ভোটাধিকার নিয়ে উত্তপ্ত ভারত
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে দেশটির জেন—জি ও বিরোধী দলগুলো আওয়াজ তুলেছে ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’। দেশটির সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে এরকম আন্দোলনের নজির নেই।
বুধবার ৭ অক্টোবর দিল্লিতে সদ্য গজিয়ে ওঠা, এবং যুব সমাজে ‘ভাইরাল’ হয়ে যাওয়া সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির ডাকা একটি সাংবাদিক সম্মেলন থেকে বামপন্থি নেতা নেহা বোরার মন্তব্য, ‘১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা দেশের সবচেয়ে গুরুতর ইস্যু’।
‘গত ২ অক্টোবর মুম্বাইতে সিজেপির সমাবেশে যে পরিমাণ জনতা উপস্থিত হয়েছিল, তাতে এই ইঙ্গিত স্পষ্ট যে মানুষের এটাই দাবি’।
ককরোচ জনতা পার্টি, বামপন্থি দল ও সংগঠনগুলোর যে বিক্ষোভ গত সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছে, বুধবার দিল্লি থেকে তা আরও জোরদার করার ডাক দিলেন নেহা বোরা, যিনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি। সেই সম্মেলন থেকেও ডাক উঠল, ‘জ্ঞানেশ, ইট্স ডান ব্রো’ যা এখন ভারতের তরুণ প্রজন্মের মুখে একটি স্লোগানে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে। ভারতে জন—আন্দোলনের ঘটনা নতুন না হলেও কোনো সাংবিধানিক সংস্থার বিরুদ্ধে এই ধরনের গণ—আন্দোলন নজিরবিহীন। এই সব বিতর্কের মূলে রয়েছে গত ২৩শে সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে নিযুক্ত তিন জন সম—পদমর্যাদার নির্বাচন কমিশনার মতবিনিময় করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সেই তদন্ত দেখাচ্ছে বহুক্ষেত্রে দুইজন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি সত্ত্বেও নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশগুলো বেশিরভাগই ছিল ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সংক্রান্ত, যার সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের বাদ যাওয়া সরাসরি যুক্ত।
ওই সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের দিকে আঙুল তুলেছে ভারতের বিরোধী দলগুলো।
বামপন্থি সংগঠনগুলো দিল্লির যন্তর মন্তরে দোসরা অক্টোবর থেকেই বিক্ষোভে শামিল হয়েছে। তবে সেখানে সাধারণ ছাত্র—যুবদের অংশগ্রহণও দেখা গেছে।
কিন্তু বিরোধীদের ডাকা আন্দোলনে কীভাবে জড়িয়ে পড়ল যুবসমাজ? আর এই আন্দোলন কি সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে?
কী চাইছেন রাহুল গান্ধী, কী প্রতিক্রিয়া কমিশন ও বিজেপির?
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তার সঙ্গে দেখা করতে হবে, এই দাবিতে ৬ অক্টোবর (মঙ্গলবার) নির্বাচন কমিশন দফতরের কাছেই আকাশবাণী ভবনে অনেক রাত পর্যন্ত অবস্থান করেন বিরোধী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
রাহুল গান্ধীর এই আন্দোলন ও নেহা বোরার মন্তব্য ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বৃহত্তর আন্দোলনের একটি অংশ। যদিও রাহুল গান্ধীর বিক্ষোভ ছিল মূলত বিরোধী এমপিদের নিয়ে, যেখানে সাধারণ তরুণদের খুব বেশি অংশগ্রহণ ছিল না।
সেখান থেকে তাকে পুলিশ প্রথমে আটক করে ও রাত নটা নাগাদ কিংসওয়ে ক্যাম্প থানায় নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ।
রাহুল গান্ধী মঙ্গলবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে বলেন, ‘দেশের সঙ্গে যা করা হয়েছে তা দেশদ্রোহিতা। প্রধানমন্ত্রী মোদী, অমিত শাহ, আরএসএস প্রধান বা জ্ঞানেশ কুমার, কেউই রেহাই পাবে না।’
এদিন দুপুরের দিকে পুলিশের হাতে প্রথমবার কিছু সময়ের জন্য আটক হন রাহুল গান্ধী, তার বোন কংগ্রেস এমপি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী ইন্ডিয়া জোটের এমপিরা।
তাদের ছেড়ে দেওয়া হলে রাহুল গান্ধী দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমারকে তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। এই দাবিতে নির্বাচন কমিশন দফতরের কাছেই আকাশবাণী ভবনে রাত পর্যন্ত অবস্থান করেন রাহুল গান্ধী।
দিনের শেষভাগে এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়াও আসে। নির্বাচন কমিশন জানায়, বিক্ষোভরত সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে স্মারকলিপি গ্রহণের জন্য তারা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যেখানে অবস্থান করছিলেন, সেই স্থানে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে থাকা সর্বোচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
