অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও অন্যান্য
মৃত বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের এক শ্রেণীর মানুষের ভয় পাওয়ার কারণ এখন আর অস্পষ্ট নয়। বঙ্গবন্ধু যে কত বড় মাপের মানুষ তা বঙ্গবন্ধু—প্রেমিকরা যতটা প্রমাণ করেছে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের ও স্বাধীনতার শত্রুরা। ২০২৪ সাল এবং এর পরবতীর্ সময় তার চূড়ান্ত প্রমাণ। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁকে তো বটেই তাঁর লাশকে যেভাবে অসম্মান করা হয়েছে তা ভাবলেও অবাক লাগে। সেটা ছিল বাংলাভাষী তথাকথিত রাজনীতিকদের ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানপন্থী মিলিটারি সদস্যদের চরম আহাম্মকী দুঃসাহস। সে সময় অনেকের ন্যারেটিভ ছিল ‘কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে’। এই কথা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। আজো নেই। যাদের ষড়যন্ত্রে এবং যারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল, তারা শেখ মুজিবের বংশ নিমূর্ল করতে চেয়েছিল। যাতে এই বংশের কোনো সদস্য বংলাদেশে ক্ষমতায় ফিরে আসতে না পারে। কিন্তু বিদেশে থাকার কারণে এই পরিবারের দুই সদস্য বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বেঁচে থাকায় সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।
এখন স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠবে, কেন তাঁর বংশ নিমূর্ল করতে চেয়েছিল? এতদিন পরে তা আরো স্পষ্টতর। এরা বাংলাদেশকে চায়নি। এরা সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশটি যখন অত্যন্ত দ্রুত বিশ্বে নিজের নামটি সাফল্যের সাথে খোদাই করে যাচ্ছিল, তখন দ্রুততম সময়ে ১৫ আগস্ট সেই নির্মম হত্যাকান্ডটি ঘটিয়ে প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ সমার্থক। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই রেডিও প্রচারভবন দখল করে জয় বাংলা শ্লোগান বাতিল করে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শ্লোগান উচ্চারণ তাদের মনোভাবের প্রথম প্রমাণ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ করে রাখা হয় ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এই তথ্য শুনে নতুন প্রজন্মের অনেক মেধাবী বিবেকসম্পন্ন ছেলেমেয়ে বাকরুদ্ধ হবে যে যারা বই লিখে নিজেদের স্বঘোষিত হত্যাকারী দাবি করে তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে সম্মানজনক কূটনৈতিক দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই সাথে সংবিধানে এইসব হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না বলে সংশোধনী আনা হয়।
বঙ্গবন্ধুর শক্তি বঙ্গবন্ধুর বিরোধীরাই প্রমাণ করেছে।
বঙ্গবন্ধু শারীরিক উপস্থিতি সেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকেই নেই। তাঁর ছবি নেই কোনো সরকারী ভবনের দেয়ালে। তার নাম নেই, প্রসঙ্গ নেই তৎকালীন দুটি বৃহত্তম গণমাধ্যম রেডিও ও টিভিতে। বাংলাদেশ বেতার হয় যায় রেডিও বাংলাদেশ (রেডিও পাকিস্তানের অনুকরণে), বাংলাদেশ টেলিভিশন হয়ে যায় বিটিভি। অথচ কবিরা লিখে গেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসাধারণ সব কবিতা। কেউ তাদের ওপর চাপ দেয়নি, কেউ নির্দেশ দেয়নি। অথচ তারা ১৫ আগস্ট নিয়ে কবিতা লিখেছেন। বাংলাদেশে কোনো রাজনীতিককে নিয়ে এত কবিতা আর কখনো লেখা হয়নি। এদিকে অন্নদাশংকর রায়ের সেই চার পংক্তি বঙ্গবন্ধুকে পদ্মা—মেঘনা—যমুনা—গৌরি নদীর সমান আয়ুষ্কাল দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করা অথবা নাকচ করা আর বাংলাদেশকে নাকচ করা একই কথা। একথা বঙ্গবন্ধু প্রেমিকদের চেয়ে তার শত্রুরা বেশি জানে। এবং সে কারণে তারা সন্ত্রস্ত। ২০২৪ সালকে তারা নানাভাবেই কলংকিত করেছে। এরা কীভাবে ভাবল যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর উঠে অসম্মান করে, তার ভাস্কর্য ধ্বংস করলে তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া যাবে? আজ যখন তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মত একটি অতি মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় গ্রন্থের মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিক্রি নিষিদ্ধ করার মত কূপমণ্ডূকতা লক্ষ্য করা গেল, তখন বোঝা গেল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভীতি তাদের হৃদয়ে কতটা সুদূরপ্রসারী। বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসা, হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান জায়গায় স্থান দেয়া বাঙালির ব্যক্তিগত অধিকার। কেউ যদি তাকে পছন্দ না করে (পছন্দ করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই), তাতেও তার কোনো অপরাধ নেই, যেমন অপরাধ নেই এই মহান ব্যক্তিকে ভালোবাসলেও। কিন্তু অন্যের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে যারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারা মানুষের বাক—স্বাধীনতার শত্রু।
নিশ্চয় কিছু ইতিহাস অসচেতন অপরিণামদশীর্ অর্বাচিন এসব করেছে বা করছে বাংলাদেশে। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল এবং সরকার এইসব কর্মকান্ডকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙার জন্য যখন মব সৃষ্টি করা হলো, সেই মবকে প্রশ্রয় দিয়েছে অন্তর্বতীর্ সরকার। আজ পর্যন্ত এই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। বিচারের আওতায় আনা হয়নি, ৭ বীরশ্রেষ্ঠর ভাস্কর্য, ৫২’র শহীদদের টেরাকোটা শিল্পকর্ম, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙাসহ মুজিব নগরেরর স্কাল্পচার গার্ডেন তছনছের হোতাদের।
অনেকের স্মরণ থাকতে পারে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কামান দেগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। সেই শহীদ মিনার আরো সুন্দরভাবে পুনর্নির্মিত হয়েছে। তারও আগে ১৯৫২ সালের একুশ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর প্রাণ দিলে তাদের স্মরণে আজকের শহীদ মিনারের জায়গায় ছাত্ররা প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করে এর দুইদিন পরে ২৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু পাকিস্তান পুলিশ সেই শহীদ মিনার গুড়িয়ে দেয়। উদ্বোধনের দিনই পুলিশ এবং মিলিটারি এই শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। ভেঙে ফেলা মানেই নিশ্চিহ্ন করা নয়, সে কথা প্রমাণ করেছে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। আর তখনই একটি কবিতা লেখেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। কবিতার কয়েকটি পংক্তি আজ আপ্তবাক্যঃ স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো/ চার কোটি পরিবার/ খাড়া রয়েছি তো!
যারা এই রকম বাক স্বাধীনতা রুদ্ধ করার, মানুষের পছন্দ—অপছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করার এবং দেশের স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করার মত ব্যর্থ চেষ্টা চালায় তারা ইতিহাস পড়ে না, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। তারা বোঝেই না কোনো কোনো মানুষ আর মানুষ থাকে না, কোনো কোনো স্মৃতিচিহ্ন বা স্মৃতিস্তম্ভ বা ভবন আর বস্তু থাকে না। তা কোটি কোটি মানুষের স্মৃতিতে ও বোধে পরিণত হয়। অতএব এই ধরনের মানুষকে বা স্মৃতিস্তম্ভ বা ভবনকে যারা ধ্বংস করে তারা ইতিহাসের পাতায় কলংকিত চরিত্র হয়ে যায়।
