পরিত্রাণ || খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
সারাদিনের বিরামহীন খাটাখাটির পর শক্ত মেঝের বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রুথ। সেই কাকডাকা ভোরে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে শরীরটাকে ছেড়ে দেয় সংসার নামক যাঁতাকলের নিচে। সূর্য ওঠে। শুরু হয় তার প্রলম্বিত জীবনের বৃত্তে একঘেঁয়ে নিষ্পেষিত ছুটে চলা। উর্ধ্বশ্বাসে রান্নাঘরে ঢুকে ছাই কালি ঝুলিতে একাকার হয়ে পুরো পরিবারের নাস্তা তৈরির যজ্ঞ দিয়ে শুরু হয় তার দিনের ব্যস্ততার প্রথম পাট। ওদিকে নিজের তিনটি সন্তান তিন রকমের চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠছে। পিতৃহীন সন্তানদের কাছে ‘মা’ জিনিসটা বড়ই দামি। শাসনে আদরে ওদেরকে এমনভাবে আগলে রাখতে হয় যে, একটু এদিক ওদিক হলেই গেল!
তো রুথের জন্য সে সময়টা আর কোথায়? বাড়িতে শ্বশুর বাবা, শাশুড়ি মা, দেবর, নতুন জা’ ছাড়াও তার সন্তানদের আরও দু’টো বোন, একটা ভাই আছে। তারা পিতামাতাহীন। সেই পিতামাতাহীন তিনটা সন্তানকেও নিজের মত ক’রে আগলে রাখতে হচ্ছে। তারাও বেড়ে উঠছে তার আঁচলের নিচে মাতৃস্নেহের শীতল ছায়ায়। ভোর সকালে এই ছেলেমেয়েগুলোর পড়াশুনার একটু তদারকি করবে, রুথের হাতে সেই সময়টা কোথায়? পরিবারের বড়বউ বলে কথা। সবার জন্য নাস্তা তৈরি করে বৃদ্ধ শ্বশুর—শাশুড়ির দেখভাল করে ঠিক দশটার আগেই হাজির হতে হয় মিশন প্রাইমারি স্কুলে। ওখানে সারাটা দিন কাটে ছেলেমেয়েদের হইচই আর সহকর্মী শিক্ষক—শিক্ষিকাদের উষ্ণ সান্নিধ্যে। গ্রামে একটা প্রবাদ চালু আছে, ‘বাচ্চাদের পড়াশুনা করানোর চেয়ে চৈত্রের দুপুরে পাষাণ মাটিতে কোদাল মারার কাজ অনেক সহজ।’ কিন্তু রুথ শিক্ষিকা হিসেবে তার পেশাটাকে অনেক আনন্দময় মনে করে। বিদ্যালয়ের গণ্ডিটাকে নিজেরই একান্ত আপন পরিবার বলেই মনে হয় তার কাছে। সংসারের শত ঝামেলার মধ্যেও একদিন বিদ্যালয়ে না যাওয়া তার জন্য অনেক কষ্টের বিষয়। রুথের বেলায় এমনও হয়েছে, বাড়িতে তার অসুস্থ জলবসন্তে আক্রান্ত ছোট ছেলেটাকে মশারির নিচে শুইয়ে রেখে ছুটে এসেছে স্কুলে। সামনে যে বাচ্চাদের পরীক্ষা। আবার, নিজের গায়ে প্রচণ্ড জ্বর উপেক্ষা ক’রে শরীরময় টনটনে ব্যথা নিয়ে বিদ্যালয়ে এসে হাজির। প্রধান শিক্ষিকা সিস্টার মারীয়া তো দেখে অবাক!
—কী ব্যাপার দিদিমণি! আপনি এত অসুস্থ হয়েও এসেছেন? এভাবে নিজেকে অবহেলা করলে অকালে যে মারা যাবেন! যান যান বাড়ি যান। ওষুধ খান। বিশ্রাম নেন।
রুথ যেতে চায়নি।
—না সিস্টার। আমি তো প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছি।
—জানেন আপনার ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। বাড়িতে আপনার ছেলেও জলবসন্তে আক্রান্ত!
