মেডিসিন, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন ও সাহিত্যে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেলেন যাঁরা

ড. জীবন বিশ্বাসঃ মানবসভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক বর্ষপঞ্জিতে অক্টোবর এক অনন্য মাস। প্রতিবছর স্টকহোম ও অসলো থেকে ঘোষিত হয় নোবেল পুরস্কার। ৮ অক্টোবর পর্যন্ত চারটি বিভাগে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে—চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও সাহিত্য। তাঁদের অর্জনের বিষয় আলাদা: (১) আলো দিয়ে স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণ, (২) মহাবিশ্বের প্রায় অধরা কণা শনাক্তকরণ, (৩) অণুর অসমমিতির ব্যাখ্যা এবং (৪) ধ্রুপদী ঐতিহ্যের নবনির্মাণে সাহিত্যের নতুন প্রকাশরীতি। তবু তাঁদের অনুসন্ধানকে যুক্ত করেছে এক মৌলিক সত্য: অদৃশ্য ও দুর্বোধ্যকে উপলব্ধির নতুন পথ আবিষ্কারের মধ্য দিয়েই মানবজ্ঞানের সীমানা সম্প্রসারিত হয়। 

চিকিৎসাবিজ্ঞান: আলোয় উন্মোচিত মস্তিষ্কের রহস্য

৫ অক্টোবর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোরোগবিশেষজ্ঞ কার্ল ডেইসেরথ (জন্ম ১৯৭১) স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। জার্মান জীবপদার্থবিজ্ঞানী পিটার হেগেমান (জন্ম ১৯৫৪) বার্লিনের হামবোল্ট ইউনিভার্সিটির গবেষক। অপর জার্মান জীবপদার্থবিজ্ঞানী গেওর্গ নাগেল (জন্ম ১৯৫৩) ভুর্ৎসবুর্গ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। আলোক—নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিকস (ঙঢ়ঃড়মবহবঃরপং), আবিষ্কারে তাঁদের মৌলিক অবদানের জন্য এই স্বীকৃতি।

হেগেমান আলোকসংবেদনশীল অণুজীব নিয়ে গবেষণা করেন। নাগেল আলোর প্রভাবে কোষঝিল্লিতে আয়ন চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী চ্যানেলরোডপসিন প্রোটিনের বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে ডেইসেরথ ও তাঁর সহযোগীরা এই আণবিক প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত করেন।

অপটোজেনেটিকসের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আলো প্রয়োগ করে নির্বাচিত স্নায়ুকোষকে সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় করতে পারেন। ফলে স্মৃতি, অনুভূতি, চলাচল ও আচরণে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষের কার্যকারণ সম্পর্ক পরীক্ষা করা সম্ভব হয়। স্নায়বিক ও মানসিক রোগের গবেষণায় এর গুরুত্ব অসামান্য। দৃষ্টিশক্তি আংশিক পুনরুদ্ধারের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ আশাব্যঞ্জক হলেও জিন সরবরাহ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এই আবিষ্কার স্মরণ করিয়ে দেয়, অণুজীব সম্পর্কে মৌলিক কৌতূহলও একদিন মানুষের মস্তিষ্ক বোঝার যুগান্তকারী প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।

পদার্থবিজ্ঞান: নিউট্রিনোর বার্তায় মহাবিশ্বের নতুন পাঠ

৬ অক্টোবর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণকারী ফ্রান্সিস হালজেন (জন্ম ১৯৪৪)। কু লুভেনে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন—ম্যাডিসন ইউনিভাার্সিটিতে শিক্ষকতায় যোগ দেন। অ্যান্টার্কটিকার আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণকেন্দ্র নির্মাণের অন্যতম প্রধান রূপকার তিনি। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় হচ্ছে, ‘ঈড়হঃৎরনঁঃরড়হং ঃড় ঃযব ওপবঈঁনব ঘবঁঃৎরহড় ঙনংবৎাধঃড়ৎু ধহফ ঃযব ফরংপড়াবৎু ড়ভ যরময—বহবৎমু হবঁঃৎরহড়ং ড়ভ ধংঃৎড়ঢ়যুংরপধষ ড়ৎরমরহ’.

নিউট্রিনো বৈদ্যুতিক আধানহীন, অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভরবিশিষ্ট মৌলিক কণা। পদার্থের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া এত দুর্বল যে বিপুলসংখ্যক নিউট্রিনো প্রায় বাধাহীনভাবে পৃথিবী অতিক্রম করে।

হালজেন উপলব্ধি করেন, অ্যান্টার্কটিকার গভীর বরফস্তর এসব কণা শনাক্তের প্রাকৃতিক মাধ্যম হতে পারে। আইসকিউবে প্রায় এক ঘনকিলোমিটার বরফের মধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি আলোকসংবেদনশীল সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে। বিরল নিউট্রিনো মিথস্ক্রিয়ায় উৎপন্ন আধানযুক্ত কণা চেরেনকভ বিকিরণ সৃষ্টি করতে পারে। সেই ক্ষীণ আলোকসংকেত শনাক্ত করেই আগত নিউট্রিনো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্তকরণ জ্যোতির্বিজ্ঞানে নতুন পর্যবেক্ষণপদ্ধতির সূচনা করেছে। আধানযুক্ত মহাজাগতিক রশ্মির মতো নিউট্রিনো চৌম্বকক্ষেত্রে বেঁকে যায় না; ফলে দূরবর্তী মহাজাগতিক ঘটনার উৎস শনাক্তে তা মূল্যবান। নিউট্রিনো, আলো এবং অন্যান্য মহাজাগতিক সংকেতের সম্মিলিত বিশ্লেষণ বহুসংকেতভিত্তিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সম্ভাবনাও সম্প্রসারিত করেছে। যদিও সব নিউট্রিনোর উৎস এখনো নির্ধারিত হয়নি, মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এটি এক মৌলিক অগ্রগতি।

