গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— চৌত্রিশ নেপথ্যকণ্ঠের নিভৃতচারি নায়ক শিল্পী রবীন মজুমদার
ড. জীবন বিশ্বাসঃ বাংলা চলচ্চিত্রে একসময় এমন একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অপূর্ব যুগ ছিল, যখন পর্দায় যে মুখ দেখা যেত, গানটিও প্রায়শ সেই মানুষের নিজের কণ্ঠেই শোনা যেত। অভিনেতা তখন অন্য কারও গানে ঠোঁট মেলাতেন নাÑনিজের গান নিজেই চরিত্রের ভেতর বহন করতেন। রবীন মজুমদার সেই সন্ধিক্ষণের শিল্পী। তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: বাংলা চলচ্চিত্রের আধুনিক হয়ে ওঠার প্রথম যুগের তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র গায়ক—নায়ক, যাঁর মধুর কণ্ঠ এবং পর্দার উপস্থিতি নেপথ্যসংগীতের পেশাগত বিভাজন সুস্পষ্ট হওয়ার আগেই চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় সংগীত—সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
জীবনযাত্রা
রবীন্দ্রনাথ মজুমদার, যিনি রবীন মজুমদার হিসেবেই সমধিক বিখ্যাত, জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে হুগলি জেলার চোপা গ্রামে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায়। বাবা অমূল্যকুমার মজুমদারের চাকরির সূত্রে তাঁর শৈশবের বড় অংশ কাটে কাটিহারে। অল্প বয়সেই সংগীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ দেখা দেয়। বারো—তেরো বছর বয়সে উত্তরবঙ্গ—রাজশাহী বিভাগীয় সংগীত প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম হন। ছেলের সাফল্যে উৎসাহিত বাবা একটি হারমোনিয়াম কিনে দেন এবং সংগীতচর্চাকে সমর্থন করেন। পরে কলকাতায় এসে স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। সংগীতশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী জীবনীমূলক সূত্রে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক গুরু হিসেবে পাওয়া যায়; বিশেষ করে নজরুলসংগীতের সূক্ষ¥ গায়নভঙ্গি তাঁর কাছেই শেখেন রবীন মজুমদার।
গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্রের দিনগুলো
চলচ্চিত্রে আসার আগেই গ্রামোফোন তাঁকে শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৩৯ সালে মেগাফোন থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম রেকর্ডÑএক পিঠে ‘আজি এ বিদায়ক্ষণে’, অন্য পিঠে ‘ওগো অনেক দিনের কথা’; গানের কথা এম. সুলতানের, সুর ভবানীচরণ দাসের। পরবর্তী সময়েও তাঁর অধিকাংশ স্বতন্ত্র রেকর্ডের সঙ্গে মেগাফোনের নাম জড়িয়ে থাকে। এই ইতিহাসটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিল্পী কেবল গান—গাওয়া অভিনেতা ছিলেন না; চলচ্চিত্রের খ্যাতির আগেই রেকর্ডের জগতে তাঁর একটি নিজস্ব সংগীত—পরিচয় তৈরি হয়েছিল।
এর প্রায় পরপরই তাঁর জীবনে আসে চলচ্চিত্র। স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় তাঁর গান শুনে প্রমথেশ বড়ুয়া তাঁকে নিয়ে আসেন শাপমুক্তি ছবিতে। ছবিটি মুক্তি পায় ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪০। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভে পরিচালক হিসেবে প্রমথেশ বড়ুয়া, সুরকার হিসেবে অনুপম ঘটক এবং গীতিকার হিসেবে অজয় ভট্টাচার্য ও মোহন রায়ের নাম নথিবদ্ধ আছে। রবীনের কণ্ঠে ‘এই ধরণীর ধূলির তলে’, ‘বনে নয় মনে রঙের আগুন’ এবং সমবেত ‘বাংলার বধূ’—র মতো গান নবীন গায়ক—নায়ককে বিপুল শ্রোতার সামনে এনে দেয়। শাপমুক্তি যেন প্রকাশ্যে প্রমাণ করল, রেকর্ডে যে মাধুর্যের আভাস পাওয়া গিয়েছিল, চলচ্চিত্রের রোমান্টিক পরিসরেও সেই কণ্ঠের নিজস্ব আবেদন আছে।
স্বতন্ত্র গায়কী ও আধুনিকতার উন্মেষ