সিস্টার বললেন, ‘আপনার দেখাদেখি আমরাও সকলে এ জ্বরে আক্রান্ত হবো। তখন তো আমরা আপনার মতো কাজ করতে পারবো না। এছাড়া বাচ্চারাও একে একে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তখন পুরো স্কুলই বন্ধ করে দিতে হবে। যান। বাড়ি যান।’
এভাবেই রুথ তার পেশার মধ্যে সীমাহীন আনন্দ খুঁজে পেয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পরপরই সেই যে শোকার্ত আর ভেঙেপড়া সংসারের হাল ধরা, তার জীবনে শিক্ষকতার মহান দায়িত্বভার গ্রহণের প্রথম দিনটাই ত্যাগের মহিমায় বিভূষিত হয়ে আছে। দুটো পুত্র সন্তান হারানোর ব্যথা বুকে চেপে সেদিন ‘বাবা’ বলেছিলেন, মাগো! তুমি যদি শিক্ষকতা করতে চাও, এতে আমার কোনো অমত নেই। কারণ আমার মেঝ ছেলে জনের হাত ধরেই তুমি আমার এ সংসারে এসেছিলে। পেশায় সেও তো শিক্ষক ছিল। শিক্ষক হিসেবে সে যেমন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল, তেমনই সুনামও কুড়িয়েছিল প্রচুর। শিক্ষকদের সম্মানই আলাদা। দেখ, তোমার স্বামী, আমাদের আদরের জনের মত তোমার দেবর বিপিন— সেও বেছে নিয়েছে এই শিক্ষকতার পেশা। ভেবে দেখ মা। আজকে যারা তোমাদের শিক্ষার্থী ছাত্রছাত্রী, ভবিষ্যতে তারাই হবে সমাজের ও দেশের চালিকাশক্তি। হবে উঁচু মাপের মানুষ। তাদের সকলেই তোমাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তোমাদের প্রণাম জানাবে অবনত হয়ে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি পারবে মা। আমি আশীর্বাদ করি, অনেক অসাধ্যই তুমি সাধন করতে পারবে। তোমাকে পিতা পরমেশ্বর সেই তালন্ত বা প্রতিভাও দিয়েছেন।
সেদিন শ্বশুর বাবার পায়ে প্রণাম করে রুথ বলেছিল, ‘আপনার মহান আশীর্বাদ নিয়েই এই আমার পথচলা শুরু করলাম বাবা। আমি আর পিছু তাকাবো না!’ রুথকে পিছু তাকাতেও হয়নি। এ যাবত শিক্ষিকা হিসেবে অনেক সম্মাননা পেয়েছে সে। পেয়েছে অনেকের অকুন্ঠ শ্রদ্ধা।
তারপরও নিজের পরিবার বলে কথা। ‘বাবা মা’ বুড়ো হয়েছেন। ছেলেমেয়েরাও বড় হচ্ছে। ইতোমধ্যে সবার বড়মেয়ে মিনতিকে বিয়েও দিতে হয়েছে। (‘মিনতি’ শ্বশুর বাবার মৃত বড়ছেলে টুকুর বড়মেয়ে)।
ইদানীং বাবার শরীরটা খুবই খারাপ যাচ্ছে। তাছাড়া মাও প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ বছরের প্রথম দিকে তাঁর শরীরের বাম দিক অবশ হয়ে গেছে। বাবা—মায়ের উপযুক্ত সেবা—শুশ্রƒষার বিষয়টি রুথকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সত্যিকার অর্থেই রুথ তার শ্বশুরকে পেয়েছে একদিকে ‘বাবা’ আবার অন্যদিকে ‘বন্ধু’র মত। স্বামীর মৃত্যুর পর রুথ হয়ে পড়ে অসহায়। বাবাও হয়ে পড়েন দিশাহারা। শাশুড়ি—মাও ভেঙে পড়েছেন। তাই রুথ আপ্রাণ চেষ্টা করে পুরো পরিবারটাকে সযত্নে আগলে রেখেছে। এখন ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে। তখন আগের সেই ‘মেম্বারবাড়িটা’ জৌলুস ফিরে পাবে আবার!
কিছুদিন ধরে বাবা—মায়ের ঘরের মেঝেতে ঘুমায় রুথ। অতি সম্প্রতি বাবার দ্বিতীয় স্ট্রোকটা হয়ে গেছে। এরপর কখন কেমন হয়ে যান তিনি, সেই দুর্ভাবনায় পেয়ে বসেছে তাকে। তার ননদীরা এসে মাঝেমধ্যে মা—বাবার খোঁজখবর নিয়ে যায়।
ছেলেমেয়েদের ভাগাভাগি করে নিয়ে রুথ আর তার শাশুড়ি—মা ঘুমান। পালা করে ছেলেমেয়েরা তাদের মা ও ঠাকুরমার সাথে কখনো ঘরে আবার কখনো বাইরের বারান্দায় ঘুমায়। এতে সকলেই একধরনের আনন্দ ও পরিতৃপ্তি উপভোগ করে।
আজ রুথ ঘুমিয়েছে ভিতর ঘরের মেঝেতে। শ্বশুর—বাবা আছেন ওপাশে তাঁর খাটের ওপর। ইদানীং নিচু বালিশে তাঁর খুবই অসুবিধা ও কষ্ট হচ্ছে। তাই খাটের রেলিঙয়ে ঠেস দিয়ে কয়েকটা বালিশ উঁচু করে দেয়া হয়েছে, যেন বাবার অসুবিধা না হয়। মধ্যরাতে গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় রুথের। কান খাড়া করে তার উৎস অন্বেষণ করে সে। ওদিকে বারান্দায় শাশুড়ি—মা নাক ডাকছেন। আবার গোঙানির শব্দ। এবার বুঝতে পারে বাবা গোঙাচ্ছেন। তড়িঘড়ি করে উঠে লণ্ঠনের সলতেটা বাড়িয়ে দেয় সে। ‘বাবা! বাবা!’ ডাক দিয়ে চলে আসে বাবার খাটিয়ার কাছে। তাঁর কপালে হাত রাখে।
—বাবা! বাবা! কেমন লাগছে বাবা?
