হায়, ইতিহাস বিস্মৃত জাতি!

আগে কয়েকবার এই সম্পাদকীয় কলামে আমরা বলেছি যার অবদান মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব বাংলাদেশে, তাকে শত্রুরা ভয় করবেই। তার ভাস্কর্যের মাথায় চড়ে প্র¯্রাব করে দিলেই তাকে অসম্মানিত করা যায় না। বরং যারা যাদের প্ররোচনায় এই কাজটি করে তারাই ইতিহাসের আবর্জনায় নিক্ষিপ্ত হবে। হবেই। ঠিক একইভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধের উদ্দীপনা জাগানিয়া শ্লোগান জয়বাংলা শুনে এলার্জিক হয় তাদের উদ্দেশ্য একটাই, তাহলো ১৯৭১এ পাওয়া বাঙালি জাতির হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে মহার্ঘ্য অর্জন স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা। ওরা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘খাঁচার পাখি’। ওদের কাছে আকাশের মূল্য নেই। এমন কি প্রকৃতিরও। ওরা খাঁচা ভালোবাসে। প্রভুকে ভালোবেসে দাসত্বকে আলিঙ্গন করে। কবি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিয়ে চায়?’

পৃথিবী যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বদৌলতে, আক্ষরিক অর্থেই, হাতের মুঠোয়, একটি মাত্র সেল ফোনে, যা কিনা মানুষকে এনে দিয়েছে অপার ও অসীম স্বাধীনতা, তখন এক শ্রেণীর মানুষ, যারা একাডেমিক শিক্ষায় অশিক্ষিত নন, তারা চরম অশিক্ষিতের মত আচরণ করে ইতিহাসের কিছু চরম সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখায়। নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, স্বাধীনতার যুদ্ধ ও মহান অবদানগুলোকে অস্বীকার করে যারা তাদের কোন শব্দে বর্ণনা করা যায়, এখন নতুন করে ভাবতে হবে। 

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের মাথায় চড়ে প্র¯্রাব করে দিয়ে, হাতুড়ি গাইতি দিয়ে সেই ভাস্কর্য ভেঙে, এমন কি সব স্থাপনা থেকে রাতারাতি তার অবদানের চিহ্ন মুছে ফেলে দিয়েও যখন দেখা গেল তাকে বাঙালির মন থেকে মোছা যাচ্ছে না, তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল যে বাড়ি থেকে, যে বাড়িতে বসে মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা রচিত হয়েছিল এবং যে বাড়িতে সেই স্বাধীনতার মহান নেতা জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল সেই বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হল। যেন ৩২ নম্বরের সেই বাড়িটি কেবল ইট—সিমেন্ট—বালি দিয়ে তৈরি একটি বাড়ি। সেই বাড়ি গড়ে উঠেছিল ইতিহাস তৈরি করার জন্য। সেই বাড়ি নির্মাণ করেছিল বাাঙলি জাতির চেতনা। আর সেই বাড়ির ইট—সিমেন্টে মাখা ছিল রক্ত। পরে সেই রক্তের ঋণে তৈরি হয় একটি নৈর্ব্যক্তিক ও অনাবিল মিউজিয়ম। আর যারা ভাবে সেই বাড়ি গুড়িয়ে দিলেই বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে তা মুছে যাবে, তাদের মস্তিষ্কের মূল জায়গায় কিছু ঘাটতি আছে।

অবশ্য এই কথা তাদের বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। এরা বুঝতে পারল বঙ্গবন্ধুকে এইভাবে মুছে ফেলা সম্ভব নয়, তখন ‘সাড়ে তিন বছর শাসনকালে তিনি প্রচন্ড অত্যাচারী শাসক ছিলেন, তিনি দেশটাকে ধ্বংস করে দেয়ার এবং ভারতের হাতে তুলে দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন বলেই তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়’ ইত্যাদি বলে তাকে হেয় করার অপচেষ্টা শুরু হল। তাতেও কি লাভ হয়েছে? অতএব সর্বশেষ অস্ত্র হলো ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে ভাঙার ষড়যন্ত্রের জন্য বঙ্গবন্ধু ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র’তে নিয়োগপ্রাপ্ত হন বলে অপপ্রচার।

