বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন: বাংলাদেশে ৬ কোটি মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ ‘আর পারা যাচ্ছে না। বাজারে শাক—সবজি থেকে শুরু করে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাসভাড়া, ঘরভাড়াÑ সবকিছু যেভাবে বাড়ছে, তাতে খেয়ে—পরে বেঁচে থাকাই দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যমসারির কর্মকর্তা আতিকুর রহমান। ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা মি. রহমান বলছিলেন যে, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার খরচ যেভাবে বেড়েছে, সেটার বিপরীতে সামান্যই আয় বেড়েছে তার। ফলে সংসার চালাতে গিয়ে এখন রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।
‘সবকিছুর খরচ এত বেড়েছে যে বেতনের টাকা দিয়ে মাস পার হচ্ছে না। আগের কিছু সঞ্চয় ছিল, সেটাও এখন প্রায় শেষের দিকে। এভাবে যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংসার কীভাবে চালাবো, ছেলে—মেয়ের পড়াশোনার খবর কীভাবে দেবো, সেটাই ভেবে কূল—কিনারা পাচ্ছি না,’ বলেন মি. রহমান।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গত মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত চার বছরে দেশটিতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। এর মধ্যে গত এক বছরেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
আরও প্রায় ছয় কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশী, যারা এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে অবস্থান করছেন, তারাও দরিদ্র শ্রেণিতে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
এমন পরিস্থিতির তৈরি হওয়ার জন্য মোটাদাগে যেসব কারণের কথা জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক, তার মধ্যে ছয়টি বিষয় উঠে এসেছেÑ কোভিড মহামারি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি পদ্ধতিতে দুর্বলতা।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে বিপুল সংখ্যক এসব মানুষকে সুরক্ষা দিতে না পারলে বাংলাদেশ যে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে, দুর্বল অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সেটি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বছর ছয়েক আগেও বাংলাদেশকে যেখানে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘বিশ্বের মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেখানে আবারও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল কীভাবে?
দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন কত?
সাড়ে পাঁচ দশক আগে বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন অর্থনীতির অবস্থা ছিল একেবারেই দুর্বল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির বেশিরভাগ মানুষ তখন ছিল দরিদ্র।
পরবর্তীতে সরকারি—বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে ক্রমেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে থাকে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশে দারিদে্র্যর হার যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ ছিল, পাঁচ দশকের মধ্যে সেটি উল্লেখযোগ্য হারে কমে ২০ দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসে।
২০২০ সালে বাংলাদেশকে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘বিশ্বের মডেল’ ঘোষণা করেছিল বিশ্বব্যাংক।
এর দুই বছরের মাথায় দারিদে্র্যর হার আরও কমে ১৮ দশমিক সাত শতাংশে দাঁড়ায় বলে বিবিএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তখন অতি দারিদে্র্যর হার কমে হয়েছিল পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ।
দারিদ্র্য বিমোচনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশটি পুরোপুরিভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হবে বলে তখন পূর্বাভাস দিয়েছিলেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তারা।
কিন্তু বছর না ঘুরতেই পাল্টে যেতে থাকে পরিস্থিতি।
করোনা মহামারির সময় অফিস—আদালত, শিল্প—কারখানাসহ বিভিন্ন কাজ—কর্মে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল, ক্রমেই সেটির প্রভাব দৃশ্যমান হতে থাকে অর্থনীতিতে।
বিবিএসের হিসেবে, ২০২১—২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ছিল সাত দশমিক এক শতাংশ। ২০২৩—২৪ অর্থবছরে সেটি কমে চার দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে।
চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে তিন দশমিক চার শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
এ অবস্থায় বাংলাদেশে আবারও বাড়তে দেখা যাচ্ছে দারিদে্র্যর হার।
২০২২ সালে দেশটিতে অতি দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ, ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে ১০ দশমিক এক শতাংশ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সেইসঙ্গে, মোট দারিদে্র্যর হারও আগের চেয়ে বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক পাঁচ শতাংশে পৌঁছেছে বলে সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেই হিসেবে, বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন তিন কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে অনুমান করছে সংস্থাটি।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।
‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শিরোনামে গত মঙ্গলবার সংস্থাটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে বলা হয়েছে যে, দেশটির অর্থনীতিতে এখনো প্রবৃদ্ধি কমার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এর একটা বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়।
মূলত করোনা মহামারির কারণে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার একপর্যায়ে দেশটির অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। যেসব প্রতিষ্ঠান তখন টিকে ছিল, তারাও অর্থনৈতিক চাপের মুখে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটে।
‘এতে বহু মানুষ বেকার হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে অনেকেই পরে আর ফরমাল সেক্টরে ফিরে আসতে পারেননি, অর্থাৎ কাজ খুঁজে পাননি বলে জানা যাচ্ছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন।
করোনাকালে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছিল যে, পরবর্তীতে নতুন বিনিয়োগ আসলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছাবে।
কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘটেনি।
‘উল্টো দেখা গেছে, লাগাতার অনিয়ম—দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচারের মতো ঘটনার কারণে ব্যাংকিংখাতসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাত ভেঙে পড়েছে,’ বলেন মিস খাতুন।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।
এরপর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ নাজুক হয়ে পড়ে। সেটার কারণেও দেশি—বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেভাবে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি না বলে জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। সেইসঙ্গে, বেড়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট।
এতে শিল্প—কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
