আলোর স্বপ্ন দেখিয়ে চলে গেলেন আশা
সেলিমা আশরাফঃ বিরানব্বইটি বসন্ত পার হওয়া এক জীবন্ত কিংবদন্তী আশা ভোঁসলের জীবনাবসান। ভারত উপমহাদেশের প্রতিটি সঙ্গীতপ্রেমী মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন এই প্রবাদপ্রতীম শিল্পী। তবে একজন শিল্পী কখনো চিরতরে চলে যায় না। আশা ভোঁসলে বেঁচে থাকবেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে।
শৈশবে আমার বেড়ে ওঠা আশা ভেঁাসলে, প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও সেই সময়ের আরো সব প্রিয় শিল্পীদের গান শুনে। ষাটের দশকের সেই স্বর্ণ যুগের গানই ছিল আমাদের একমাত্র শুদ্ধ বিনোদনের জায়গা। আমার মত এমন অনেক সঙ্গীতপ্রেমী মানুষের জন্য তাই আশা ভোঁসলের চলে যাওয়াটা আত্মস্থ করতে সময় লাগবে। তবে একজন শিল্পী কখনো চিরতরে চলে যায় না।
আশা ভোঁসলে অনেক শিল্পীদের কাছে যেমন অনুসরণীয় তেমনি জীবন যুদ্ধে যারা নিয়ত লড়াই করে চলেছেন তাদের কাছেও তিনি একজন লড়াকু সৈনিক হিসেবে অনুপ্রেরণার উৎস। মাত্র নয় বছর বয়সে পিতৃহারা হন। ফলে তার অগ্রজ লতা মুঙ্গেশকর পরিবারের দায়দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে বিয়ে করেন এক মদ্যপকে যার পরিণতি দুটি সন্তান নিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ। সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা পেতে বেগ পেতে হয়েছে তার সহোদরা লতা মুঙ্গেশকরের ঈর্ষা বা ‘প্রফেশলান জেলাসি’র কারণে। সঙ্গীতে তার কপালে জুটতো সে সব গান (ক্যাবারে বা শৃঙ্গার রসের গান) যা অন্য শিল্পীরা গাইতে চাইতো না। মধ্য বয়সে এসে কন্যার আত্মহত্যা ও ক্যান্সারে পুত্র সন্তানের মৃত্যুর মত শোকের পাহাড় অতিক্রম করতে হয়েছে তাকে।
তবে এসব কিছুই তাকে সঙ্গীত থেকে দূরে সরাতে পারেনি। সব বাঁধা অতিক্রম করে তিনি নিজেকে নিমগ্ন রেখেছিলেন সঙ্গীতে। নিজেকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করেছেন সম্মানের এক উচ্চস্থানে।
জীবনের এক পর্যায়ে এসে তিনি প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক রাহুলদেব বর্মণকে বিয়ে করেছিলেন। সে বিয়েও টেকেনি। কিন্তু তাদের মিলিত মেধা সঙ্গীত জগতকে ঋদ্ধ করেছে অনেক নতুন আঙ্গিকের গানের জন্ম দিয়ে।
ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে শেষ বিদায় জানিয়েছে। একজন শিল্পীর জন্য এই রাষ্ট্রীয় মর্যাদার চেয়েও বড় সম্মান সহ¯্র মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা। যা তিনি অর্জন করেছেন।
তার ওপারে চলে যাওয়ার খবর শোনার পর থেকে আমি গান শুনে চলেছি একের পর ‘আমি আপন করিয়া চাহিনি তোমায়’, ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’, ‘নাচ ময়ুরী নাচরে’, ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’, ‘মনের নাম মধুমতী’ এমন আরো আরো অনেক স্মৃতি জাগানিয়া গান। এভাবেই গানে গানে স্মরণ করবো, শ্রদ্ধা জানাবো আমাদের প্রিয় শিল্পীকে।
