বাসা ভাঙার খেলা || হাসানআল আব্দুল্লাহ,নিউইয়র্ক
অনেকক্ষণ ধরে ছুটোছুটি করে, হম্বিতম্বি দেখিয়ে, নিজেদের ভেতরে সলাপরামর্শ করে, এর—ওর সাথে কথা বলে শেষ পর্যন্ত ওরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে এখানে কিছুতেই ঘর বাঁধা যাবে না। মেয়েটি বললো, “সেকি! এতো খেঁাজাখুঁজি, এতো পেরেশানি, দিনের পর দিন পরীক্ষা—নিরীক্ষা চালিয়ে এখন এমন সিদ্ধান্ত?”
ছেলেটি বললো, “তুমি তো কচি খুকি নও। বৈরিতা কাকে বলে তা তো জন্মের পর থেকে দেখে আসছো। ঝড়, নদী ভাঙন, গাছপালা উপড়ে ফেলা, ডাকাতের আক্রমণ, এতোসবের তো তুমি সাক্ষী হয়েই আছো। আবার কেন প্রশ্ন করছো! তাছাড়া আমরা তো ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি!” ছেলেদের এই এক স্বভাব, সুযোগ পেলেই মেয়েদের উপর চোখ গরম করবে।
কিন্তু ছেলেটি নরম হয়। বুঝতে পারে একবার তার বউ রেগে গেলে দুই তিন সপ্তাহ কথা বলা বন্ধ করে দেবে। তখন বাড়ি তৈরি দূরে থাকুক, ন্যূনতম খাওয়া—দাওয়াও পাওয়া যাবে না। অতএব সে তারের উপর থেকে উড়ে গিয়ে পাশের বাড়ির সামনে নিচু একটা গাছে বসে। তার স্ত্রীও সাথে যায়। স্ত্রীকে শান্ত স্বরে বলে, “ওই দেখো এ ক’দিন ধরে আমাদের বানানো বাড়ি ভেঙে দিচ্ছে।”
“বেটা খচ্চর!” স্ত্রী ফোড়ন কাটে।
ওদিকে বড় একটা লাঠি নিয়ে বাড়ির মালিক খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওদের বানানো বাসা ভাঙেন। লোকটা যে সীমাহীন নিষ্ঠুর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাড়ির মালিক, সাকলাইন, বাসা ভাঙতে ভাঙতে বলেন, “আমার বাড়িতে বাসা বানানোর আগে অনুমতি নিয়েছিলি! তাতো নিসনি। এখন কেন ডাকাডাকি করে পাড়া মাথায় তুলছিস!” মনে মনে এইসব বলেন আর ভাবেন তাই তো বেশ ক’দিন ধরে ভেতর থেকে শব্দ শুনছিলাম। খুঁজে পাচ্ছিলাম না কিসের শব্দ।
আজ সকালেও তিনি ডাক্তারের কাছে যাবার জন্যে গাড়ি বের করার মুহূর্তে ঘরের কোণে বেশ কিছু খড় বিচালি পড়ে থাকতে দেখে অবাক হন, এগুলো আবার কোথা থেকে এলো! দোতলার জানলার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করার চেষ্টা করেন ভাড়াটিয়ারা কিছু ফেলেছে কিনা! কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ পাওয়া গেল না। ফিরে এসে ওগুলো পরিষ্কারে সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি রাস্তায় গাড়ি বের করলেন। হয়তো রাতে ঝোড়ো বাতাস হয়েছিলো, বাইরে থেকে খড়কুটো উড়িয়ে নিয়ে এসে থাকবে, অনুমান করলেন তিনি। আবার তার মা—ও বাড়ির পিছনের সব্জি বাগানের জন্যে কিছু হয়তো এনে থাকতে পারেন যার সাথে আবর্জনা এসেছে। এইসব সাতপাঁচ চিন্তা করতে করতে গুগলম্যাপে ডাক্তারের ঠিকানা দিতেই সময় দেখালো ৪১ মিনিট। তার মানে সেখানে যেতে তার ১৫ মিনিটের মতো দেরি হবে। সকাল নয়টার অ্যাপয়েন্টমেন্ট! জোরে গাড়ি টেনে তিনি হাইওয়েতে উঠলেন। গুগলম্যাপ সংকেত দিলো, “সামনে পাঁচ মিনিটের স্লো—ডাউন।” তার মানে জ্যাম। কিছু দূর যেতে না যেতে আবার সংকেত এলো, “রোড ওয়ার্কের জন্যে ১৪ মিনিটের স্লো—ডাউন, গ্রান্ড সেন্ট্রালে।” এই গ্রান্ড সেন্ট্রাল পার্কওয়ে ধরে তাকে এক্সিট ২৫—এ বের হতে হবে। কিন্তু গাড়ির গতি স্লথ।
