এবার কেরানীগঞ্জে চাঁদা না পেয়ে ট্রাক এনে লুটপাট
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ ঢাকার কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে একটি আবাসন কোম্পানির অফিস, নাম আফসানা হাউজিং। গত রবিবার বেলা ১১টা ২৬ মিনিটে ওই অফিসের সামনে এসে থামে একটি খালি ছোট ট্রাক। ততক্ষণে অফিসটিতে ঢুকে পড়েন জনা তিরিশেক যুবক। অফিসে ঢুকেই তারা বিভিন্ন কক্ষের গেট ভেঙে ফেলেন। অফিসটি তখন ফাঁকা ছিল। কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, রামদাসহ লাঠিসোটা নিয়ে ভেতরে ঢোকা যুবকেরা ভাঙচুর করছে। একপর্যায়ে ভেতরে থাকা সোফাসেট, এয়ারকিন্ডশনার, টিভিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র বের করে বাইরে রাখা পিকআপ ভ্যানে তোলেন তারা।
এরপর ভ্যানসহ সেখান থেকে চলে যান।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর গত বুধবার সরেজমিনে সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, পুরো অফিসে ভাঙচুরের চিহ্ন।
‘এই রুমে এসি ছিল। সেটা খুলে নিয়ে গেছে। এটার আউটডোরও খুলে নিয়ে গেছে। দামি সোফা ছিল, টেবিল, ক্যাশটাকাÑসব নিয়ে গেছে। টিভি—গিজারও নিয়ে গেছে,’ বলছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার মো. নাসির।
তিনি জানান, সেদিন মোট কোটি টাকার মতো সম্পদ লুট হয়। এর মূল কারণ চাঁদার দাবি না মানা।
‘ওরা চল্লিশ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিলো। বলেছিলো এখানে ব্যবসা করতে হলে চাঁদা দিতে হবে। আমরা রাজি হই নাই। তারপর এই হামলা। প্রায় এক কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।’
ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক সজীব ব্যাপারী। ঘটনার পরদিন তিনি ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে কেরানিগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
সজীব ব্যাপারী বলেন, ‘ওরা সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং ভাড়া করে এই হামলাটা করেছে। কারণ আমি ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দেই নাই। আমি বলছি যে, আমি চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করবো না। এখন আমি তো ভয়—আতঙ্ক নিয়ে আছি। কাজ বন্ধ।’
বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুরসহ একের পর এক ঘটনা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। একের এক ঘটনায় উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে, আইন—শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও। কারণ সরকার এগুলো থামাতে পারছে না।
বিশেষত ঢাকায় পরিচিতি একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও এবং মিরপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে হামলা—ভাঙচুরের পর সরকারের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপকভাবে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপির কোনো কোনো নেতার নাম আসায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে, কারণ এই দলটির সরকার চালাচ্ছে।
চাঁদাবাজি—দখলের পেছনে রাজনৈতিক ‘প্রশ্রয়’?
বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুরসহ একের পর এক ঘটনায় আইন—শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিভিন্ন ঘটনায় সরকারিদলের স্থানীয় নেতাদের নাম আসায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।
কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হলো?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে এগুলো সহজে নির্মুল হয় না।
‘আমাদের এখানে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, তারা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন নেতাকর্মীদের একটা অংশ মনে করেন, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি যে হামলা—মামলার শিকার হয়েছেন, আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, ক্ষমতায় আসার পর সবগুলো তিনি সুদে—আসলে তুলে ফেলবেন। তো সেটা তুলতে গেলে তো আইন মেনে সেটা সম্ভব না। তখনই আসে শক্তিপ্রয়োগ করে অন্যেরটা দখল বা চাঁদাবাজির কৌশল।’
বাংলাদেশে চাঁদাবাজি বা দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে দলীয় নেতাদের নাম প্রকাশ্যে আসার পর সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে অবশ্য বহিষ্কারের মতো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়।
তবে মি. হক মনে করেন এসব বহিষ্কার খুব একটা কাজে আসছে না।
‘সাংগঠনিক ব্যবস্থা যেটা নেওয়া হচ্ছে, সেটা সমঝোতামূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা কি না সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই সাংগঠনিক ব্যবস্থা উদাহরণ তৈরি করতে পারছে না। এখানে আইনের প্রয়োগটাও কঠোর করা প্রয়াজন। যতগুলো ঘটনা ঘটছে, সকল ঘটনায় যখন যথাযথ আইনের প্রয়োগ হবে, তখন সেটা একটা বার্তা তৈরি করবে।’
কিন্তু সরকার কি দল সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে? আর সরকারই বা কেন এসব অপরাধ থামাতে পারছে না?
এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অবশ্য স্বীকার করছেন, দলের কেউ কেউ অপরাধে জড়িত থাকতে পারে। তবে সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে এমন অভিযোগ নাকচ করেন তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে না, প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো কারণও নেই। তবে এই অভিযোগ আমি উড়িয়েও দিতে চাই না যে, সরকারি দলের কেউ না কেউ এটার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নয়। জনগণ যদি কোনোভাবে সাফার করতে থাকে ক্রমাগত এবং সেটা যদি সরকারি দলের নামে হয়ে থাকে, তাতে যদি আইন—শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঠিক ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে তো সরকারকেই এটার মাশুল দিতে হবে। সরকার এটার ব্যাপারে সচেতন আছে।’
