অবশেষে সাংবিধানিক ভারসাম্যে আমেরিকা || ড. জীবন বিশ্বাস

গত ৩ নভেম্বর মিডটার্ম ইলেকশনে আমেরিকান ভোটাররা শুধু কংগ্রেসের দলীয় বিন্যাস বদলাননি, তাঁরা ওয়াশিংটনে রিপাবলিকানদের একক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে একজন ‘সর্বময়—ক্ষমতা—সম্পন্ন’ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের বিপরীতে ডেমোক্র্যাট—নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছেন। হাউজ ও সিনেটÑউভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণই ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেছে, এমন সব এলাকাতেও তারা জয় পেয়েছে যেগুলো কয়েক মাস আগেও প্রায় নাগালের বাইরে বলে মনে হচ্ছিল। তাই এই ফল কেবল দলীয় পালাবদল নয় বরং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ঠিক মধ্যভাগে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক সাংবিধানিক ভারসাম্যের পুনঃসমন্বয়। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।

জয়ের ব্যাপ্তি নির্বাচনের আগের অধিকাংশ প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। ডেমোক্র্যাটরা হাউজে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা দুই ডজনের বেশি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। এমন প্রায় এক ডজন আসনেও জয় পেয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। নতুন কংগ্রেস জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত হলে হাকিম জেফ্রিস স্পিকার হওয়ার অবস্থানে আছেন। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান হাউজ স্পিকার।

সিনেটের ফল আরও বিস্ময়কর। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি, ডেমোক্র্যাট ও তাঁদের সঙ্গে অবস্থানকারী স্বতন্ত্রদের ছিল ৪৭। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সমতা—ভাঙা ভোটের কারণে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য নিট চারটি আসন দরকার ছিল। কিন্তু তারা এমন সব স্টেটে অগ্রগতি সাধন করেছে, যেগুলো সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত কাঠামোগতভাবেই তাদের জন্য প্রতিকূল বলে বিবেচিত হতো। টেক্সাসে জেমস টালারিকো রিপাবলিকান প্যাক্সটনকে পরাজিত করে তিন দশকের বেশি সময় পর স্টেটব্যাপি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় এনে দিয়েছেন। ক্যানসাসে অ্যাডাম হ্যামিল্টন সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়ে ১৯৩২ সালের পর এবারেই প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর হয়েছেন। সাউথ ক্যারোলাইনাতেও রিপাবলিকান আসন ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেছে। নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া ও ওহাইওতেও তারা জয় পেয়েছে। মেইনে রিপাবলিকান সুসান কলিন্সের তিন দশকের সিনেট—জীবনের অবসান ঘটেছে। 

এই ডেমোক্রেটিক ঢেউয়ের ব্যাপ্তি বোঝাতে ক্যানসাস সম্ভবত সবচেয়ে প্রতীকী উদাহরণ। হ্যামিল্টনের জয় সেখানে ৯৪ বছরের ডেমোক্র্যাট—শূন্যতা ভেঙেছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, রয়টার্সের হিসাবে সেওয়ার্ড কাউন্টিতে, যেখানে ২০২৪ সালে ট্রাম্প ৩৯ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন; হ্যামিল্টন এবার মার্শালের চেয়ে ১৩ পয়েন্ট এগিয়ে। একটি কাউন্টির ফল কখনোই স্থায়ী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস প্রমাণ করে না, কিন্তু এমন বিপুল দিকবদলকে কেবল স্বাভাবিক দলীয় ভোটার উপস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর প্রভাব থাকবে দীর্ঘদিন, এ কথা অনস্বীকার্য।

