উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—৪ || ড. আনিস রহমান পেনসিলভেনিয়া
স্মার্ট কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ও কৃষি বিপ্লব
১। ভূমিকা: একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কৃষি
একবিংশ শতাব্দীর এই সন্ধিক্ষণে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূলতা খাদ্য উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ১০ বিলিয়ন স্পর্শ করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যার ফলে খাদ্যের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। প্রথাগত কৃষি পদ্ধতি, যা মূলত অভিজ্ঞতা এবং সীমিত সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, তা এই বিশাল চাহিদা পূরণে ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই সংকটময় মুহূর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), ইন্টারনেট অব থিংস (ওড়ঞ), এবং বিগ ডেটার সমন্বয়ে গঠিত ‘স্মার্ট কৃষি’ বা ‘সুনির্দিষ্ট কৃষি’ (চৎবপরংরড়হ অমৎরপঁষঃঁৎব) কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য বৈশ্বিক সমাধানে পরিণত হয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃষি একটি শ্রমনির্ভর পেশা থেকে ডেটা—চালিত আধুনিক শিল্পে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরাসরি সহায়তা করছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্মার্ট কৃষির ভূমিকা বহুমুখী। এটি কেবল ফলন বৃদ্ধি করে না, বরং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে অপচয় কমায়। প্রথাগত কৃষি পদ্ধতিতে সার, পানি এবং কীটনাশকের সুষম বণ্টন সম্ভব হয় না, যার ফলে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পায়। এআই—চালিত সেন্সর এবং ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টির মাত্রা এবং শস্যের স্বাস্থ্য রিয়েল—টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকদের নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। স্মার্ট কৃষির এই রূপান্তর কেবল উন্নত দেশেই সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এর প্রভাব ব্যাপক। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র কৃষকরা মোবাইল ফোন এবং স্বল্পমূল্যের এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়ন করছে। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব সরাসরি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা—বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, শূন্য ক্ষুধা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে।
২। প্রযুক্তির গভীরে: এআই—চালিত রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ
স্মার্ট কৃষির অন্যতম শক্তিশালী এবং সহজলভ্য প্রয়োগ হলো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফসলের রোগ ও পোকামাকড় শনাক্তকরণ। ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য এটি একটি আমূল পরিবর্তনকারী প্রযুক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, কারণ এর জন্য দামী যন্ত্রপাতির পরিবর্তে কেবল একটি সাধারণ স্মার্টফোনই যথেষ্ট। এই প্রযুক্তির মূলে রয়েছে কম্পিউটার ভিশন এবং ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম, যা মানুষের চোখের চেয়েও নিখুঁতভাবে রোগের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে।
ক। কনভোল্যুশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক (ঈঘঘ) ও এর আর্কিটেকচার
একটি এআই মডেল যখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত করে, তখন এটি মূলত কনভোল্যুশনাল নিউরাল নেটওয়ার্ক বা সিএনএন ব্যবহার করে। এটি মানুষের মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্সের অনুকরণে তৈরি। সিএনএন—এর বিভিন্ন স্তর ছবির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জ্যামিতিক কাঠামো বিশ্লেষণ করে। যেমন, শুরুর দিকের স্তরগুলো ছবির প্রান্ত বা লাইন শনাক্ত করে এবং পরবর্তী স্তরগুলো জটিল প্যাটার্ন যেমন—পাতার দাগ, রঙ পরিবর্তন বা পোকার আকৃতি শনাক্ত করে। আধুনিক স্মার্ট কৃষি সিস্টেমে ‘রেজনেটে’ (জবংঘবঃ) বা ‘মোবাইলনেট’ (গড়নরষবঘবঃ)—এর মতো আর্কিটেকচার ব্যবহৃত হয়, যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং কম মেমরিতে কাজ করতে সক্ষম। বিশেষ করে ‘এফিশিয়েন্টনেট—লাইট’ (ঊভভরপরবহঃঘবঃ—খরঃব) এর মতো মডেলগুলো স্মার্টফোনের সীমিত হার্ডওয়্যারেও ৯০ শতাংশের বেশি নির্ভুলতার সাথে কাজ করতে পারে।
খ। ভিশন ট্রান্সফরমার (ঠরঞ) ও হাইব্রিড মডেল
বর্তমানে সিএনএন—এর পাশাপাশি ‘ভিশন ট্রান্সফরমার’ (ঠরঞ) প্রযুক্তি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সিএনএন যেখানে ছবির একটি নির্দিষ্ট ছোট অংশকে গুরুত্ব দেয়, সেখানে ভিশন ট্রান্সফরমার পুরো ছবির বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে। এটি ‘সেলফ—অ্যাটেনশন’ মেকানিজম ব্যবহার করে ছবির বিভিন্ন অংশের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে, যা সূক্ষ¥ রোগ শনাক্তকরণে অত্যন্ত কার্যকর। বর্তমানে অনেক উন্নত সিস্টেমে সিএনএন এবং ভিআইটি—র সমন্বয়ে ‘হাইব্রিড মডেল’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ছবির স্থানীয় বৈশিষ্ট্য এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট—উভয়কেই গুরুত্ব দেয়।
গ। প্রযুক্তিগত কাজের ধাপ: ইমেজ প্রসেসিং থেকে রেজিয়ন অফ ইন্টারেস্ট (জঙও)
এই প্রযুক্তির সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি সুশৃঙ্খল কাজের ধারা। কৃষক যখন আক্রান্ত পাতার ছবি তোলেন, তখন প্রথম ধাপে ‘প্রি—প্রসেসিং’—এর মাধ্যমে ছবির আলোকসজ্জা ঠিক করা হয় এবং অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া হয়। এরপর ‘ইউ—নেট’ (ট—ঘবঃ) বা ‘কে—মিনস ক্লাস্টারিং’ পদ্ধতিতে পাতার আক্রান্ত অংশকে আলাদা করা হয়, যাকে বলা হয় ‘ইমেজ সেগমেন্টেশন’। এর পরের ধাপে ‘রেজিয়ন অফ ইন্টারেস্ট’ (জঙও) প্রযুক্তির মাধ্যমে মডেলটি কেবল সেই নির্দিষ্ট দাগ বা পোকার ওপর গুরুত্ব দেয়, যা নির্ভুলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরিশেষে, এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে ‘প্ল্যান্টভিলেজ’—এর মতো বিশাল ডেটাবেসের সাথে তুলনা করে মুহূর্তের মধ্যে রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