—মা! আমাকে ধরে একটু সোজা করে বসাও তো মা!
—এইতো বাবা। আমি আছি। কোন অসুবিধা হবে না আপনার।
ঠাকুরদার গোঙানি শুনে তৃপ্তি, জয়া, সুমন তারাও উঠে আসে। তারা মাকে সাহায্য করে, ঠাকুরদাদাকে ধরে ওঠাতে। রুথ ভাবছে বাবা স্বপ্নে কিছু দেখেছেন। তাই সদ্য স্বপ্নভাঙার ব্যাকুলতা নিয়ে এদিক ওদিক সকলের চোখ মুখের দিকে তাকান বাবা। লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে বুকটাকে হালকা করতে চান তিনি।
—আমি জানি মাগো। তুমি আছো আমার পাশে। তোমার আঁচলেই তো, আঁকড়ে ধরে আছো তুমি আমাদের সবাইকে।
—না বাবা! উপরে ঈশ্বর আছেন। তিনিই তো আমাদের লালন—পালন করছেন।
রুথের দু’চোখ পানিতে সিক্ত হয়ে ওঠে। শীর্ণ কম্পিত ডানহাত বাড়িয়ে দেন বাবা রুথের দিকে। রুথ বাবার হাতটি তার কপালে রাখে।
—মাগো! মা! আমি আর বাঁচবো না! আমার যে সময় হয়ে গেছে!
—বাবা! আপনি এ কথা বলবেন না বাবা!
ঠাকুরদাকে ঘিরে দাঁড়ানো ভাইবোন সকলের চোখ পানিতে ভরে ওঠে। ততক্ষণে বিপিন ও তার স্ত্রী আল্পনা চলে আসে।
—হ্যাঁ মা। মাগো আমার বুকে পিঠে একটু তেল মালিশ করে দাও তো মা।
রুথ দু’হাতে সরষেতেল নিয়ে বাবার বুকে পিঠে মালিশ করে। বিপিন এগিয়ে এসে বউদিকে সাহায্য করে।
—জানো মা! স্বপ্নে দেখেছি আমার স্বর্গীয় মা—বাবার সাথে আমাদের দুই ছেলে টুকু—জন পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে। তারা সবাই হাত বাড়িয়ে ডাকছে আমাকে! মাগো, আমি আর বাঁচবো না! আমার দিন যে শেষ হয়ে এসেছে!
—না, না বাবা! এ কথা বলবেন না! আপনাকে আরো অনেক দিন বাঁচতে হবে। আমি আপনাকে একটু দুধ গরম করে এনে দেই বাবা?
—একটু পানি দাও মা।
জয়া দৌড়ে গিয়ে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। রুথ বাবার মুখে পানি তুলে দেয়।
—মাগো। তোমরা কেউ কোনো কষ্ট নিও না মনে। কাল সকালেই গির্জার ফাদারকে ডেকে আনো। আমি পাপস্বীকার করে কমুনিয়ন আর অন্তিমলেপন নেবো। (খ্রীষ্টধর্ম মতে, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক খ্রীষ্টভক্তকে পুরোহিতের কাছে নিজের কৃত পাপ স্বীকার করে কম্যুনিয়ন বা খ্রীষ্টপ্রসাদ গ্রহণ করতে হয়। মৃত্যু—পথযাত্রী ব্যক্তির কপালে আশীর্বাদিত জলপাই—তেলের লেপন দেয়া হয়)।
—ঠিক আছে বাবা। আপনি এখন ঘুমাতে চেষ্টা করুন। এখন আপনার কি একটু ভালো লাগছে?
—মাগো। এটাই জগতের রীতি। চিরসত্য বিষয়।
—কী হয়েছে?