সেন্ট্রাল অফিসে ফোন করে তিনি জানিয়ে দিলেন যে তার পৌঁছতে ১৫ মিনিটের মতো দেরি হবে। তিনি রিপিট করলেন, “এতোটা জ্যাম হবে বুঝতে পারিনি।”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো, “কোনো সমস্যা নেই।”
আজ সাকলাইনের হার্টে একটা হল্টার মনিটর বসানো হবে। বেশ কিছু দিন ধরে তার হৃদস্পন্দন কমে গেছে। তিন মাস আগে ডাক্তার হল্টার মনিটর বসিয়ে দেখেছেন গড় স্পন্দন মাত্র ৩৭। কিছু ওষুধ তখন তিনি পাল্টে দেন। বিশেষত প্রেসারের জন্যে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এটেনোলল ট্যাবলেটের ডোজ অর্ধেক করে দেন। “এটেনোলল হার্টবিট কমিয়ে দেয়,” ডাক্তার বলেন।
“হৃদস্পন্দন কমে গেলে কোনো সমস্যা হয়?” সাকলাইন প্রশ্ন করেই বুঝতে পারেন যে তিনি বোকার পরিচয় দিয়েছেন। হার্টবিট না থাকলে তো মানুষ মারা যাবে।
কিন্তু ডাক্তার উত্তর ঠিকই দেন, তিনি বলেন, “আপনার হৃদপিন্ডের আর্টারি থেকে রক্ত নির্গত হয়। স্পন্দন কমে গেলে নির্গমনের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে এটা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী।” ডাক্তার আরো বলেন, “আমি সঙ্গে আরেকটা ওষুধ যোগ করে দিচ্ছি, এমলোডপিন!”
“এ ওষুধটা দেবেন না। আমার হাত—পা ফুলে যায়!” সাকলাইন অনুরোধ করেন।
“আপনি আগেও নিয়েছেন এই ওষুধ?”
“জ্বি, আমি ও আমার মা দু’জনেই ব্যবহার করেছি। কিন্তু আমরা একই ব্লাডলাইনের হওয়ায়, আমাদের সমস্যাও একই রকম। অতএব আমরা এটা ব্যবহার করতে পারি না।”
“চিন্তা করবেন না, আমি সবচে’ নিম্ন ডোজের বেবি এমলোডপিন দিচ্ছি। হাত—পা ফুলবে না।”
ডাক্তার সেদিন ঠিকই বলেছিলেন। এমলোডপিনে এবার কাজ হয়েছে। এমনকি এটেনোলল—এর ডোজ কমিয়ে দেয়ায় হার্টবিটের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। দু’সপ্তাহ আগে লেকসাকসেস অফিসে ফলোআপ করতে গেলে তিনি বললেন, “তারপরেও আমি হল্টার মনিটর দিয়ে আরেকবার দেখতে চাই চব্বিশ ঘণ্টায় গড় হার্টবিট কতো আসছে। যদি অ্যাবনর্মাল হয় আমার অফিস আপনার সাথে যোগাযোগ করবে। অন্যথায়, আমি আপনাকে তিনমাস পরে দেখবো।”
স্লথ গতির ট্রাফিক ঠেলে মিস্টার সাকলাইন শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের অফিসে পঞ্চাশ মিনিটে পৌঁছালেন। বিশ মিনিটের পথ অতিরিক্ত তিরিশ মিনিট খেয়ে নিলো। পার্কিং লটে গাড়ি রেখে তাড়াহুড়ো করে দোতলার রিসেপশনে দাঁড়াতেই বিশাল গ্লাসের ভেতর থেকে রিসেপশনিস্ট ভদ্রলোক বললেন, “এক মিনিট।” তিনি তখন ফোনে কথা বলছিলেন। ফোন ছেড়ে আগমনের হেতু জানতে চাইলে, সাকলাইন বললেন, “হল্টার মনিটর বসানোর জন্যে আজ নয়টায় আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। স্যরি অনেকটা লেট করে ফেলেছি।” তিনি বললেন, “ঠিক আছে বসুন। নার্স আপনাকে ডেকে নেবেন।”
