নোবেল শান্তি পুরস্কার || ন্যায়বিচার যখন শান্তির ভিত্তি
বিশেষ প্রতিবেদনঃ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক গভীর বৈপরীত্য নিহিত রয়েছে। আইন যেখানে সহিংসতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতাই প্রায়শ নির্ধারণ করে দেয়Ñকার যন্ত্রণা স্বীকৃতি পাবে, আর কার বেদনা থেকে যাবে বিচারের সীমানার বাইরে। ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, ৮৫ বছর বয়সী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়ে সেই ঐতিহাসিক বৈপরীত্যকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে। তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছে ‘শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রসারে তাঁর প্রচেষ্টার জন্য’। এই স্বীকৃতি এমন এক দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, যেখানে মানবিক যন্ত্রণাকে আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের দাবিতে রূপান্তরিত করার প্রয়াস অব্যাহত থেকেছে। একই সঙ্গে এই পুরস্কার স্মরণ করিয়ে দেয়Ñস্থায়ী শান্তি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; তার জন্য প্রয়োজন ন্যায়বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে নাভি পিল্লাইয়ের জন্ম। বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশে নিজস্ব আইন পেশার চর্চা শুরু করেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের আইনি প্রতিরক্ষায় অংশ নেন এবং ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারকের দায়িত্ব লাভ করেন। তাঁর এই দীর্ঘ পথপরিক্রমার অন্তর্নিহিত বিশ্বাস ছিল সুস্পষ্টÑরাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাঁদের অধিকার অস্বীকার করে, আইনকে তাঁদের সুরক্ষার আশ্রয় হয়ে উঠতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় পিল্লাইয়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান গড়ে ওঠে ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ওঈঞজ) বিচারক এবং পরবর্তী সময়ে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক প্রসিকিউটর বনাম আকায়েসু মামলার রায় প্রদানকারী বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। ওই রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, কোনো সুরক্ষিত জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট অভিপ্রায়ে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা সংঘটিত হলে তা গণহত্যার অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিচারকমণ্ডলীর এই সম্মিলিত সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনে লিঙ্গভিত্তিক নৃশংসতার স্বীকৃতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে তিনি সর্বজনীন মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং বৈষম্য থেকে মানুষের সুরক্ষার পক্ষে কাজ করেন। এই দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে তাঁকে বারবার মুখোমুখি হতে হয়েছে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক টানাপোড়েনের।
পিল্লাইয়ের পরবর্তী দায়িত্বগুলো আন্তর্জাতিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে তিনি গাজায় সংঘটিত ঘটনাবলির তদন্ত তত্ত্বাবধান করেন। কমিশনের অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসরায়েল সরকার তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। এখানে মনে রাখা জরুরি, তদন্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুসন্ধানমূলক মূল্যায়ন; তা কোনো ফৌজদারি আদালতের দণ্ডাদেশ কিংবা চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তির সমার্থক নয়।
ন্যায়বিচারহীন শান্তি সর্বদাই অনিশ্চিত; আর কার্যকর প্রতিষ্ঠানবিহীন ন্যায়বিচার থেকে যায় এক অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা। এই দুই ঐতিহাসিক প্রয়োজনের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার নিরলস প্রয়াসেই নিহিত রয়েছে নাভি পিল্লাইয়ের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উত্তরাধিকার।
