ভ্রমণ গদ্য—৫ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ শাহাব আহমেদ ফ্লোরিডা
নটর—দামের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, কখনও কখনও মানুষের সৃষ্টি তার স্রষ্টার চেয়ে বহুকাল বেশি বাঁচে।
আর্মেনিয়ায় গেলে সত্যটি স্বচক্ষে দেখা যায়।
ভেতরে ঢুকি।
বিশাল।
ব্যাপক।
সম্মোহিত বিস্ময়!
মেধা, শ্রম, শিল্প, অর্থÑকোনো কিছুর কসুর করা হয়নি।
চোখ সকেট থেকে বের হয়ে আসতে চায়।
কিন্তু ওই যে নির্বোধ বোধ!
সৌন্দর্য দেখে তার পেছনের মূল্যটা খুঁজতে ইচ্ছে হয়।
কত কোটি মানুষের শ্রম, জীবন, রক্ত, সুখ ও হাহাকার দিয়ে তৈরি হয়েছে ইউরোপের এই ঐশ্বর্য?
আফ্রিকা থেকে কত লক্ষ মানুষকে শিকল পরিয়ে সমুদ্র পার করানো হয়েছে, কতজন জাহাজেই মারা গেছে না খেয়ে, অসুখে, শোকে, কতজন সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছে, কতজন নিঃশেষ হয়েছে হাইতি ও ক্যারিবীয় প্ল্যান্টেশনে?
ইতিহাসের হিসাব সরল নয়।
কিন্তু সভ্যতার এই ঐশ্বর্যের সঙ্গে উপনিবেশ, দাসশ্রম ও লুণ্ঠনের সম্পর্কটা অস্বীকার করার সাহস ও শক্তি আছে কারও?
সৌন্দর্যের দেয়ালে ইতিহাসের কালো মুখ।
কালো ছায়া।
পরের দিন কাটে ভার্সাই প্রাসাদ ও বাগান দেখে।
এখানেও সেই আকাশছোঁয়া ঐশ্বর্য ও জাঁকজমক!
সেন্ট পিটার্সবুর্গের পাশে জারদের বৈভবপূর্ণ পিটারহফ প্রাসাদের কথা মনে পড়ে।
হাজার হাজার ছবি, ভাস্কর্য, আসবাবপত্র, সোনায় মোড়ানো দেয়াল ও কলাম, বিশাল বিশাল ছবি আঁকা সিলিংÑকী নেই!
ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের কিংবদন্তির কথা মনে পড়ে।
আর সেমিরামিদা।
রুশ ভাষায় নামটা অদ্ভুত কোমল শোনায়, অথচ কিংবদন্তির সেই নারী ছিলেন কী না ক্ষমতালোভী, যুদ্ধপ্রিয়, নির্মম।
ভার্সাইয়ের দিকে তাকিয়ে মনে হয়Ñসৌন্দর্য আর ক্ষমতা কেন এতবার পাশাপাশি দাঁড়ায়, আর তাদের ছায়ায় এত মানুষের দুঃখ জমে থাকে?
মেরি আন্তোয়ানেত কি কিংবদন্তির সেমিরামিদার মতো নিষ্ঠুর ছিলেন?
নাকি ছিলেন প্রজাদের কষ্টের প্রতি অনুভূতিহীন, অথবা তা উপলব্ধি করতেই অক্ষমÑপ্রাচুর্য আর ভোগে বিনষ্ট এক নারী?
এই প্রাসাদের আলো আর বাইরের ক্ষুধার মধ্যে দূরত্ব ছিল বিশাল।
এবং সেই একই প্রশ্নÑ
কত মানুষের জীবনের বিনিময়ে এই জাঁকজমক?
রাজা চতুর্দশ লুই ভার্সাইকে ফরাসি রাজশক্তির প্রতীকে পরিণত করেছিলেন। এখানে শুধু রাজপরিবার থাকত না, রাজদরবারকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল জগৎ।
রাজা কেন্দ্র।
বাকিরা যেন তাঁর চারদিকে ঘুরে চলা গ্রহ—উপগ্রহ।
দেয়ালের বাইরে ছিল আরেকটি ফ্রান্স।
বাস্তবতার ধুলো—ধূসর ফ্রান্স।
১৭৮৯ সাল।
খাদ্যাভাব, আকাশছোঁয়া রুটির দাম, রাষ্ট্রের ঋণ আর মানুষের ক্ষোভ একসঙ্গে জমে বিস্ফোরক হয়ে উঠেছিল।
অক্টোবর মাস।
যে পথে আজ পর্যটকের বাস আসে, সেই পথে প্যারিসের হাজার হাজার ক্ষুধার্ত নারী রুটির দাবিতে হেঁটে আসছে এই প্রাসাদের দিকে।
কারও হাতে লাঠি।
কারও হাতে যা জুটেছে তাই।
তাদের পেছনে আরও মানুষ।
রাজা—রানীকে ভার্সাই ছেড়ে প্যারিসে যেতে বাধ্য করা হয়।
তারপরের ইতিহাস সবার জানা।
কয়েক বছরের মধ্যে রাজা—রানী দুজনেরই মাথা পড়ে গিলোটিনে।
এই সেই প্রাসাদ।
আজও দাঁড়িয়ে আছে।
রাজা নেই।
রানী নেই।
সেই ক্ষুধার্ত নারীরা নেই।
তাদের সংঘর্ষের মঞ্চটি রয়ে গেছে।
পৃথিবী বদলেছে?
না।
শোষণের রূপ বদলেছে।
জুলুমের নান্দনিকতা বেড়েছে।
ভার্সাইয়ের দরজায় হয়তো আজ ক্ষুধার্ত জনতা নেই।
কিন্তু পৃথিবীতে ক্ষুধা আছে।
এখনও যুদ্ধ বাঁধে, অস্ত্র বিক্রি হয়, মানুষ মরে। প্রচারমাধ্যম মিথ্যা বলে, মানুষ বিশ্বাস করে। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে মানুষ উঠে দাঁড়ায়। তারপর যারা আসে, তারাও আগের শাসকদেরই পথ ধরে হাঁটে।
ভালো = মন্দ।
সমীকরণটা বরং এখন আরও সহজ।
তোমার সামনে সব ক্যান্ডিডেটই মুনাফাখোর।
একজনকে বেছে নিতে হবে।
কোনো জবরদস্তি নেই।
হেমলক, না ধুতুরা, না বেলাডন্না—
তুমি স্বেচ্ছায় বেছে নাও।
ওটা তোমার গণতান্ত্রিক অধিকার।
যৌবনে ছাত্র ইউনিয়ন—সিপিবির বলয়ে সত্যের সন্ধান করেছি।
মার্কস সত্য।
লেনিন সত্য।
অক্টোবর বিপ্লব মুক্তির পথ।
সেই মোহে মোহনদাস হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছি। যতদিন ছাত্র ছিলাম, সিপিবি—ছাত্র ইউনিয়নের লাঠিয়াল হিসেবে কত কত বিপ্লব করেছি লেনিনগ্রাদ শহরে বসে!
তারপর মহান মানবতার দেশটি হঠাৎ ধসে গিয়ে পেছনে রেখে গেল কতগুলো সত্য, লুকানো কত মিথ্যা এবং প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