ডাক্তারের অফিসে দেরি করে যাওয়ায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন রোগী এসে পড়েছিলেন, ফলে সাকলাইনকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। আগে থেকে ওখানে বসে থাকা রোগীদের একে একে ডেকে নেবার সময় তিনি চোখ রাখছিলেন আর ক’জন বাকি আছেন। কিন্তু আরো রোগী এসে জায়গাটি ভরে ফেললো। একটা বই হাতে করে আনলেও পড়া যেতো, কিন্তু তাড়াহুড়োয় সেটাও করা হয়নি। সকাল থেকে তিনি দৌড়ের উপরেই আছেন। স্ত্রীকে তার কর্মস্থলে নামিয়ে দিয়ে ফেরার সময় সামনে গার্বেজ ট্রাক পড়ায় সেখানেই পনেরো মিনিট চলে যায়। বাসায় ফিরে যে তিনি নাস্তা করে যাবেন সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে গলির মোড়ে গাড়ি থামিয়ে স্থানীয় গ্রোসারি শপ থেকে একটা ক্রোসান্ট কিনে নেন। “বাবা, একটা ক্রোসান্টের দাম দুই ডলার!” পয়সা দিতে গিয়ে অঁাতকে ওঠেন তিনি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্মে সব কিছুর দাম এখন আকাশ ছেঁায়া। বারোটা ডিম এখন কিছুতেই দশ ডলারের নিচে পাওয়া যায় না। এক গ্যালন দুধ দুই ডলার থেকে পাঁচ ডলারে উঠেছে। অথচ এই দেশে যখন প্রথম এলেন, মিস্টার সাকলাইন ফোন করে তার নানীকে বলেছিলেন, “জানো নানী, এখানে ডিম আর দুধের দাম সবচে’ কম।” আজও তার কানে সেইসব কথা বাজে। এক ডজন ডিম তখন পাওয়া যেতো মাত্র পঁচাত্তর সেন্টে।
গাড়ি চালাতে চালাতে ক্রোসান্ট ছিঁড়ে মুখে দেন। পথে জ্যাম আগে থেকে জানলে হয়তো তিনি গ্রোসারিতেই ঢুকতেন না। চা নিতে যে বাসায় এসেছিলেন তারও দরকার হতো না। স্ত্রীর কর্মস্থল থেকে সোজা চলে যেতেন ডাক্তারের কাছে। তাহলে এখন এভাবে বসে থাকতে হতো না। এইসব ভাবনার ভেতরেই নার্স এসে ডাকলেন, “মোহাম্মদ। মোহাম্মদ আছেন?”
মিস্টার সাকলাইন উঠে দাঁড়ালেন, তার নামের প্রথম অংশ মোহাম্মদ! ওদিকে জানালার পাশ থেকে একজন কালো ভদ্রলোকও উঠে দাঁড়ালেন! নার্স কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, “মোহাম্মদ জর্জ!” অতএব কালো ভদ্রলোক নার্সের পিছু পিছু গেলেন। সাকলাইন নিজের সিটে বসতে বসতে ভাবলেন, “আফ্রিকা থেকে আসা মুসলমানদের এই একটা ইন্টারেস্টিং দিক হলো, তাদের নামের প্রথম অংশ মোহাম্মদ রাখলেও শেষ অংশ আমেরিকাদের অনুসরণে রাখা হয়। ব্যতিক্রম যে নাই তা নয়, যেমন মোহাম্মদ আলী।”
কিছুক্ষণ পরে ডাক পড়লে তিনি নার্সকে অনুসরণ করে ভেতরের রুমে ঢুকলেন। দীর্ঘ করিডোর দিয়ে সামনে এসে ডানে গেলেই নার্সের রুম। আজ আর ডাক্তার দেখবেন না। মনিটরটি নার্স নিজেই লাগিয়ে দেবেন। রুমে ঢুকেই তিনি জানতে চাইলেন আগে বাথরুম করে আসতে পারবেন কি না। কিন্তু নার্স অসম্মতি জানিয়ে বললেন, “আজ আমি খুব ব্যস্ত, দু’মিনিটের ভেতরেই আপনার হয়ে যাবে।” জ্যাকেট খুলে শার্টের উপরিভাগের বোতাম আগলা করতেই তিনি বললেন, “আপনার বুকে তো