যা দেখেছি যা বুঝেছি—৭ || মনিরুল ইসলাম সাবেক রাষ্ট্রদূত
অপত্যস্নেহ: কী এবং কেন
অপত্যস্নেহ হল সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, যা প্রাণীর মধ্যে স্বভাবগত প্রকৃতিজাত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিদ্যমান। এর অপ্রতিরোধ্য মায়াবী আকর্ষণ তীব্র তীক্ষè নিরন্তর নিঃসীম। শুধু নিজে বেঁচে থাকার জন্য নয়, সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ক্ষুদ্র কীট থেকে বৃহৎ স্থলজ—জলজ প্রাণী প্রাণান্ত চেষ্টা করে। সন্তানের জন্য সুষমখাদ্য যেমন অপরিহার্য, মানসিক সুস্বাস্থ্য নিয়ে সুশান্ত জীবনে প্রবেশের জন্য তেমনি অত্যাবশ্যক অপত্যস্নেহ। সন্তানের প্রতি বৈরী বিষাক্ত অবজ্ঞা ও বিদ্রুপাত্মক আচরণের বোঝা সে বয়ে বেড়াবে জীবনভর।
অপত্যস্নেহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কারণ তার আলোতে মানুষটি জগতকে দেখে। যখন আপনার দিকে তাকিয়ে সে হাসবে, সে হাসির জন্য পৃথিবী বিনিময় করা যায়। পিতামাতা প্রাণভরে পুত্রকে ‘বাবা’ ডাকতে চায়, কন্যাকে ডাকে ‘মা’। যে মানুষ তার সন্তানকে ‘বাবা’ এবং ‘মা’ ডাকার সৌভাগ্য পায়নি, তার জীবন অপূর্ণ। সন্তানকে আপনি ‘মা—বাবা’ ডাকেন এবং তারা আপনাকে ‘মা—বাবা’ ডাকেÑএই দুই হল পৃথিবীর সেরা প্রাপ্তি। সেজন্য মানুষ সন্তান চায়।
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার, শেষ সান্ত্বনা, পরম ভরসা হল সন্তান। এটা সংসারের মহোত্তম অতুলনীয় অপূর্ব অনুভূতি, অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা। এই ভালোবাসা স্বামী—স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসার চেয়ে গভীরতর। কারণ সন্তান উভয়ের দেহ ও আত্মার অংশ, তাদের জীবনের উত্তরাধিকার। পিতামাতা সন্তানের মধ্যে নিজেকে প্রতিফলিত দেখে। সন্তানের দিকে তাকান, আপনার দেহের বাইরে যেন আপনার প্রতিরূপ হাঁটে। দুঃখ সুখ উভয়ই মানুষ রেখে যেতে চায় পরবর্তী প্রজন্মের জন্যÑসুখকে ভোগ করতে, দুঃখকে স্মরণ করতে। জীবনশেষে মানুষের কিছু গল্প থাকে তার জীবন নিয়ে, সেগুলো সে শেয়ার করতে চায় কারো সাথে। তাই সে নবপ্রজন্মকে খোঁজে।
প্রাণীর কাছে সন্তানের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে সর্বোচ্চ স্থানে বিবেচ্য। সেজন্যই সিংহের থাবা থেকে নিরীহ জেব্রা বাঁচাতে চায় তার শাবককে, বাঘের মুখ থেকে ছানাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে যায় অক্ষম হরিণী, পুরুষ ব্যাঙ ও উটপাখি পাহারা দেয় অরক্ষিত বাচ্চাদের। অর্থাৎ সন্তান রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে পিতামাতা। কোনোরূপ বিনিময়হীন প্রত্যাশাবিহীন এই ভালবাসার স্বরূপ অনুধাবন করা যায় যদি তারা অকালে তিরোহিত হয়।