পক্ষাঘাতগ্রস্ত মাও ততক্ষণে বাইরের বারান্দা থেকে পা টেনে টেনে বাবার কাছে চলে আসেন।
— তুমি আবার কী কও?
বাবার মুখের ওপর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন মা।
—না। তোমারে কিছু বলি না। তুমি আরও পরে যাইবা।
—তুমি কী কও? আমি আবার কই যামু?
—আমি যেখানে যাইতেছি ...! তোমার জায়গা ঠিক করে আমি ডাকবো তোমাকে।
—কী কইতাছো তুমি? আমি তো বুঝি কম।
—বুঝবা। সময় হলেই সব বুঝবা!
—বাবা। এবার আপনি শান্ত হয়ে ঘুমাতে চেষ্টা করুন। আমি আপনার বুকে পিঠে তেল মালিশ করছি।
রুথ তার বিবাহিত জীবনে মাত্র ছয়টা বছর স্বামী জনকে কাছে পেয়েছে। তার উপস্থিতিতে সংসার করেছে। তাও অসুস্থ অবস্থায় কেটেছে তার স্বামীর অধিকাংশ সময়। স্বামীর অকাল মৃত্যুর পর রুথের শ্বশুর পরম পিতৃস্নেহে আগলে রেখেছেন রুথকে এবং তার তিন সন্তানকে। সাথে ভাসুরের ও জায়ের রেখে যাওয়া তিন সন্তানদের। তা না হলে এতটুকু বয়সে বিধবা হয়ে সংসারধর্ম পালন করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না হয়তোবা। রুথের শ্বশুর সত্যিকার অর্থেই ‘বাবা’ হয়েই আদর করেছেন। প্রয়োজনে শাসনও করেছেন আবার। বাবা বলতেন, ‘আমাদের জীবনকাল হচ্ছে খুবই ছোট। কিন্তু কাজ অনেক। দায়িত্বও প্রচুর। ঈশ্বর চান আমাদের স্বল্পায়ুর এ জীবনে তাঁর দেয়া কাজগুলো যেন গুছিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যেতে পারি।’
বাবা টানা পনেরটি বছর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মেম্বার ছিলেন। তিনি বলেছেন, তখন আমাদের চেয়ারম্যান—মেম্বারদের সম্মান আর প্রতাপই ছিল অন্য রকমের। আর আমরাও তখন জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছি মানুষের সেবা করতে। তাই কেউ কোনো দুর্নামও রটাতে পারেনি। এখন সেই দিন আর নেই!
নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমার বড় ছেলে টুকু তার তিনটা ছেলেমেয়ে রেখে দুর্ঘটনায় মারা যায়। তারপর চার বছরের মাথায় বড় বউমাও গত হয় হার্টএ্যাটাক করে। ফুটবলপাগল মেঝ জন। কী বুদ্ধিমান ছেলেটা আমার! সে স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি ফুটবল খেলাকে চরম আনন্দের বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিল। খেলতে গিয়ে একবার সে ডান পায়ে ব্যথা পায়। আর সেই ব্যথাই হল তার জীবনের কাল। ব্যথা কোনো ক্রমেই সারে না। অবশেষে ডাক্তার বললেন, পা কেটে ফেলতে হবে। তুমিও জানো মা, আমার সুদর্শন মেঝছেলেটা যেমন ছিল সাহসী, তেমনই ছিল ধৈর্যশীল! পা কাটার সিদ্ধান্তটা সেই দিল। আর আমাদের তা মেনে নিতে বাধ্য করলো। পা তার কাটা হল! তারপর তার জন্যে শুরু হল পায়ের কাটা অংশে নকল পা জুড়ে ক্রাচে ভর দিয়ে চলা! এতকিছুর পরও সে কিন্তু দমে যায়নি। একদিকে শিক্ষকতা আর অন্যদিকে সংসারের তদারকি করা। আমরা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেই। প্রথমে সে মানতে চায়নি। তারপর রাজি হল। এ অবস্থায় তার সবকিছু জেনে শুনেই ওর হাত ধরে আমার পরিবারে এলে তুমি। বিয়ের আগে তোমার মা—বাবার ঘরে তুমি সচ্ছলতা দেখনি। আর বিয়ের পর আমার ঘরে এসে অল্পদিনেই হলে বিধবা! আমার বড়—ছেলের তিনটি আর মেঝ—ছেলের তিনটি মোট ছয়টি সন্তানের মা হলে এই তুমি! আর তার সাথে তুমি তো আমাদেরও অর্থাৎ এই বুড়োবুড়িরও লক্ষ¥ী মা হলে! এক আঁচলে আগলে ধরে রেখেছ আমাদের সবাইকে! সত্যি মা, তোমার মতো মা পাওয়া পরম ভাগ্য! আমরা তোমাকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করি মা! তুমি সুখী হও মা! জানি না কেন এমন হল! পিতা হয়ে কেন পর পর দুটো ছেলের লাশ নিজের কাঁধে বয়ে নিয়ে নিজেরই হাতে কবর দিয়ে হয়েছে এই আমাকে! আর তোমার শাশুড়ি মায়ের বুক হল খালি! আমাদের স্বল্প জ্ঞানে আমরা বুঝি না, এতে ঈশ্বরের কী পরিকল্পনা রয়েছে।’
রুথ তার কর্মজীবনে প্রবেশ করার সময় অনেক চিন্তা—ভাবনা করেই শিক্ষকতা পেশাকে ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছে। শৈশবে তার প্রিয় শিক্ষক—শিক্ষিকাদের জীবনযাপন তাকে আকর্ষণ করতো। সিস্টার এ্যান, সিস্টার রোজলিন, সিস্টার ম্যাগ্ডেলিন। এদিকে বেনেডিক্টা দিদি, আগ্নেশ দিদি, মরণী দিদি, সুরুপি দিদি। তাঁদের সকলেই যেন হাতছানি দিয়ে ডেকেছেন তাকে, ‘এসো রুথ! এসো আমাদের কাতারে। এখনই যে তোমার উপযুক্ত সময়!’