কমিশনের মতে, এটি একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ হতে পারতো। তবে বিক্ষোভরত নেতারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবিতেই তারা অনড় থাকেন।
তার পরেই পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয় রাহুল গান্ধীকে।
এরপর মঙ্গলবার রাতেই বিজেপির তরফ থেকে সুধাংশু ত্রিবেদী একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন, সেখান থেকে তিনি রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যে বিরোধীদের কথা বলার আদৌ ইচ্ছা নেই, এই ঘটনা সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।’
‘সংসদও যদি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলতে চায়, তাহলে কমিশনের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিকে তলব করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরাসরি তলব করাই সংবিধান বিরোধী।’
বুধবার আবারও আটক হন রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী দলীয় নেতাদের কয়েকজন।
বুধবার একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাওয়ার পর রাহুল গান্ধী বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা হন। পুলিশ বিরোধীদলীয় নেতাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। এরপর রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধীদলীয় নেতাকে আটক করা হয়।
পরে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।
অভিজিৎ দীপকের ভাষ্যে নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছে তরুণ জেন—জি
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনটি প্রথমদিকে ভারতের বিরোধী দলগুলোর মধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তার কারণ, ২০২৫ সাল থেকে ভোটার তালিকায় যে নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাতে বহু ভোটারকে তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে ভোট দিতে পারেননি তারা।
বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে, ইচ্ছাকৃতভাবে ভোটদানে বহু সংখ্যক মানুষকে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং যার ফলে বিজেপির জেতার রাস্তা পরিষ্কার হয়েছে। রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলন করে সরাসরি ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ এনেছিলেন।
যদিও প্রথম দিকে এই ইস্যুতে যুবসমাজের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। তবে এই পরিস্থিতি দোসরা অক্টোবর থেকে পাল্টাতে শুরু করে।
ওই দিন মুম্বাইতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ থেকে অভিজিৎ দীপকে জেন—জিদের ভাষায় বলেছিলেন, ‘জ্ঞানেশ, ইট্স ডান ব্রো’ অর্থাৎ, ‘জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ ভাই!’
এই সমাবেশে প্রচুর সংখ্যক তরুণ উপস্থিত হয়েছিলেন। তরুণদের মধ্যে যে অভিজিৎ দীপকের একপ্রকার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তা জুলাই মাসে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে সংগঠিত আন্দোলনেও দেখা গিয়েছিল।
এই স্লোগান ছাত্র—যুবদের মধ্যে ঝড়ের গতিতে ভাইরাল তো হয়েইছে, উপরন্তু রাজনৈতিক দলগুলোও এই একই স্লোগান জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তুলতে শুরু করেছেন।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কের সেই জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এক গরিব মায়ের সন্তান। আপনার কারণে সব সন্তানই গরিব মায়ের সন্তান হয়ে গেছে।’
অর্থাৎ, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগকে তিনি সরাসরি মিলিয়ে দিয়েছেন তরুণ প্রজন্মের আশা ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে।
এই প্রসঙ্গে সাবেক আমলা জহর সরকার বিবিসি নিউজ বাংলাকে বলেন, ‘যে ব্যক্তির আজ ২৫ বছর বয়স, সে ১২ বছর বয়স থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে। কিন্তু বড় হয়ে সে দেখছে যে প্রতিশ্রুতিমতো স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি।’
তার মতে, এই আন্দোলন শুধু সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের বিরুদ্ধেও তরুণ সমাজ তাদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে।