ঈশ্বর যেমন আদম—হাওয়াকে সৃষ্টি করে আনন্দসুখ অনুভব করলেন এবং ফেরেশতাদের নিয়ে উদ্যাপন করলেন, তার প্রতিনিধি মানুষও নিজের সন্তান জন্মদান করে সেই পরমসুখে ধন্য হয়। সন্তান পৃথিবীর সাথে আপনার বন্ধন সুদৃঢ় করে, জীবনের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করে জীবনকে পূর্ণতা দেয়। আপনার জীবনের যদি একটি মাত্র উদ্দেশ্য স্থির করতে বলা হয়, সেটি হবে সন্তানকে বড়/মানুষ করে তোলা। পুরো জীবনের ‘সেরা অর্জন’ কী, তাও হবে একটি লব্ধপ্রতিষ্ঠ সুসন্তান লাভ। ভিখিরি থেকে বাদশাহ, সবাই চায় তার সন্তান যেন তার চেয়ে বড় হয়, সে যা পারল না করতে, সন্তান যেন তা—ই করতে পারে। একমাত্র সন্তানের সাথে মানুষের কোনো হিংসা—বিদ্বেষ নেই।
শুধু একটি প্রজন্মÑসন্তান! তারপরই পৌত্র—প্রপৌত্রের জন্য তীব্র তৃষ্ণা স্তিমিত হয়ে আসে। তবু মানুষ এই সন্তানের জন্য কী না করতে পারে। জন্মদাতার এরূপ দুর্লঙ্ঘ্য ভালোবাসার জন্যই বংশাণুক্রমে মানবজাতি টিকে আছে, বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হল সন্তানের মাধ্যমে নিজেকে পুনর্জন্ম দেয়া, নিজের প্রতিকৃতি প্রতিভূ রেখে যাওয়া। সংসারে নারীর সবচেয়ে বড় দাবি/প্রাপ্তি হচ্ছে সন্তান, ‘আমার মধ্যে যে পুষ্পের সৌরভ, তাকে ফলে পরিণত করতে চাই।’ শুধু মানুষ নয়, প্রাণী বা মৎস্য নয়, উদ্ভিদও সযত্নে তার প্রজন্ম উৎপাদন—লালন করে। এই অপত্যস্নেহের কারণেই প্রাণীজগতের অব্যাহত ধারাবাহিকতা টিকে আছে।
সন্তানবাৎসল্য হল পৃথিবীর প্রাথমিক (ঢ়ৎরসধৎু) ভিত্তি, এটা সর্বোচ্চ—সর্বোত্তম—সম্পূর্ণ ভালোবাসা। এটা নিঃস্বার্থ নিঃশর্ত নিঃশঙ্ক, অপূর্ব অসীম অদ্বিতীয়। এটাই একমাত্র অনার্জিত ক্ষমাশীল ভালোবাসা, পৃথিবীর বাকি সব ভালোবাসা অর্জন করতে হয়, ভুল করলে মাশুল দিতে হয়। এটা জীবনব্যাপী ভালোবাসা, সেজন্যই বুড়োসন্তানও পিতামাতার চোখে ছোট্ট খোকা। মা—বাবার কাছে সন্তান মাত্রই রাজা—রানি, মাথার মুকুট। তেমনি সন্তানের কাছেও তার মা—বাবাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা—বাবা।
হে সন্তান, পৃথিবীর সমস্ত পুরুষের প্রতিনিধি তোমার পিতা, নারীর প্রতিনিধি তোমার মাতা। অন্যের চোখে তোমার মাতাপিতা যেমনই হোক তোমার জন্য তিনি সবোর্চ্চ পূজনীয়, তারা হলেন জীবন্ত ঈশ্বর। একমাত্র পিতামাতাই কাজ করে যায় নিজের জন্য নয়, সন্তানের জন্য। নিজের দুঃখ যন্ত্রণা লুকিয়ে সন্তানের হাসি—আনন্দ তার আরাধ্য। বুঝতেই পারি না যে পিতামাতার কাছে ‘এতবেশি চাই, এত কম দিই।’
