বিপার নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের অন্যরকম অভিষেক || শিকড়ে যার শুরু, আলোর পথে তার যাত্রা
বাঙালী প্রতিবেদনঃ কবিতা, নাচ ও গানের ত্রিমাত্রিক পরিবেশনা গত রবিবার নিউইয়র্কের সংস্কৃতিপ্রেমি বাঙালিদের মন ভরিয়ে দিয়েছে। নিজ নিজ সৌন্দর্যে তিনটি পর্বই ছিল যেমন সমুজ্জ্বল, তেমনই ছিল একটি মাত্রা অপর মাত্রাকে অতিক্রম করে যাওয়ার শিল্পিত প্রচেষ্টা। শেষ পর্যন্ত এই তিনটি পর্ব মিলিয়ে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস বিপার একটি ফুলের তিনটি পাপড়ির মত বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে। প্রথম পর্বে ছিল তাহরিনা পারভিন প্রীতির একক আবৃত্তি পরিবেশনা ‘হৃদয়—গহন দ্বারে যে কবিতা কড়া নাড়ে’। এই অনুষ্ঠান হয় জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে।
তাহরিনা পারভিন প্রীতি একজন সচেতন নারী শিল্পী হিসাবে তার যে অনুভব, যে অব্যক্ত উচ্চারণ ও প্রতিবাদ, ভালোবাসা ও দেশপ্রেম, তা তুলে ধরতে চেয়েছেন কবিতার উচ্চারণে—উচ্চারণে। শুরু হয়েছে শৈশব স্মৃতি থেকে, শেষ হয়েছে নারীকে জেগে ওঠার আহবান জানিয়ে। শৈশব স্মৃতি থেকে তিনি চলে গেছেন জন্মভূমিতে, নাম দিয়েছেন জননী জন্মভূমি। তৃতীয় পর্বটি প্রনিধানযোগ্য। একজন নারীর নানা বয়সের রূপান্তর এবং পরিচিতি পরিবর্তনের স্বরূপ। মাতৃত্ব, শৈশব, প্রেমিকা, বন্ধু এবং প্রকৃতিতে একাকার হয়ে যাওয়া। তবে জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ভালোবাসার বিভিন্ন মাত্রাও তুলে ধরেছেন ভালোবাসা, ভাল নেই পর্বে। শেষ পর্বে সরাসরি আহবান ‘নারী, তুমি জেগে ওঠো’ বলে।
এর মাঝে মাঝে আবৃত্তিকে আরো সম্পূর্ণ করে তুলেছে তার কন্যা তাহিয়া অধরার সংগীত সহযোগ, যন্ত্রসংগীতের পরিমিত অনুষঙ্গ এবং পরিবেশ।
তাহরিনা পারভিন প্রীতি শিরোনামে ‘হৃদয় গহন দ্বারে যে কবিতা কড়া নাড়ে’ এই মোহন মেসেজ না দিলেও কবিতাকেই ওপরে তুলে ধরেছেন। সুনির্বাচিত ছড়া, কবিতা ও গদ্যের সমন্বিত গ্রন্থনা, সুন্দর আবৃত্তি ও পাঠ এবং মঞ্চের সেটিংস, পুরো পর্বটিতে শ্রোতা ও দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে দেয়। অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ কেড়েছে আবৃত্তি, পাঠ থেকে সংগীত, আলো, মন্দিরা, কীবোর্ডের আবহসংগীত এবং শব্দ নিয়ন্ত্রণ। সবকিছুই ছিল একই লেভেলে, একই লয়ে এবং পরিমিত।