রবীন মজুমদারের গায়কীর শক্তি শ্রোতাকে অভিভূত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়, বরং তাঁর স্বরের আবেদন ছিল কোমল প্ররোচনায়—মসৃণ উচ্চারণ, পরিমিত আবেগ এবং বাক্যের শেষে মৃদু অবতরণের এক স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। প্রেমের গান তিনি সাধারণত কণ্ঠের শক্তি দিয়ে অধিকার করতেন না; সুরের আবহের মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ করতেন। এই গুণ চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ উপযোগী ছিল। কারণ পর্দার চরিত্র এবং গানের কণ্ঠ একই শিল্পীর হওয়ায় অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও সুরের আবেগের মধ্যে স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা তৈরি হতো। তাঁর গায়কী তাই সেই পুরনো চলচ্চিত্রব্যাকরণের অংশ, যেখানে কণ্ঠ তখনও অভিনেতার শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়নি।
এই কি গো শেষ দান
এই গায়ক—নায়ক সত্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটে নীরেন লাহিড়ীর গরমিল ছবিতে, ১৯৪২ সালে। কমল দাশগুপ্তের সুর এবং প্রণব রায়ের কথায় শিল্পী গাইলেন ‘এই কি গো শেষ দান’Ñযা তাঁর সমগ্র শিল্পীজীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে। গানটির আবেগের বিন্যাস আপাতভাবে সরল: প্রেম শেষ হয়ে গেছে, অথচ মন এখনও বিশ্বাস ও অভিমানের মাঝামাঝি এক জায়গায় স্থির। শিল্পী এখানে অতিরিক্ত নাটকীয়তার আশ্রয় নেন না। বারবার ফিরে আসা প্রশ্নটিকেই তিনি বেদনার ভার বহন করতে দেন। ফলে গানটি অভিনীত শোকের চেয়ে স্মৃতির ভেতর থেকে উঠে আসা ব্যথার মতো শোনায়। একই ছবির ‘মোর অনেক দিনের আশা’—ও তাঁর প্রথম যুগের রোমান্টিক শিল্পীপরিচয়ের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
এই সময়েই তাঁর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড প্রকাশিত হয়। হীরেন বসুর কথায় এবং রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে ‘আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ’ তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় আধুনিক গানের একটি। মেগাফোনের সংরক্ষিত তালিকায় পাওয়া যায় ‘মোর প্রেমগান’, ‘চিনি চিনি তারে চিনি’, ‘নীলপরী গো নীলপরী’ সহ আরও বহু গান। কমল দাশগুপ্ত, রবীন চট্টোপাধ্যায়, প্রণব রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখের সঙ্গে তাঁর কাজ তাঁকে চল্লিশের দশকের বাংলা গানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল পরিমন্ডলের মধ্যে স্থাপন করে।
প্লেব্যাকের অপরিহার্য শিল্পী
চলচ্চিত্রসংগীতেও তাঁর পরিসর দ্রুত প্রসারিত হয়। সুশীল মজুমদারের যোগাযোগ (১৯৪৩) ছবিতে বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভ শিল্পী রবীন মজুমদারকে কানন দেবীর পাশাপাশি নেপথ্যশিল্পী হিসেবে নথিবদ্ধ করেছে সুরকার কমল দাশগুপ্ত, গীতিকার প্রেমেন্দ্র মিত্র ও শৈলেন রায়। ‘নাবিক আমার ওগো’ এবং ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’ এই পর্বের উল্লেখযোগ্য গান। তত দিনে চলচ্চিত্রশিল্প আধুনিক নেপথ্যকণ্ঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেÑগায়কের কণ্ঠ ধীরে ধীরে অভিনেতার শরীর থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব স্বাধীনতা অর্জন করছে। শিল্পী দাঁড়িয়ে ছিলেন ঠিক সেই ঐতিহাসিক সন্ধিস্থলেÑতিনি পর্দায় নিজে গানও গাইতে পারেন, আবার চলচ্চিত্রের জন্য স্বতন্ত্র নেপথ্যকণ্ঠও দিতে পারেন।