হে জনক—জননী, শৈশবে যাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন, সময়—অর্থ—কষ্ট ব্যয় করে কোলেপিঠে বড় করেছেন, টিনএজ হওয়ার পর থেকে তার কথা ভুলে যাবেন না। নিজেকে যেমন করে ভালোবাসেন তাকেও তেমন করে আদর যত্ন করুন। সন্তানকে বরং নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসুন। বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে যেমন ভালোবাসেন, ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার জন্য সন্তানকে সেরূপ ভালোবাসুন। ভবিষ্যতের সুখের আশায় আমরা যেমন অর্থ সঞ্চয় করি, মৃত্যুর পর নিজেকে পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখার জন্য সন্তান হল সঞ্চয়। এই অতীব প্রয়োজনীয় সঞ্চয়কে কীভাবে বর্ধন সংরক্ষণ করা যায়, সেই ভাবনায় সময় দেয়া দরকার।
উঠতি বয়সের সন্তানকে উপহাস করে চুপসে দেবেন না, ধমক দিয়ে চুপ করাবেন না। তার বায়না সাদরে গ্রহণ করে সাধ—সাধ্যের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করুন। সবকিছুতেই প্রশ্ন করবেন না, লজ্জায় ফেলে বিব্রত করবেন না। তার কথাটুকু সাগ্রহে মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাকে তার মতো বড় হতে দিনÑবেঁচে থাকলে কিছু হবে। তার সাধ্যাতিরিক্ত ইচ্ছা—বর্হিভূত কিছুর জন্য চাপ দেবেন না। যতই সে স্বনির্ভর স্বাধীন হতে চায়, ভেতরে সে গভীরভাবে নির্ভরশীল।
বয়সের সাথে তার আচরণও পরিবর্তিত হবে, সময় বুঝে সমস্যার অংশীদার হোন। শাসন—শৃঙ্খলার পরও আদর—যত্ন অব্যাহত রাখুন। তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মূল্য দিয়ে তাকে গুরুত্ব দিন, যেমন তার শখ ইচ্ছা ভাবনা বই ছবি জন্মদিন অর্জন ইত্যাদিকে সম্মান করুন। সামাজিক অনুষ্ঠানে সস্পৃক্ত করুন যেন সে নিজেকে গোষ্ঠীর সদস্য হিসাবে দেখতে পায়।
স্পর্শের জাদুকরী শক্তি আছে। বয়স বুঝে স্পর্শের মাধ্যমে ‘ভালোবাসা’ প্রকাশ করুন। কোলে তুলে নিন, হাত ধরুন, আলতো করে চুমো দিন, সস্নেহে হাগ দিন, সাদরে বুকে চেপে ধরুন, মাথায় কাঁধে পিঠে হাত রাখুন। বন্ধুত্বমূলক মৌখিক প্রকাশভঙ্গি প্রদর্শন করুনÑহাসিমাখা চাহনি দিয়ে তাকে উদ্দীপ্ত রাখুন। আপনিই তার আদর্শ, তাকে সবকিছুর ‘সেরা’টা দিন। আন্তরিকভাবে বলুন: তোমাকে আমি ভালোবাসিÑতুমিই সেরা। তার কাজ ও কথার প্রশংসা করুন সর্বসম্মুখে, সংশোধন একান্তে। উৎসাহব্যঞ্জক ইতিবাচক কথার সুপ্রভাব পড়বে সন্তানের মনন গঠনে। ঘোলাটে আর ভয়ের নয়, সম্পর্ক হবে স্বচ্ছ এবং পারস্পরিক সম্মানের, যা পরস্পরকে কাছাকাছি নিয়ে আসবে। তবে অন্ধ মাত্রাতিরিক্ত ভালবাসার অত্যাচারও ঠিক নয়।