কেউই বিবাহিতজীবনে প্রবেশ করেননি তাঁরা। একমাত্র শিক্ষকতাই ছিল তাঁদের সার্বক্ষণিক ধ্যান ও সাধনা। তাঁদের জীবনের প্রায় পুরো ভাগই তাঁরা ব্যয় করেছেন কোমলমতি ছেলেমেয়েদের পিছনে। তাঁরাই রুথের জীবনে আলোঘর ও আদর্শ হয়ে আছেন। তাঁরাই তাকে পথ দেখাচ্ছেন। তার সামনে তাঁরা এখন বিরাজ করছেন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো।
সকালবেলায় গির্জা থেকে ফাদার এলিয়াসকে ডেকে আনা হলো। রুথের শ্বশুরের পাপস্বীকার শুনে কম্যুনিয়ন ও অন্তিমলেপন দিলেন ফাদার।
ফাদার এলিয়াস চলে যাবার পরপরই রুথের শ্বশুর অচেতন হয়ে পড়েন। সুমন দৌড়ে গিয়ে স্থানীয় পল্লীচিকিৎসক রবিন ডাক্তারকে নিয়ে আসে। তিনি রোগীকে ইনজেকশন দিয়ে বললেন, আজ আর কিছু নয়। আগামীকাল দেখা যাবে।
দুপুরের দিকে রোগী নড়েচড়ে উঠলেন। চোখ মেলে এদিক ওদিক তাকালেন। অস্পষ্ট স্বরে
—মা! আমার মা কোথায়? বিপিন! তোমরা সবাই কোথায়?
—এই যে বাবা আমি! আমরা সবাই আছি আপনার পাশে।
—রুথ। আমার মা। তোমাকে আমি কত জ্বালাতন করেছি মা। আমার মেয়েদের আসতে খবর পাঠাও মা।
—না বাবা! জ্বালাতন কেন? ও কথা বলবেন না বাবা। আপনাকে সেবা করা যে আমার বড় সৌভাগ্যের বিষয়। আমি এখনই লোক পাঠাচ্ছি। তো, এখন একটু ভালো লাগছে কি বাবা?
—মাগো। দেখ আমার দু’টো ছেলে টুকু—জন চলে গেছে সেই কবে, আমার আগেই! এখন আমার ছোট ছেলে বিপিনকে রেখে যাচ্ছি তোমার কাছে।
—বাবা। আজ আর এসব বিষয় নয়। এখন আপনি শান্ত হন। সবই ঈশ্বরের পরিকল্পনা বাবা!
—হ্যাঁ মা! সবই তাঁর ইচ্ছা!
বাবার দু’চোখ বেয়ে পানির ধারা নামে।
—বাবা আপনাকে একটু আধাগরম দুধ দেই? আপনার প্রিয় গরুর দুধ?
নিজের আঁচলে বাবার দু’চোখ মুছিয়ে দেয় রুথ।
—দাও মা।
জয়া বলল, ‘মা আমি এক দৌড়ে দুধ গরম করে নিয়ে আসি দাদুর জন্য।’
রুথ বলল, ‘থাক মা। তুমি তোমার দাদুর কাছে বস। আমি নিজেই দুধ গরম করে নিয়ে আসছি।’
রান্নাঘরে ঢুকে চুলো জ্বালিয়ে দুধ গরম করে রুথ। জয়া মাকে সাহায্য করে।
—বাবা আপনি হাঁ করুন।
শ্বশুরের মুখে দুধ ঢেলে দেয় রুথ।
—খেয়েছি মা। একটু পানি দাও। আর তোমার মাকে ডাকো।
রুথের মনে হল, বাবা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন এ যাত্রায়। বিপিন তার মাকে ধরে বাবার বিছানার কাছে এনে পাশের চেয়ারে বসায়।
—আমার পাশে বস আগাথা!