একইভাবে এই জয়কে একটি মাত্র কারণের ফল বলাও ভুল হবে। জীবনযাত্রার ব্যয় ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। পুরো প্রচারপর্বে ডেমোক্র্যাটরা খাদ্য, বাসস্থান, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবার খরচকে সামনে এনেছে এবং অভিযোগ করেছে, ট্রাম্পের শুল্কনীতি পরিবারগুলোর ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রিপাবলিকানরা যেসব সাংস্কৃতিক বিতর্ককে গুরুত্ব দিয়েছিল, ভোটাররা তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন দৈনন্দিন অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে। এই ফলকে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি অর্থনৈতিক নীতির প্রতি জনসমর্থন হিসেবে ধরে নেয়া উচিত নয়, বরং বহু পরিবার তাদের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতায় অসন্তুষ্ট হয়ে ক্ষমতাসীন দলকে শাস্তি দিয়েছেÑএ ব্যাখ্যাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

ইরান যুদ্ধ সেই অসন্তোষে আরেকটি স্তর যোগ করেছে। হতাহত, বিপুল সামরিক ব্যয় এবং জ্বালানিমূল্যের চাপ বিদেশের যুদ্ধকে ঘরোয়া রাজনীতির অংশ করে তুলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধ নিয়ে হতাশা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ভোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি ছিল। নির্বাচনের পর ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে ইরান সংঘাত তাঁর দলের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে, যদিও যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে তিনি এখনও সমর্থন করছেন। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতি তখনই নির্বাচনী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যখন দূরের সংঘাত ঘরের বাজেট ও প্রেসিডেন্টের বিচক্ষণতা সম্পর্কে ভোটারের ধারণাকে স্পর্শ করেছে।

রাজনৈতিক অর্থে ট্রাম্প নিজেও এই নির্বাচনের ব্যালটে ছিলেন। প্রচারপর্বে তিনি সমর্থকদের বারবার এমনভাবে ভোট দিতে বলেছেন যেন তিনিই প্রার্থী। রিপাবলিকান প্রাথমিক নির্বাচনে তাঁর সরাসরি হস্তক্ষেপও ছিল ব্যাপক। সেই কৌশলের মূল্যও দিতে হয়েছে। টেক্সাসে তিনি কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন করেছিলেন এবং সাউথ ক্যারোলাইনায় সমর্থন করেছিলেন ডারলিন গ্রাহামকে। দুজনই পরাজিত হয়েছেন। আবার ট্রাম্প থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করা মেইনের সুসান কলিন্সও রক্ষা পাননি। ফলে ফলাফলকে শুধু ট্রাম্প—বিরোধী গণরায় বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে কেবল রিপাবলিকান শাসনের বিরুদ্ধে ভোট বলা আরও অসম্পূর্ণ। এটি ছিল দুইয়েরই সম্মিলিত বিচার, জনতার ভোটের আদালতে।

ভোটার—তথ্যও এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। রয়টার্সের কাউন্টিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধনী ও দরিদ্র, উচ্চশিক্ষিত ও তুলনামূলক কম শিক্ষিতÑপ্রায় সব ধরনের এলাকায় ডেমোক্র্যাটরা অগ্রগতি করেছে। বিশেষ করে লাতিনো—অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিবর্তন ছিল উল্লেখযোগ্য। টেক্সাসের সীমান্তবর্তী যেসব এলাকায় ২০২৪ সালে ট্রাম্পের দিকে ভোট সরে গিয়েছিল, সেখানেও এবার ডেমোক্র্যাটদের পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। নির্বাচনের পর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ভোটার বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ২০২৪ সালে ট্রাম্পের দিকে যাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা আবার সমর্থন ফিরে পেয়েছে। তবে একটি নির্বাচনকে স্থায়ী দলীয় পুনর্বিন্যাসের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; অর্থনীতি, প্রার্থী এবং জাতীয় রাজনৈতিক আবহ বদলালে নির্বাচনী জোটও দ্রুত বদলাতে পারে।

