গভর্নর্স আইল্যান্ডে সালমা কানিজের চিত্র প্রদর্শনী || সৃষ্টি ও জীবন প্রবাহের অনন্ত আখ্যান
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলাদেশী—আমেরিকান চিত্রশিল্পী সালমা কানিজর একক শিল্প প্রদর্শনী এঁরফবফ নু এৎধপব: এবহবংরং অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১ আগস্ট থেকে ৯ আগট ২০২৬ পর্যন্ত গভর্নর্স আইল্যান্ডের ১৬ নোলান পার্কের গ্যালারিতে। গভর্নর্স আইল্যান্ডে বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের আর্টিস্ট—ইন—রেসিডেন্স কর্মসূচি ‘বিটুইন রিভার এন্ড হারবরঃ স্টোরিজ দ্যাট ক্যারি আস’—এর অংশ হিসেবে এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
সালমা কানিজের শিল্পযাত্রার ভিত্তি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব ফাইন আর্টস থেকে এমএফএ সম্পন্ন করেন এবং পরে নিউইয়র্কের অলবেনিতে দ্য কলেজ অব সেন্ট রোজ থেকে আর্ট এডুকেশনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। কানিজের চিত্রকর্মগুলোতে তীর, সর্পিল আবর্ত, বৃক্ষ, বীজ, নারী এবং মহাজাগতিক আকৃতির পুনরাবৃত্ত প্রতীক পরিলক্ষিত হয়। অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের স্বচ্ছ স্তর, দ্রবীভূত সীমানা ও রঙের নীরব কম্পনের মধ্য দিয়ে কানিজ নারীত্বের এক অন্তর্লৌকিক ভূদৃশ্য উন্মোচন করেনÑযেখানে শক্তি কোমলতার ভেতর জন্ম নেয়, সহিষ্ণুতা ক্ষতের মধ্য দিয়ে দীপ্ত হয়, আর জীবন হয়ে ওঠে সৃষ্টি ও পুনর্জন্মের অনন্ত রূপক। তাঁর কাজে নারী কেবল চিত্রশিল্পের বিষয় নয়; নারী এখানে জীবনধারার উৎস, স্মৃতির আধার এবং অস্তিত্বের রহস্যময় ধারাবাহিকতার এক চিরপ্রবহমান প্রতীক। শিল্পীর এই প্রকাশ কোনো আকস্মিক উচ্ছ্বাস নয়। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার মেদহীন রূপান্তরই ফুটে উঠেছে তাঁর সাম্প্রতিক কাজে। বহু বছর আগে ঢাকার জয়নুল গ্যালারিতে যখন তাঁর প্রথম রঙের বিস্তার ঘটেছিল, তখনই তাঁর তুলির দৃঢ় রেখা, অর্ধ—বিমূর্ত গঠন আর মানব—অবয়বের জ্যামিতিক বিভাজন চিত্রবোদ্ধাদের নজর কেড়েছিল। সেই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ক্যানভাস কেবল বদলেছে, কিন্তু তাঁর আত্মানুসন্ধানের ব্যাকরণ বদলায়নি।
সালমা কানিজের এই একক প্রদর্শনীর জ্যামিতিক প্রতীক ‘তীর’—কে প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে এক বৈরিতা বা আক্রমণের চিহ্ন। কিন্তু কানিজের তুলিতে তা মোড় নেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাকরণে। তীরের তীক্ষè অগ্রভাগ যদি হয় আত্মসংকল্প ও শক্তির আলেখ্য, তবে তার পেছনের নরম পালক দুটো দিকনির্দেশ আর ভারসাম্যের নীরব প্রতীক। শক্তি যখন লক্ষ্যহীন হয়ে পড়ে, তখন তা তান্ডব রূপ নেয়। আর শক্তি যখন ভারসাম্য খুঁজে পায়, তখন তার নাম হয় প্রসন্নতা বা এৎধপব। ক্যানভাসে নারী তাই এখানে কেবলমাত্র সহিষ্ণুতার নমনীয় রূপই নয়Ñতা সংকল্প ও নান্দনিকতার এক অপূর্ব মহাজাগতিক সংযোগ।