ডানহাত বাড়িয়ে দেন বাবা। এ দৃশ্য দেখে রুথ বিপিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রুথের দু’চোখের কোণে আনন্দের অশ্রু চিক্ চিক্ করে ওঠে। সে মনে মনে বলে, ‘হে ঈশ্বর, তোমাকে জানাই অনেক ধন্যবাদ! হে স্বর্গীয় ঈশ্বর! তোমার এ সন্তানকে সমর্পণ করি তোমারই হাতে!’
—শোন আগাথা। আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাকে।
—কী কও? কষ্ট? হু। দিয়েছ তো! খালি কি কষ্ট?
রুথ বিপিন সহ সকলেই হেসে ওঠে।
—কমলা। তুমি আমার সুখ—দুঃখের সাথী ছিলে। টুকু আর জন দুটো ছেলে তারা আমার আগেই চলে গেছে! সে কষ্ট বুকে চেপে এতকাল ...!
শ্বশুর—বাবার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
—থাক বাবা ওসব।
রুথ তার শাড়ির আঁচল দিয়ে বাবার চোখের পানি মুছে দেয়। তারও দু’চোখ ভিজে ওঠে। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলে, ‘সবই ঈশ্বরের পরিকল্পনা!’
—হ্যাঁ মা! সবই তাঁর পরিকল্পনা! আজ টুকু—জনকে দেখলাম। সাথে আমার মা—বাবা। তাদের সকলের গায়ে নতুন ঝকঝকে জামাকাপড়! তারা হাসছে! হাত বাড়িয়ে আমাকে ডেকে বলছে, ‘তুমি আসো! আমরা তোমার জায়গা তৈরি করে রেখেছি!’ জানো মা, আমার জন্য ‘মহাপরিত্রাণ’ অপেক্ষা করছে। আমি এই জগত—সংসারের সুখ—দুঃখের কারাবাস থেকে পরিত্রাণ চাই। এ জন্য আমি মনে—প্রাণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনাও করছি। নিশ্চয় তিনি আমার প্রার্থনা শুনবেন।
বিপিন এবার তার কান্না আর থামিয়ে রাখতে পারে না। সে কাতর হয়ে বলে, ‘না বাবা! তুমি আমাদের ছেড়ে চলে যেয়ো না!’
—না বাবা! আমাকে যে যেতেই হবে। সময় ঘনিয়ে এসেছে। শুনো কমলা। আমি আগে যাই। তারপর তুমি..!
—আমারে একলা ফালাইয়া তুমি কই যাইবা? যাও। কবে যাইবা? আমি কোনদিন যামু না!
—মাগো! ছোট মা, আল্পনা! তোমাদের মাকে, তোমাদের সকলের হাতে রেখে যাচ্ছি!
‘বাবা! বাবা!’ বলে সকলে কেঁদে ওঠে। ঘড়ির দিকে আঙ্গুল তুলে বাবা বলেন, ‘আজ সন্ধ্যা ছয়টায় আমি চ’লে যাচ্ছি। এখন আমি পুরোপুরি তৈরি। কোথায় আমার মেয়েরা?’ রুথ—বিপিন—আল্পনা তাকিয়ে দেখে, দেয়ালে সাঁটা দেয়াল ঘড়িটার ক্ষণগণনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ধুপধুপ আওয়াজ তুলে। তারা একে অন্যের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করে। হতাশার ছায়া সবাইকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।
—বাবা! আপনি এসব কী বলছেন?
রুথ আর্তনাদ করে ওঠে।
—মা! কেঁদে আর লাভ কী বল? আনন্দ কর। দুঃখ করো না আমার জন্য। আমি যাচ্ছি। তোমার শাশুড়ি—মা যাবে। তুমি যাবে। বিপিন যাবে। তারপর একে একে পরিবারের সবাই যাবে। এটাই তো সত্য।
—বাবা! আপনি আমাকে, আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন। আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিন। আপনার দু’হাত তুলে আমাদের আশীর্বাদ করুন বাবা!