স্মর্তব্য, পিতামাতার স্নেহসিক্ত সন্তান প্রো—অ্যাক্টিভ হবে, সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শিখবে, ইতিবাচক দৃষ্টির অধিকারী হবে। তার আত্মবিশ^াস ও আত্মমর্যাদা বাড়বে। সামাজিক সম্পর্ক সুন্দর সুবহ হয়ে উঠবে, আবেগের স্বাভাবিক প্রকাশ—বিকাশ ঘটবে। নিরাপদ আশ্বস্তকর মনে করবে পৃথিবীটাকেÑজীবনে সে সুধীর সুস্থির সুস্থ সুখী হবে। পক্ষান্তরে অপত্যস্নেহবঞ্চিত সন্তান একাকিত্ববোধ করবে, পৃথিবীটাকে বন্ধুহীন মনে করে অসহায়ভাবে বিষণ্ণ বিরক্ত মন নিয়ে সময় কাটাবে। আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ করবে, বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা দিতে জানবে না। সঙ্গীদের, এমন কি নিজেকেও সম্মান করতে শিখবে না।
সন্তানকে ভালোবেসে দুটো জিনিস দিয়ে যেতে পারেন: ভালোবাসার ডানা, যেন সুখের আনন্দে উড়তে পারে; শিক্ষার শেকড়, যেন দুঃখের ঝড়ে উড়ে না যায়। এটাই পিতামাতার পক্ষ থেকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। মৃত্যুপথযাত্রী পিতামাতাকে যদি বলতে পারেন: ‘বাবা/মা, আমি আছি তোমার পাশে’, এটাই তাদের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার, জীবনধারণের সার্থকতা। জীবনের সবচেয়ে সুখের কান্না যেমন মায়ের কোলে, তেমনি সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অমলিন স্মৃতি হচ্ছে সন্তানের সুখ—দুঃখ। একজন মানুষের সবোর্চ্চ শোক যেমন তার সামনে তার সন্তানের মৃত্যু, তেমনি সর্বনিকৃষ্ট পাপ হল তার পিতামাতাকে কষ্ট দেয়া।
এই অপত্যস্নেহ বাঙালির নয়, বিশ^জনীন; মানবিক নয়, প্রাণবিক। অপত্যস্নেহের কারণেই রবীন্দ্রনাথ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। পুত্রকন্যার অকাল অপ্রত্যাশিত বিয়োগজনিত শোক দুঃখ তাঁকে রবীন্দ্রনাথ বানিয়েছে। অন্তর্জ্ঞানের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে দুঃখের বাণে¯্রাত। কবি নজরুল এবং অনেকেই তা—ই।
মায়াটা কী, কেন হয়? সবারই কি এমন হয়, সব প্রাণীর? কার কতটুকু? একটা উদাহরণ দিয়ে কথা শেষ করি। মরক্কোতে রাষ্ট্রদূতের বিশাল বাসায় কখন কোথায় যেন মেনিবিড়াল ছানা দিয়েছে চারটা। দিনরাত এদের ‘মেও মেও’ ডাকে বিরক্ত হয়ে এক সন্ধ্যায় ছানাগুলিকে ছালায় ভরে দূরে ফেলে দিয়ে এসেছে গৃহকমীর্। মা—বিড়ালটা যেখানে সর্বশেষ তার ছানাগুলিকে দুধ খাইয়েছিল, ঠিক সেখানে সারারাত বসে থাকল। সকালে, বিকালেও দেখি মুখ নীচ করে ঠায় বসে আছে ওখানে নিঃশব্দে। আমার ইচ্ছা হল, আমি ‘সন্তানবিরহ যন্ত্রণা’ মাপার একটা যন্ত্র চাই। সকল প্রাণীর শোকসন্তাপের পরিমাণ জানতে চাই। নইলে অপত্যস্নেহের তীব্রতা কী দিয়ে পরিমাপ করব?
