির শুল্কমুক্ত গাড়ি সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, খাল খনন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, প্রধানমন্ত্রী হয়েও প্রটোকল না নিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা, নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া, যানজট জ্বালানি অপচয়ের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরের সংখ্যা ১৩১৪টি থেকে কমিয়ে চারটিতে আনা, স্টুডেন্ট ভিসায় জামানতবিহীন ঋণসীমা লাখ থেকে ১০ লাখ টাকায় উন্নীত করা, ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। হেলথ কার্ড বিতরণের প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে। শিশুদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়া হবে। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট বৈশ্বিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পরও দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াননি। মানুষের মধ্যে জাগিয়েছিলেন নতুন এক বাংলাদেশের প্রত্যাশা। তবে দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পর প্রত্যাশার অনেক জায়গায়ই আশানুরূপ অর্জন হয়নি বলে মনে করছে বিভিন্ন মহল।

দলীয় নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ মনে করছে, তারেক রহমানের সদিচ্ছা থাকলেও সরকারের মধ্যে পোকা বাসা বাঁধতে শুরু করেছে, যারা প্রধানমন্ত্রীকে নানাভাবে বিতর্কিত করছে। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সাধারণ মানুষের জরুরি চাহিদাগুলো পূরণে পিছিয়ে পড়ছে নতুন সরকার। এরই মধ্যে প্রশাসনসহ নানা খাতে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে। সচিবদের দ্বন্দ্ব, উপদেষ্টামন্ত্রীপ্রতিমন্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে পারছেন না। উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখলবাজির কারণেও প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমনকি ভুল তথ্যে লিখে দেওয়া স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে বারবার ট্রলের শিকার হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন কার্ড দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াচ্ছেনএটা নিঃসন্দেহে ভালো দিক। তবে অর্থনীতি ঘুরে না দাঁড়ালে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দিয়ে একটা দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব। সামাজিক নিরাপত্তার এসব অর্থ সরকারকে করের মাধ্যমেই সংগ্রহ করতে হবে। অর্থনীতি ঠিক না হলে রাজস্ব আদায়ে ভাটা পড়বে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের ব্যবসাবাণিজ্যে ধস নামে। মুখ থুবড়ে পড়ে বেসরকারি খাত। অনেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ভুয়া মামলা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়। এজন্য প্রয়োজন ছিল জরুরি ভিত্তিতে ব্যবসাবাণিজ্য সম্প্রসারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করা। তবে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি খাতটি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত উদ্যোক্তা শিল্প মালিকদের জন্য ইতিবাচক কোনো বার্তা সরকারের তরফ থেকে আসেনি। ভুয়া মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগও গত দুই মাসে নেওয়া হয়নি। কর্মসংস্থান না থাকায় চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক কলহ বাড়ছে। উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংকগুলোর ভুলনীতির কারণে অনেক সৎ শিল্পোদ্যোক্তা ঋণখেলাপি হচ্ছেন। ঋণ পেতেও ঝামেলা হচ্ছে। এলসি নিষ্পত্তি করতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে না। এতে অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমে গেছে। শ্রমিক ছাঁটাই করছে। আর শিল্প খাত একবার খাদের কিনারে চলে গেলে সেখান থেকে টেনে তোলা কঠিন হয়ে যাবে। দুই মাসেও নতুন সরকারের কাছ থেকে সংকট নিরসনে কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি। এদিকে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল নিয়ে বিশৃঙ্খলা ভোগান্তি সরকারকে চাপে ফেলেছে। একদিকে সরকারের তরফ থেকে বারবার জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে ৫০০ টাকার তেল নিতে মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে তিন থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত। তেল মজুত ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের কথা বলা হলেও তা দৃশ্যমান হয়নি। এমনকি বর্তমান জ্বালানিসংকট উত্তরণে দেশীয় তেলগ্যাস শিল্প মালিকদের সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর রাজধানীর সড়ক ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করার উদ্যোগে বিভিন্ন মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু একদিকে চলছে দখলমুক্ত করার অভিযান, অন্যদিকে ফের নতুন করে দখল হচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীরাই সরকারের কাজের বিরুদ্ধে গিয়ে ফুটপাত বরাদ্দ দিচ্ছেন। তারাই বিভিন্ন এলাকার খেলার মাঠ দখল করে মেলার আয়োজন করছেন। দুই মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি। বাজারে হাতে গোনা দুএকটি সবজি ছাড়া সবই ১০০ টাকার ওপরে কেজি। স্মরণকালের সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে মুরগি। ২০ দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে ১০০ টাকা। রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন দুই মাস। জীবনে প্রথম দুটি আসনে নির্বাচন করে দুটিতেই বিজয়ী হয়ে প্রথম সংসদ নেতা, প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিরোধীদলীয় নেতাদের বাসভবনে গিয়ে আন্তরিক পরিবেশে কথা বলে এক নতুন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের জন্ম দিয়েছেন। দেশের উন্নয়ন উদ্যোগের পাশাপাশি দেশবাসী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সহজ সরল চালচলন, আচারআচরণ, কথাবার্তাও মূল্যায়ন করছেন।

Related Posts