—তোমাদের সবাইকে আশীর্বাদ করি।
ততক্ষণে রুথের ননদীরা, তাদের স্বামী—সন্তানসহ চলে আসে।
—আমি তোমাদের সবাইকে আশীর্বাদ করলাম।
বুকে রাখা ডানহাত উপরের দিকে উঁচু করে সবাইকে আশীর্বাদ করলেন রুথের শ্বশুর—বাবা। তিনি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলেন, ‘এখন আমি একটু বসবো। মা তোমরা এসেছ?’ মেয়েরা এগিয়ে যায় বাবার কাছে। তারা বাবাকে ধরে বসাতে সাহায্য করে। রুথ শ্বশুরের মাথা সোজা করে ধরে।
—মনে হয় আমি নিজেই পারবো।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে রোগী তাঁর দু’হাতে ভর রেখে মেরুদন্ড সোজা করে বসেন।
—মাগো! বাবা বিপিন! আমার একটা অনুরোধ। তোমাদের রাখতেই হবে।
—বল বাবা!
বিপিন বাবার কপালে হাত রাখে।
—এ গ্রামের যুবক—যুবতী সবাইকে ডাকো আমার বাড়িতে। তারা আজ কীর্তন করবে এখানে। আর আগামীকাল কীর্তন করে আমাকে গির্জায়, তারপর কবরস্থানে নিয়ে যাবে। এটা আমার শেষ ইচ্ছা!
ততক্ষণে গ্রামের লোকজন রুথের বাড়িতে এসে ভিড় করতে শুরু করেছে। বিপিন ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে গিয়ে দাঁড়ায়।
—আপনারা শুনুন! আমার বাবার শেষ ইচ্ছা, এখন আমাদের বাড়িতে কীর্তন হবে। আমরা সকলে মিলে একই সাথে ঈশ্বরের প্রশংসা করবো। আপনারা সেই ব্যবস্থা করুন দয়া করে!
—মাগো! আমি আর পারছি না। আমি একটু ঘুমাব।
রুথ বাবাকে আগে মতো শুইয়ে দেয়। ইত্যবসরে গির্জা থেকে ফাদার এলিয়াস এসে উপস্থিত হন।
—তোমাদের সকলের শান্তি হোক! এই পরিবারে ঈশ্বরের আত্মা নেমে আসুন। তাঁর পরিত্রাণের আশিস বর্ষিত হোক।
ফাদারের শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখায়বে প্রশান্তির আলো ঝলসে ওঠে। ভিড় ঠেলে তিনি রুথের শ্বশুরের পাশে এসে দাঁড়ান। ব্যাগ থেকে পবিত্রপানির পাত্র বের করে উপস্থিত সকলের ওপর ছিটিয়ে দেন। তারপর রুথের শ্বশুরকে আশীর্বাদ করেন।
—লুকাস সাহেব আমার খুবই কাছের বন্ধু। এই ধর্মপল্লীতে এসে আমি পেয়েছিলাম তাঁকে একাধারে বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং ঈশ্বরসেবক রূপে। আজ এ মুহূর্তে আমরা সকলে মিলে তাঁকে স্বর্গীয় পিতা ঈশ্বরের হাতে সমর্পণ করি। একই সাথে এই পরিবারের সবাইকেও আমি যীশুখ্রীষ্টের মাধ্যমে পিতার হাতে রাখি। তিনি সকলের জীবনের মধ্য দিয়ে তাঁর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করুন!
ততক্ষণে বাড়ির বাইরে কীর্তন শুরু হয়ে গেছে। রুথের শ্বশুরের ঊর্ধ্বশ্বাস শুরু হয়ে গেছে। রবিন ডাক্তার ছুটে এলেন। তিনি রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করলেন।
ফাদার রোগীর কানের কাছে মুখ রেখে বললেন, ‘বলুন পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মার জয় হোক!’
রোগীর ঠোঁট নড়ে উঠলো। তাঁর কন্ঠ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল, ‘পিতা পুত্র ও পবিত্র আত্মার জয় হোক!’
—বলুন। ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা কর!
—ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা কর!
—ঈশ্বর আমাকে তোমার হাতে রাখি।
—ঈশ্বর আমাকে তোমার ...!
—বলেন, ঈশ্বর তোমাকে ধন্যবাদ।
—ঈশ্বর ...!
—বলেন। বলেন ...!