অনেক চুল। এগুলো শেভ করে নিতে হবে।” যেই বলা সেই কাজ। ড্রয়ার খুলে একবার ব্যবহার করা যায় এমন একটি হাতলওয়ালা ব্লেড বের করে তিনি বুকের বামদিকের সমস্ত পশম শেভ করে দিলেন। এতোই দ্রুত করলেন যে মাত্র আধা মিনিটিই হয়ে গেল। এরপর ছোট্ট একটি মনিটর বের করলেন। মিস্টার সাকলাইনকে অবাক হতে দেখে বললেন, “টেকনোলজির উন্নতির সাথে সাথে মনিটরও ছোট হয়ে গেছে। এখন আর রোগীকে সারা শরীরে তার পেঁচিয়ে বিশাল একটি মনিটর গলায় ঝুলিয়ে রাখতে হয় না। পিল এন্ড সেট। দ্যাটস ইট।” বলেই তিনি মনিটরের একপাশে আঠা লাগানো কাগজ টেনে তুলে সাকলাইনের বুকের বাম পাশে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, “কাল ঠিক এমন সময় এসে ওটা দিয়ে যাবেন।” নামের লেবেল লাগানো একটা প্লাস্টিকের জিপলক ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এক সাইড দিয়ে টান দিলেই খুলে যাবে। এই জিপলকে ঢুকিয়ে সামনের কাউন্টারে রেখে যাবেন।”
মাত্র তিন মাস আগেও বড়সড় একটা মেশিন গলায় ঝুলিয়ে সারাদিন কাটাতে হয়েছিলো সাকলাইনকে। ফেরার পথে বাথরুমে ঢুকে পানি নিষ্কাশনের সময় চিন্তা করলেন তিনি, “আদতেই টেকনোলজি মানুষের জীবনকে অনেকটা সহজ করে দিয়েছে।”
বাসায় ফিরে ড্রাইভওয়ে দিয়ে গাড়ি ঢোকাতেই তিনি দেখলেন সকালের আবর্জনা স্তুপে আরো খড়কুটো জমা হয়েছে। উপরে তাকিয়ে আবিষ্কার করলেন পরিত্যক্ত ভেন্টিলেটরের ভেতরে আরো আরো খড়কুটো। এই কাজ যে চড়ুই পাখির তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশেষে তাদেরই তিনি গাছের ডালে খুঁজে পেলেন। চড়–ইয়ের বাসা ভেঙে দিয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখলেন পাশের বাড়ির ফুলের গাছে দুই চড়–ই সঙ্গম করছে। কী যে আনন্দ তাদের ভেতরে। তাও একবার নয়, পরপর দুইবার। মেয়ে চড়–ইটা ডানা নেড়ে নেড়ে আনন্দে ব্যাকুল হয়ে পড়ছে। আর ছেলেটার তো সুখের কোনো সীমা—পরিসীমা নেই। মিস্টার সাকলাইনের ঈর্ষাই হলো বইকি! গত তিনমাস ধরে তার নিজের কোনো সঙ্গম সুখ নেই। মাঝে মধ্যে একটু আধটু হলেও তার স্ত্রীর কাছ থেকে কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। তিনি তখন আরো অতৃপ্তির ভার নিয়ে একপ্রকার কাজ শেষ করে উঠে আসেন। নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কিন্তু এমন তো হবার কথা ছিলো না। এমনটি কেন হচ্ছে তারও হদিস খুঁজে পান না। অতএব চড়ুইয়ের সঙ্গম সুখ তাকে ঈর্ষান্বিত করে তোলে। মনে মনে ভাবেন, “এইমাত্র এই শালাদের বাড়ি ভেঙে দিলাম আর ওরা আনন্দের কেলি করছে!” ভাবতে না ভাবতে তৃতীয়বারের মতো ছেলে চড়ুইটি মেয়ে চড়ুইয়ের গায়ের উপর উঠে বসতে গেলে, মেয়ে চড়ুইটি ফুরুৎ করে উড়ে সাকলাইনের বাড়ির সামনের উঁচু গাছের ডালে চলে গেল। আর ছেলেটি আগের জায়গায় বসেই নেচে নেচে ডাকাডাকি করতে থাকলো। এরপর ছেলেটি উড়াল দিলে মেয়েটিও তাকে অনুসরণ করে এবাড়ি—ওবাড়ির উপর দিয়ে কোথায় হারিয়ে গেল!