কানিজের ক্যানভাসে চোখ রাখলে অগণিত রহস্যময় সংকেত ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে। একপাশে বাদামি, সবুজ আর বেগুনি রঙের জটলা; দুটি জৈব আকৃতি পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আছেÑযেন শিকড় আর মাটির সেই অকৃত্রিম আলিঙ্গন, কিংবা কোনো গূঢ় মাতৃজঠরে ভ্রম্নণের প্রথম নিঃশ্বাস। জন্ম বা এবহবংরং এখানে কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত নয়, তা এক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ। অন্য আরেকটি ক্যানভাসে দেখা যায় এক বিশাল নারীমূর্তি; নীল—বেগুনি বাসের ভেতর থেকে উঠে এসে যার হাত আকাশকে ছুঁতে চায়। তাঁর অবয়বের মধ্য দিয়ে তির্যকভাবে চলে গেছে এক দীর্ঘ তীর। কিন্তু সেই তীর আঘাত হানে না; তা যেন হয়ে ওঠে তাঁর যাত্রার গতিপথ ও মেরুদন্ড। মুখের চেনা অবয়ব না থাকায় তিনি আর নির্দিষ্ট কেউ থাকেন না, হয়ে ওঠেন প্রতিটি লড়াকু আত্মবিশ্বাসী মানবের চিরন্তন রূপক।
আবার চিত্রে গোলাপি, বেগুনি আর কালোর ঘূর্ণায়মান বৃত্তগুলো মনে করিয়ে দেয় আণুবীক্ষণিক জীবনের কোষ কিংবা ছায়াপথের দূরবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জকে। অতি ক্ষুদ্র জৈব জন্ম আর সুবিশাল মহাজাগতিক সৃষ্টিকে শিল্পী যেন বেধেছেন একই সর্পিল ছন্দে। আবার অন্য একটি ক্যানভাসে নীল পোশাকে আবৃত নারীর ঊর্ধ্বমুখী হাত দুটো জানায় মুক্তির আহ্বানÑএ যেন মানবতার এক নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোরই আহ্বান। অবয়ব নিজেই সেখানে পরিণত হয়েছে এক স্বয়ম্ভু তীরে।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখলে বোঝা যায়, শিল্পীর তুলিতে নারী, বৃক্ষ আর বীজ একই জীবনধারার পরিপূরক। এক ক্যানভাসে বসা নারী, প্রস্ফুটিত বৃক্ষ আর ডিম্বাকৃতি আকৃতিগুলোকে একই সুতোয় গেঁথে তিনি স্মরণ করিয়ে দেনÑসৃষ্টি কেবল সন্তান জন্মদানে সীমাবদ্ধ নয়, তা পুনর্জন্ম ও নবায়নের এক অবারিত প্রক্রিয়া। অন্য চিত্রে কমলা আর হলুদ রঙের ঘূর্ণিঝড়ের মাঝে নারীমূর্তিটি যেন নিজেই এক আস্ত মহাবিশ্ব। তাঁর চারপাশে চক্রাকারে ঘুরে চলেছে অগণিত নক্ষত্র। আবার প্রত্নতাত্ত্বিক ক্যানভাসে মিশরীয় পিরামিড কিংবা গ্রিক স্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী কেবল প্রাচীন ইতিহাসকে মনে করায় নাÑপ্রমাণ করে যে সভ্যতার সুদীর্ঘ ও জটিল ইতিহাসে নারী কোনো নীরব দর্শক ছিলেন না; তিনি ছিলেন তার মূল চালিকাশক্তি ও ধারাবাহিকতার বাহক।
মহাজাগতিক এই আড়ম্বরের ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে গভীর নিভৃত অনুভূতির কিছু সংক্ষিপ্ত ছবি। বাদামি ও ধূসর রঙের এক ক্যানভাসে সংকুচিত মানব—অবয়বটি মহাজাগতিক উল্লাসের বিপরীতে তৈরি করে গভীর আশ্রয়, নির্জনতা আর পারস্পরিক নির্ভরতার রূপচিত্র। আরেকটি চিত্রকর্মে দেখা যায় অভ্যন্তরীণ গৃহপরিসরে আবদ্ধ এক গর্ভবতী মায়ের শরীর। সেখানে সৃষ্টি কোনো ঘটা করে উদযাপিত দৃশ্য নয়, তা একান্তই নিভৃত, স্পর্শকাতর আর এক পরম প্রতীক্ষার নাম। তুলির দ্রুত ও বৃত্তাকার গতি নির্দেশ করে যে, সালমা কানিজের এই সৃষ্টিশীলতা কেবল বন্ধ ঘরের বদ্ধ ভাবনা নয়। বাইরে প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় বসে আঁকা সেই ছবিগুলোর ভেতরেও একই ঘূর্ণাবর্ত আর গতির সংকেত বিদ্যমান।
বস্তুত, সালমা কানিজের এই প্রদর্শনী কোনো স্থির চিত্রমালা নয়, বরং এক ধারাবাহিক ‘হয়ে ওঠার’ ব্যাকরণ। তীর যেখানে গতি দেয়, সর্পিল রেখা সেখানে শেখায় পুনরাবৃত্তি; বীজ যেখানে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনে, বৃক্ষ সেখানে মাটিতে শিকড় রেখেও আকাশকে স্পর্শ করার সাহস দেখায়। আর নারীর অবয়ব সেই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ইতিহাসকে যুগে যুগে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বহন করে চলে।