রুথের শ্বশুর—বাবা লুকাস মেম্বারের ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠছে। শত চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারছেন না তিনি।
এ সময় বাইরে হারমোনিয়াম—খোল—ঢোল—করতালের মিশ্রণে যুবক যুবতীদের স্বতঃস্ফূর্ত কীর্তনের মূর্ছনা এক অপূর্ব পবিত্র দ্যোতনা সৃষ্টি করে।
রুথ তার শাশুড়ি—মাকে টেনে শ্বশুর—বাবার আরও কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে সাহায্য করে। শাশুড়ি—মায়ের শীর্ণ দুর্বল হাতে বাবার কপালে হাত বুলাতে সাহায্য করে। তার দু’চোখ থেকে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। শাশুড়ি—মা তার এবার বুঝতে পারছেন, তাঁর প্রিয় মানুষটি চিরতরেই চলে যাচ্ছেন, তাঁকে একা ফেলে! বিপিন বার বার চোখ মোছে।
ফাদার তখন উচ্চসুরে পবিত্র বাইবেল থেকে সামসংগীতের পদ পড়ে যাচ্ছেন। ততক্ষণে অগণিত মোমবাতির প্রজ্বলিত শিখা জ্বলে উঠেছে সকলের চোখ মুখ আলো করে। গন্ধরাজ, জবা, কাঁঠালিচাঁপা ... অনেক ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়লো সারা ঘরময়। ধর্মপল্লীর সিস্টাররা, রুথের বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকা, সহকর্মী সহ আরও অনেকেই এসে সমবেত হয়েছেন। তাঁরা ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রার্থনা করছেন।
রুথের দৃষ্টি চলে যায় দেয়াল ঘড়িটার দিকে। সেকেন্ডের কাঁটা দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই। তার নিরন্তর চেষ্টা মিনিটের কাঁটাকে বারোর কাছে নিয়ে যেতে। মিনিটের কাঁটাও তাই থেমে নেই। সেও ঘণ্টার কাঁটাকে ছয়ের কাছে টেনে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে!
বাইরে কীর্তন। ভিতরে ফাদারের কণ্ঠে সামসঙ্গীতের প্রবচনমালা। উপস্থিত সকলে সিস্টারদের সাথে জপমালা আবৃত্তি করে চলেছেন। এরই মধ্যে রবিন ডাক্তার এসে রোগীর পাশে দাঁড়ান।
রুথ আবার তাকায় ঘড়ির দিকে। বুকে দু’হাত রেখে সে উপরের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘হায় ঈশ্বর! আর মাত্র মিনিট পাঁচ বাকি..! চার..! তিন..! দুই..! এক..!
—বা—বা! বা—বা!
আর্তচিৎকার করে শ্বশুরের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে রুথ।
—বাবা! এ কী করলেন বাবা! আপনি আমাদের সবাইকে রেখে চলে গেলেন বাবা! আমি যে এতিম হয়ে গেলাম বাবা!
ডাক্তার রোগীর নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তাঁর দু’চোখ মেলে দেখলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘তিনি চলে গেছেন..!’
চোখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকায় রুথ। ঠিক ছয়ের ওপর ঘণ্টার কাঁটা। আর বারোর ওপর মিনিটের এবং সেকেন্ডের কাঁটা এসে স্থির হয়ে আছে। ঘড়ির সেই ধুপ ধুপ শব্দও আর নেই! ‘বা—বা’ চিৎকার করে রুথ ঢলে পড়ে তার শ্বশুর—বাবার প্রাণহীন দেহের ওপর। উপস্থিত সকলের উচ্চকিত কান্নার রোল ঘরের বাতাস ভারী করে তোলে।
‘আপনারা শিগগির বউমার মাথায় পানি ঢালুন আর তাঁর মুখে চামচ দিন। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন!’ ডাক্তারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্কুলের সহকর্মী সিস্টার, শিক্ষিকা সকলে ব্যতিব্যস্ত হয়ে রুথের মাথায় পানি ঢালার ব্যবস্থা করেন। সবকিছু ছাপিয়ে ফাদার এলিয়াসের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়,
—তোমরা ঈশ্বর সদাপ্রভুর প্রশংসা কর! তাঁর উদ্দেশে নতুন গীত গাও ...!
উঠানে তখন যুবক যুবতীদের কণ্ঠে কীর্তনের ধ্বনি নবতর মাত্রা পায়,
‘পরিত্রাণ! পরিত্রাণ! মহাপরিত্রাণ!
ঈশ্বর তুমি করিলে দান।
ধন্যবাদ প্রশংসা করি হে মহান।
পরমপিতা তোমার গাই জয়গান।
পরিত্রাণ। পরিত্রাণ। মহাপরিত্রাণ!’
লুকাস মেম্বারের মৃত্যু—সংবাদ শুনে পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন ছুটে আসে তাঁর বাড়িতে। বাইরে উপস্থিত মানুষের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। সমবেত কান্নার রোল কীর্তনের ধ্বনি ছাপিয়ে, অনেক দূরে প্রসারিত হয়। ততক্ষণে অস্তগামী সূর্যটা শেষ আলো ছড়িয়ে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে। ইতোমধ্যে রুথের বাড়ির অন্দর—উঠান হ্যাজাকের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে।