পরদিন মনিটর জমা দিয়ে ফেরার পথে তিনি হোম ডিপোতে গেলেন। টমেটো, মরিচ, বেগুন ইত্যাদি সব্জির চারা ও দু’টি গোলাপ গাছ নিয়ে বাসায় ফিরতেই দেখেন সেই একই জায়গায় চড়–ই মনের সুখে আবর্জনা সাজিয়েছে। তাদের কী যে আনন্দ! বাসা একবার ভেঙে ফেললে কি হবে, বারবার বানাবো, এই যেন তাদের পণ। ওদিকে সারারাত চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে সাকলাইনের ঘুমই হয়নি। ছোট হলে কি হবে, বুকে একটি মেশিন লাগিয়ে রেখে কে কবে ঘুমাতে পেরেছে? তাই ভেবেছিলেন বাসায় ফিরে একটু বিছানায় গড়াগড়ি করে নেবেন। আজ আর পাশ ফিরে শুলে হলটার মনিটর বাধা হয়ে উঠবে না। কিন্তু চড়ুই তা হতে দিলো না। তিনি আবারও বাড়ির পেছন থেকে সেই লাঠিটি খুঁজে আনেন। চড়ুইয়ের বাসা ভাঙা শেষ হলে খেয়াল করেন ভেন্টিলেটরের সামনে একটি দরজার মতো আছে যা ঝুলে যাওয়ায় সেই খোলা জায়গা দিয়ে অনায়াসে চড়–ই ঢুকছে। অতএব সেটিকে বন্ধ করা দরকার। এবার বাড়ির পেছনের শেড থেকে মই বের করে আনেন, তার উপর দাঁড়িয়ে কাগজের টেপ, যা কিনা গ্যারাজেই রাখা ছিলো, দিয়ে দরজাটি ভাল করে বন্ধ করেন আর মনে মনে বলেন, “যাও এবার অন্য কোথাও বাসা বানাও। আমার ঘরে নয়।” কাজ শেষ করে মই বেয়ে নেমে আসতে আসতে সাকলাইনের অবচেতন মন বলে ওঠে, “আচ্ছা চড়ুইয়ের বাসা এখানে থাকলে কি সমস্যা! অন্যের ঘরের কোণায় বাসা বানানোই তো তাদের ধর্ম।” কিন্তু তাতেও সাকলাইনের আপত্তি থাকতো না। প্রথমত ওইখানে ঘরের সামনে বাসা হলে, ড্রাইভওয়েতে সবসময় আবর্জনা পড়ে থাকবে। আর ভেন্টিলেটর দিয়ে চড়–ইয়ের গায়ের বুনো গন্ধ বাসায় ঢুকবে। দ্বিতীয়ত, কয়েক বছর আগে চিমনির পাশ দিয়ে ফুটো করে কাঠবিড়ালি এ্যাটিকে যে বাসা বানিয়েছিলো সেটি ভাঙতে এবং বাচ্চাগুলোকে নিরাপদে রেখে আসতে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিলো, তাতে মিস্টার সাকলাইনের ধারণা নিজের বাড়িতে কখনোই কাউকে আমন্ত্রণ করে এনে সন্তান উৎপাদনের সুযোগ করে দিতে নেই। তার জন্যে হাসপাতাল আছে, আর পাখির জন্যে উঁচু গাছের ডাল, আছে সরকারি বাড়ির নানা ফাঁকফোকর। এটা যদি বুঝতে পারতো, তাহলে আজ প্যালেস্তানিয়ানদের ভিটে ছাড়া হওয়ার দরকার হতো না। একদিন যাদের আমন্ত্রণ করে ঘরে এনেছিলো আজ তারাই তাদের ঘরদোর ভেঙে ভিটে ছাড়া করে দিয়েছে। “কী ভয়ংকর!” সাকলাইন ভাবেন, “রক্ত ও মিসাইল বন্যায় একটা দেশ মাটির সাথে মিশে গেল! অথচ পুরো পৃথিবী চেয়ে চেয়ে দেখলো।”
পরদিন সকালে কাজে যাওয়ার সময় সাকলাইনের স্ত্রী গাড়িতে বসে বললেন, “আমাদের ঘরের কোণায় সম্ভবত পাখি বাসা বানাচ্ছে।”
সাকলাইন গাড়ির ত্বরণ বাড়াতে বাড়াতে বললেন, “কালই আমি তা ভেঙে দিয়েছি।”