নস্টালজিয়া দিয়ে শুরু হলেও শেষে যে জেগে ওঠার আহবানÑ সেই আহবানই দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে যায়। পাঁচ পর্বের পাঁচ শিরোনামে অলংকৃত এই অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, ছড়া ও গদ্য মিলিয়ে ছিল ৩৪টি। আবৃত্তি থেকে অধরার গানের কিউ এবং গান থেকে আবৃত্তিতে ফেরা সুচারু ছিল। অধরা নাহিয়ান তার মা প্রীতির কবিতার লয়ের সাথে সুন্দরভাবে সংযুক্ত করেছে গানকে। একইভাবে মন্দিরায় শহীদউদ্দিন, কীবোর্ডে রবিউল হাসান (বিশেষ করে বাঁশির ইফেক্ট) এবং হারমোনিয়ামে কৃস্টিনা রোজারিও দুই শিল্পীকে যথাযথভাবে সমন্বয় করেছে। বিষয় ও পরিবেশনার এমন সাযুজ্যর কথা নিউইয়র্কের সংস্কৃতি কমীর্রা দীর্ঘদিন মনে রাখবে। এই অনুষ্ঠানের প্রণোদনা এসেছে বাংলাদেশের বিপ্লব রানার কাছ থেকে। গ্রন্থনা ও পরিবেশনায় মেহেদী হাসান।
‘আলোর পথে স্বপ্নের যাত্রা’
বিপার পরিবেশনা দেখলে বোঝা যায় তাদের অনুষ্ঠানে একটা বা একাধিক মেসেজ আছে। অর্থাৎ কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয়। এই পর্বটি নাচের। নামেই স্পষ্ট হয়, বিপা তাদের স্বপ্ন যাত্রার কথা বলতে চাইছে। কোন্ পথে সেই স্বপ্ন যাত্রা? আলোর পথে। বিপা ক্রমশ তাদের নেতৃত্ব এবং শিক্ষকতার মশাল নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান শিল্পীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এর আগের অনুষ্ঠানে যাদের দেখা গেছে মঞ্চে পারফর্মার হিসাবে। এই অনুষ্ঠানে তারা পরিবেশন করলেন শিক্ষক বা প্রশিক্ষক হিসাবে। এর মধ্য দিয়ে অভিভাবকরা জানতে পারলেন তাদের সন্তানরা প্রশিক্ষক হওয়ার মেধা অর্জন করেছে। এটা তাদের এক ধরনের অভিষেক বটে নতুন পরিচয়ে। এই ৮ শিল্পী/প্রশিক্ষক হলেন নাদিয়া ইসলাম, জারিন মাইশা, নাহরিন ইসলাম, সাঈদা জ্যোতি, মাহিমা খান, রাইসা জেরিন, জগন্নাথ লাইরেঞ্জাম ও জলি মনি লাইরেঞ্জাম। শুরুতেই ‘জগত জুড়ে ভুবন জুড়ে আনন্দ গান বাজে’র মত গান দিয়েই মঞ্চে যুগল নৃত্য পরিবেশন করেন দুই বোন নাদিয়া ও নাহরিন। দ্বিতীয় পরিবেশনাটিও ছিল যুগল মনিপুরী নৃত্য। এই নাচটি পরিবেশন করেন মনিপুরী শিল্পী জগন্নাথ লাইরেঞ্জাম ও জলি মনি লাইরেঞ্জাম। তৃতীয়টিও ছিল মনিপুরি লোকনৃত্য পরিবেশন। চতুর্থ নৃত্যটি ছিল কত্থক। পরিবেশন করেন জারিন মাইশা ও মাহিমা আলি খান। শেষ পরিবেশনাটি ছিল দলীয়। বিপার নতুন প্রজন্মের ৭ শিল্পী ও প্রশিক্ষক চমৎকার সমন্বয়ে দৃষ্টিনন্দন নৃত্যটি পরিবেশন করেন ‘পৃথিবীর পথে পথে নিজেকে বেসেছি বড় ভাল’ গানের সাথে। এইসব নাচের কোরিওগ্রাফার ছিলেন এ্যানি ফেরদৌস, হাসান ইশতিয়াক ইমরান ও জগন্নাথ লাইরেঞ্জাম। নাচের আগে শিল্পীদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরেন সঞ্চালক সাবিনা শারমিন। এই নৃত্য পর্বটিও দর্শকদের আলোর পথে নিয়ে যায়।
তৃতীয় পর্বঃ সুরে এই ঝর ঝর ঝর্ণায়
