ইমেইল সাক্ষাতকারে এসোসিয়েটেড প্রেসকে শেখ হাসিনা ‘এমন কি হত্যা করলেও ডিসেম্বরেই ফিরব’
ডয়চে ভেলে প্রতিবেদনঃ ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এপি—কে বলেছেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, এমনকি হত্যাও করা হতে পারে। তা সত্ত্বেও আগামী মাসে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে তিনি অটল। ইমেইলের মাধ্যমে পাঠানো প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেন, ‘যদি মৃত্যুই আমার ভাগ্য হয়, তাহলে নিজের দেশের মাটিতে, আমার নিজের মানুষদের মাঝেই আমি মরতে চাই। তাই আমি বাংলাদেশে ফিরে আসবো। এই সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
প্রতিবেদনে এপি জানায়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নগুলো পাঠানো হয়েছিল গত সপ্তাহে। বুধবার এপির সব প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা। ভারত থেকে কীভাবে দেশে ফিরবেন তা জানাননি। তবে বাংলাদেশে পৌঁছালে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারেÑ সেই আশংকা বিবেচনায় নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি জানি, দেশে ফিরলে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আমাকে কারাবন্দি করা হতে পারে, নির্যাতন করা হতে পারে, এমনকি হত্যাও করা হতে পারে। এসব আমি ভালোভাবেই জানি। কিন্তু দূর থেকে আমার দেশের মানুষকে কষ্ট পেতে দেখে দেখে আমি বাকি জীবন কাটাতে পারি না।’
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন তার দল কঠোর দমন—পীড়নের মুখে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। শেখ হাসিনার দল, অর্থাৎ বাংলাদেশে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্পর্কে বলা হয়, দলটি বর্তমানে নিষিদ্ধ। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা হয় গ্রেপ্তার হয়েছেন, নয়তো নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এপির এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত তার দলের অন্তত ২০ হাজার নেতা—কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার নেতা—কর্মীকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে। অনেকে ‘আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন’ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার দলের অনেক সমর্থক নিজেদের ঘর—বাড়ি, ব্যবসা, জীবিকাও হারিয়েছেন।
‘এখন দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই’
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ বলেন, সেখানে কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই। শেখ হাসিনার অভিযোগ, তার দলকে পরিকল্পিতভাবে দমন করা হচ্ছে।
নিজের শাসনামলে শেখ হাসিনা ‘উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন’Ñ এমন পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে এপির সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদনে। শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কট্টরপন্থিদের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে এবং এ বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তার মতে, বাংলাদেশের ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে’।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তারেক রহমানের সরকারের সমালোচনা করেছে, কিন্তু সরকার বলছে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছেÑ এ কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে এপি।
‘দেশে ফেরার জন্য আমার কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদের প্রয়োজন নেই’
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সময় নিরাপত্তা পরিস্থতি নিয়ে শঙ্কার কথাও উঠে এসেছে এপির প্রতিবেদনে। জানতে চাওয়া হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো দেশগুলো তার নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে কি না। জবাবে কোনো বিদেশি সুরক্ষা চান নাÑ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিই আমি। আমাদের (বাংলাদেশের) পররাষ্ট্রনীতি সবসময় এমনই ছিল। তবে নিজের দেশে ফেরার জন্য আমার কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদের প্রয়োজন নেই।’
এপির দাবি, শেখ হাসিনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তারা সাড়া দেয়নি।