রসায়ন: জীবনের অণু কেন একদিকে ঝুঁকে থাকে

৭ অক্টোবর রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ অঁরি বি. কাগান (জন্ম ১৯৩০) এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই (জন্ম ১৯৫০)।

কাগান প্যারিসের ঊপড়ষব ঘধঃরড়হধষব ঝঁঢ়বৎরবঁৎব ফব ঈযরসরব—তে শিক্ষালাভ করেন এবং পরবর্তী সময়ে প্যারিস—স্যাকলে ইউনিভার্সিটিতে অসমমিত অনুঘটন বিষয়ে গবেষণা করেন। তিনি বর্তমানে অধ্যাপক এমেরিটাস। হিরোশিমা অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী সোয়াই টোকিও ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট অর্জন করেন এবং টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে দীর্ঘ গবেষণাজীবন অতিবাহিত করেন। তিনিও অধ্যাপক এমেরিটাস। তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় হচ্ছে, অসমমিত জৈব সংশ্লেষণে অরৈখিক প্রভাব ও স্ব—অনুঘটন। অনেক অণুর দুটি প্রতিবিম্বসদৃশ গঠন থাকে, যেগুলোকে এনান্টিওমার বলা হয়। মানুষের বাঁ ও ডান হাতের মতো এদের একটির ওপর অন্যটি সম্পূর্ণভাবে মেলানো যায় না। এই ধর্মের নাম কাইরালিটি। জীবদেহ ও ওষুধ প্রস্তুতে কাইরালিটির গুরুত্ব অপরিসীম। একই রাসায়নিক সংকেতযুক্ত দুটি এনান্টিওমার ভিন্ন জৈবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

কাগান দেখান, কাইরাল অনুঘটকের সামান্য গঠনগত অসমতা কখনো বিক্রিয়ার উৎপন্ন পদার্থে অনেক বড় অসমতা সৃষ্টি করতে পারে। সোয়াই আবিষ্কার করেন অসমমিত স্ব—অনুঘটন, যেখানে উৎপন্ন অণু নিজেই একই গঠনের আরও অণু সৃষ্টিতে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে কীভাবে সামান্য আণবিক পক্ষপাত ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে। জীবজগতে নির্দিষ্ট আণবিক বিন্যাসের প্রাধান্য—হোমোকাইরালিটিÑবোঝার ক্ষেত্রেও গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি জীবনের আদি আণবিক অসমতার ঐতিহাসিক উৎস সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করেনি। আবিষ্কারটির প্রকৃত তাৎপর্য সেই রহস্য অনুসন্ধানে পরীক্ষালব্ধ একটি বিশ্বাসযোগ্য রাসায়নিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা।

সাহিত্য: অ্যান কার্সন ও ধ্রুপদি কল্পনার পুনর্জন্ম

৮ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যবিশারদ অ্যান কার্সন (জন্ম ১৯৫০)। টরন্টোয় জন্মগ্রহণকারী কার্সন টরন্টো ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮১ সালে ডক্টরেট অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে ধ্রুপদী সাহিত্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। তাঁর নোবেল পুরস্কারের ব্যপারে উল্লেখ করা হয় ‘ওহহড়াধঃরাব নড়ফু ড়ভ ৎিরঃরহম ঃযধঃ বহমধমবং ঢ়ষধুভঁষষু রিঃয ঃযব পষধংংরপধষ ঃৎধফরঃরড়হ যিরষব পৎবধঃরহম হবি ভড়ৎসং ভড়ৎ পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ষরঃবৎধঃঁৎব’, তাঁর সাহিত্য কবিতা, গদ্য, দর্শন, অনুবাদ ও সমালোচনার প্রচলিত সীমারেখা অতিক্রম করেছে। 

ঊৎড়ং ঃযব ইরঃঃবৎংবিবঃ গ্রন্থে তিনি প্রাচীন গ্রিক ভাবনায় প্রেম ও আকাক্সক্ষার স্বরূপ অনুসন্ধান করেছেন। অঁঃড়নরড়মৎধঢ়যু ড়ভ জবফ ধ্রুপদী পুরাণকে আধুনিক মানবিক আখ্যানে রূপান্তরিত করেছে। ঞযব ইবধঁঃু ড়ভ ঃযব ঐঁংনধহফ ভালোবাসা, ঘনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেছে। আর ঘড়ী স্মৃতি, শোক, অনুবাদ ও দৃশ্যগত উপাদানের সম্মিলনে গড়ে তুলেছে এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক নির্মাণ। কার্সনের কাছে প্রাচীন সাহিত্য কোনো নিশ্চল উত্তরাধিকার নয়; এটি বর্তমানের সঙ্গে অতীতের নিরন্তর সংলাপ। বিজ্ঞানী যেমন নতুন যন্ত্রে অদৃশ্য প্রকৃতিকে উন্মোচন করেন, কার্সন তেমনই নতুন সাহিত্যিক আঙ্গিকে ভাষার প্রচলিত সীমার বাইরে থাকা মানবিক অনুভূতিকে প্রকাশযোগ্য করে তোলেন।

২০২৬ সালে প্রতিটি নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য এক কোটি বিশ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা একাধিক বিজয়ীর ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়।

Related Posts