অভিনয় ও সংগীতের সবচেয়ে গভীর মিলন ঘটে দেবকীকুমার বসুর ‘কবি’ ছবিতে, ১৯৪৯ সালে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে রবীন মজুমদার অভিনয় করেন নিতাই কবিয়াল চরিত্রে। এখানে অভিনয় থেকে গানকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভবÑনিতাইয়ের পরিচয়ই নির্মিত হয়েছে কবিগান, তাৎক্ষণিক কাব্যরচনা ও সংগীতপরিবেশনের মধ্য দিয়ে। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভ তাঁকে একই সঙ্গে প্রধান অভিনেতা ও নেপথ্যশিল্পী হিসেবে নথিবদ্ধ করেছে; অনিল বাগচীর সুর এবং তারাশঙ্করের গীতরচনায় ‘কালো যদি মন্দ তবে’, ‘এই খেদ মোর মনে মনে’ প্রভৃতি গানে শোনা যায় অন্য এক শিল্পীকে—শহুরে প্রেমের আধুনিক গান থেকে বেরিয়ে এসে লোকনাট্যঘেঁষা, কাহিনিনির্ভর, অভিনয়সমৃদ্ধ গায়কীতে।
পঞ্চাশের দশকে বাংলা চলচ্চিত্র দ্রুত বদলে যায়। বিশেষায়িত নেপথ্য ৃকণ্ঠশিল্পীর আধিপত্য বাড়তে থাকে; রবীন মজুমদারের মতো গায়ক—নায়কের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়। তিনি অভিনয় চালিয়ে যান, মঞ্চেও কাজ করেন এবং পরবর্তী সময়ে আবার চলচ্চিত্রে ফিরেছেন; কিন্তু যে সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর প্রথম যুগের সংগীতখ্যাতি তৈরি করেছিল, সেই পরিবেশ আর আগের মতো ছিল না। এই কারণেই তাঁর শিল্পীজীবন কেবল পুরনো গানের সংগ্রহ নয়Ñবাংলা চলচ্চিত্র—সংগীতের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের জীবন্ত দলিল।
রবীন মজুমদারের ২৫টি স্মরণীয় বাংলা গান
১। এই কি গো শেষ দান, ২। তুমি এসেছিলে জীবনে আমার, ৩। আজি এ বিদায়ক্ষণে, ৪। ওগো অনেক দিনের কথা, ৫। এই ধরণীর ধূলির তলে, ৬। বনে নয় মনে রঙের আগুন, ৭। বাংলার বধূ, ৮। মোর অনেক দিনের আশা, ৯। আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ, ১০। মোর প্রেমগান, ১১। চিনি চিনি তারে চিনি, ১২। বালুকাবেলায় মিছে, ১৩। দেখা হলো কোন লগনে, ১৪। এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি, ১৫। নাবিক আমার ওগো ১৬। মালাখানি চাই না তব, ১৭। নীলপরী গো নীলপরী, ১৮। চাঁদ হাসে মোর গগনে, ১৯। বন্ধু কেমন আছ, ২০। অতল সাগরতলে, ২১। ভালোবাসি বলে সারাটি জীবন, ২২। মন যদি নাহি দিলে, ২৩। যদি গো কাছে আসি, ২৪। কালো যদি মন্দ তবে, ২৫। এই খেদ মোর মনে মনে।
পরিশেষ
রবীন মজুমদার এমন এক সংগীত—ইতিহাসের শিল্পী, যাকে আজকের প্রযুক্তিনির্ভর চলচ্চিত্র—অভ্যাস থেকে সম্পূর্ণভাবে কল্পনা করা সহজ নয়। এখন আমরা অভিনেতা ও গায়ককে, মুখ ও নেপথ্যকণ্ঠকে আলাদা সত্তা হিসেবেই ভাবতে অভ্যস্ত। তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনাকালে সেই বিচ্ছেদ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। এই কারণেই তাঁর শ্রেষ্ঠ গানগুলোতে এক ধরনের বিশেষ তাৎক্ষণিকতা রয়ে গেছে। ‘এই কি গো শেষ দান’ শুনলে শুধু কোনো চরিত্রের জন্য ধার দেওয়া কণ্ঠ শোনা যায় না; মনে হয়, মুখের অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি, গানের কথা ও সুরÑসবকিছু যেন একই শিল্পীসত্তার ভেতর জন্ম নিচ্ছে। তাঁর শক্তি ছিলÑএকটি গানের ভেতর সম্পূর্ণভাবে বসবাস করতে পারার ক্ষমতায়। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে রবীন মজুমদার তাই এক সন্ধিক্ষণের শিল্পীÑগ্রামোফোন ও চলচ্চিত্রের মাঝখানে, গায়ক—নায়ক ও আধুনিক নেপথ্যশিল্পীর মাঝখানে। সময় এগিয়েছে, শেষ পর্যন্ত নায়ক তার গান অন্য কণ্ঠের হাতে তুলে দিয়েছে। তবু শিল্পী রবীন মজুমদারের পুরোনো রেকর্ডে কয়েকটি দীপ্ত মুহূর্ত আজও থেকে গেছে যেখানে মুখ ও গান এখনও এক এবং অদ্বিতীয়। সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে’র সেই অভিনেতা—গায়ক রবীন মজুমদার বাংলা সংগীতে যে অবদান রেখে গেছেন তার তুলনা নেই।