এই পর্বে সংগীত বিভাগের নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা ১২টি গান গেয়ে শোনায়। এইসব গানে যেমন ছিল পুরনো দিনের নস্টালজিয়া তেমনই ‘দ্যাখো আলোয় আলোয় আকাশ’ এর মত মন ভালো করে দেয়া গান। এই চার শিল্পী হলেন কাজী মাহমুদুল হক, ফাবিহা নিসা, আলভান চৌধুরী, প্রীতিজা পারমিতা। কখনো তারা একক, কখনো দ্বৈত, কখনো চতুর্কণ্ঠ একত্রে গান করেন নানা অঙ্গের। এই পর্বের কয়েকটি গান হলো সুরের ঐ ঝরঝর ঝরঝর ঝর্ণাধারায়, গহন মেঘের ঐ ছায়া ঘনায়, তুমি যাকে ভালোবাসা স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো, যমুনা কি বলতে পারো কতবার কেঁদেছে রাধা, আমি অবুঝের মত একি করেছি, আমায় নহে গো ভালোবাসো তুমি, কিছু কিছু কথা জমে আছে, যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা, এবং দ্যাখো আলোয় আলোয় আকাশ। এই শিক্ষার্থীরা নিপুণ সৌন্দর্যে গেয়ে জানান দিলেন শিক্ষক হিসাবে তারা কতটা যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
এই গানগুলির শিক্ষক সেলিমা আশরাফ। তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানান। বিশেষ করে যন্ত্রানুষঙ্গে যারা ছিলেনÑ হারমোনিয়ামে লিমন চৌধুরী, তবলায় পিনাকপানি গোস্বামী, কীবোর্ডে রবিউল হাসান, গিটারে অভিজিত চক্রবতীর্, অক্টোপ্যাডে সাত্তার মাহমুদ ও মন্দিরায় শহীদ উদ্দিন। এই পর্যায়েও শিল্পীদের পরিচিতি তুলে ধরা হয়। চার শিল্পীর পরিচিতি তুলে ধরে বিপার চার শিল্পী বুশরা তুবা, জারিয়া কামাল, আমিনা ইসলাম ও জাহিন হোসেন রীতি।
তৃতীয় পর্ব শুরুর আগে এ্যানি ফেরদৌস বলেন, ১৯৯৩ সালে এস্টোরিয়ার স্টোর ৫১’র বেসমেন্টে ৬ ছাত্রছাত্রী নিয়ে যে বিপার যাত্রা শুরু হয়, আজ তা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আমরা হঠাৎ এমন হইনি। বছরের পর বছরের শ্রমে নিষ্ঠায় ও ত্যাগে হয়ে উঠেছি। এ্যানি ফেরদৌস বলেন, আমাদের কর্মকান্ড দেখে অনেকেই বলেন আমরা প্রবাসের ছায়ানট হয়ে উঠছি। এই কথা শুনলে আমাদের ভাল লাগে।
সেলিমা আশরাফ এবং এ্যানি ফেরদৌস বলেন, ৩৩ বছর ধরে আমরা যে মশাল বহন করে চলেছি, তা আমরা নতুন প্রজন্মেন হাতে তুলে দিয়েছি। এই অনুষ্ঠান তারই একধরনের অভিষেক।
এই সময় বিপার সকল বিভাগের শিক্ষকদের মঞ্চে আহবান জানিয়ে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রবীণ শিক্ষক মনিরা ইয়াসমিন বক্তব্য রাখেন। আবৃত্তির শিক্ষক সাবিনা শারমিন নৃত্য পর্বের যে নাম তা কয়েকবার সুন্দরভাবে আবৃত্তি করে দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে দেন: শিকড়ে যার শুরু, স্বপ্নে যার ডানাÑআলোর পথে তারই যাত্রা।