গভর্নর নির্বাচনেও ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছে। রিপাবলিকান—নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি স্টেটের গভর্নর পদ ডেমোক্র্যাটরা দখল করেছে। টেক্সাসে জিনা হিনোহোসা তিন মেয়াদের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে প্রথম ল্যাটিনো গভর্নর হয়েছেন। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান নারী গভর্নর হয়েছেন। এসব ফল ডেমোক্র্যাট জয়ের জাতীয় ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট করে, তবে ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান স্টেটগুলোর রাজনৈতিক পরিচয় স্থায়ীভাবে বদলে গেছেÑএমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা যাবে না।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, কংগ্রেসের এই ক্ষমতা ডেমোক্র্যাটরা কীভাবে ব্যবহার করবে। হাউজে নিয়ন্ত্রণ তাদের কমিটির নেতৃত্ব, তদন্ত, অর্থবরাদ্দ নিয়ে দরকষাকষি এবং ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করার সাংবিধানিক ক্ষমতা দেবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় নিয়োগ অনুমোদন, এমনকি সম্ভাব্য সুপ্রিম কোর্ট মনোনয়নও আটকে বা পরিবর্তিত করতে পারে। দুই কক্ষ মিলিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং আইনগতভাবে সাক্ষ্য বা নথি তলবের ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু কংগ্রেসের ক্ষমতার সীমাও রয়েছে। ট্রাম্প এখনও প্রেসিডেন্ট; তাঁর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা, ভেটো, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা থাকবে। বিভক্ত দলীয় নিয়ন্ত্রণ মানে প্রেসিডেন্টের ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, তবে তা প্রেসিডেন্টের অচলাবস্থা নয়।

এই কারণেই ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস—কে জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফল তিনি মেনে নিতে প্রস্তুত এবং বলেছেন, ‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব’। তিনি আরও বলেছেন, সম্ভবত দুই পক্ষ কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে। নির্বাচন—স্বীকৃতি নিয়ে সাম্প্রতিক আমেরিকান বিতর্কের পটভূমিতে এ বক্তব্যের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এটিকে রাজনৈতিক সম্প্রীতির নিশ্চয়তা ভাবার কারণ নেই। কারণ, ট্রাম্প একই সঙ্গে তাঁর কাছে অপছন্দেও পাশ হওয়া বিলে ভেটো দেয়ার হুমকিও দিয়েছেন।

৩ নভেম্বরের গভীর তাৎপর্য এখানেই। মধ্যবর্তী নির্বাচনের জোয়ার মানেই আদর্শিক বিপ্লব নয়; ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাখ্যানও বিরোধী দলের প্রতিটি নীতির পক্ষে ইতিবাচক ম্যান্ডেট নয়। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা পেয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে পেয়েছে দায়িত্বওÑন্যায্য তদারকি ও রাজনৈতিক প্রদর্শনের মধ্যে, প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ও অভ্যাসগত বাধাদানের মধ্যে, অর্থনৈতিক সংশোধন ও দলীয় প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য রাখার দায়িত্ব। মনে রাখা দরকার, ডেমোক্রেটদের ঐতিহ্যে ট্রাম্পের মতো একক—ক্ষমতা—সম্পন্ন কোন প্রেসিডেন্ট নেই, সবাই গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে সুশিক্ষিত। কাজেই ট্রাম্পের মতো আচরণ সর্বদাই বর্জনীয়।

আমেরিকার সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রেসিডেন্টকে অপসারণ না করেও ভোটারদের ক্ষমতার সীমারেখা নতুন করে আঁকার সুযোগ দেয়। ২০২৬ সালে সেটিই ঘটেছে। ট্রাম্পকে নির্বাচিত করার দুই বছর পর ভোটাররা তাঁর প্রেসিডেন্সি শেষ করেননি, তাঁরা বদলে দিয়েছেন সেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, যার মধ্যে তাঁকে শাসন করতে হবে। তাই এই নির্বাচনের রায় কেবল নীল বনাম লাল নয়। এটি ছিল কংগ্রেসকে আবার এক সাংবিধানিক প্রতিপক্ষ ও ভারসাম্যরক্ষী হিসেবে ফিরিয়ে আনার গণতান্ত্রিক প্রয়াসÑদুই দলকেই স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে গণতন্ত্রে বিজয় ক্ষমতা দেয়, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকানা দেয় না। 

সাংবিধানিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য আমেরিকান ভোটারদের অভিনন্দন!



Related Posts