প্রকৃত সত্য হলো ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়রি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র প্রায় সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য যা যা করেছিলেন গত ৫১ বছরে কেউ কি সমপর্যায়ের কিছু করতে পেরেছেন? তিনি ভারতীয় সৈন্যকে মাত্র ২ মাসে বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রত্যাহার করিয়েছিলেন, মাত্র ৯ মাসে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, জোটনিরপেক্ষ দেশসমূহের জোট এবং অর্গনাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স বা ওআইসির সদস্যপদ আদায় করেছিলেন। ১২৫টিরও বেশি দেশের স্বীকৃতি এনেছিলেন। পাকিস্তানের ধ্বংস করে যাওয়া অর্থনীতিকে শূন্য থেকে গড়ে তুলেছিলেন, প্রতিটি কলকারখানা চালু করেছিলেন, প্রতিটি জলবন্দর থেকে পাকিস্তানের পেতে রাখা মাইন অপসারণ করেছিলেন। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিনামূল্যে চিকিৎসার্থে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল গড়ে তুলেছিলেন। পরিত্যক্ত ভবনগুলোকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের হাতে তুলে দেন। বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন করেন। ন্যায্যমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির জন্য টিসিবি চালু করেন। চোরাচালানি রোধ করেন।

বঙ্গবন্ধু কোনোদিনই প্রো—ইন্ডিয়ান রাজনীতি করেননি। কারণ তার যে দুই রাজনৈতিক গুরু ছিলেন তারা কেউ প্রো—ইন্ডিয়ান ছিলেন না। একজন হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীর্, অপরজন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। বঙ্গবন্ধু যদি ভারতপন্থী হতেন, তাহলে লন্ডন থেকে ১০ জানুয়ারি (১৯৭২) দিল্লি বিমানবন্দরে নেমেই সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে এমন বোল্ড ভাষায় বলতে পারতেন না, আপনার সৈন্যবাহিনী কবে আমাদের দেশ থেকে প্রত্যাহার করবেন? বঙ্গবন্ধু ভারতপন্থী হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ১৯৭৪ সালে ঢাকায় লালগালিচা সংবর্ধনা দিতেন না। এবং ভারতকে না জানিয়ে লাহোরে যেতেন না ভারতের ওপর দিয়ে ওআইসিতে যোগ দিতে। এমন কি বঙ্গবন্ধু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সাথেও দেখা করতেন না হোয়াইট হাউজে। এই সব কিছুতেই ভারত খুশি ছিল না বলে পরে নানা লেখায় পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে যখন তার পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘কারো সাথে বৈরিতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুতা’ তখন অনেকেই অবাক হয়েছিল। তিনি সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং আমেরিকাকে পাশাপাশি রেখেছিলেন। যেমন ভারত ও পাকিস্তানকে।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য যারা বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করেন, তারা নিশ্চয় তখনকার বিশ্ব পরিস্থিতির কথা ভুলে গেছেন। ১৯৭৩ সালে ইসরাইল—আরব ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে ওপেক পেট্রোল রপ্তানি কমিয়ে দিলে বিশ্বজুড়ে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার আঘাত থেকে ইয়োরোপও রক্ষা পায়নি। আর এ সময় আমেরিকা ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর গমভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নেয়। একদিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশকে তিল তিল করে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা, অপরদিকে আরব, চীন ও আমেরিকার কূটচাল এই দেশটিকে দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দেয়। এ সময় দেশের ভেতরে নানা ছদ্মবেশে সরকারবিরোধী শক্তি চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকে বামপন্থী ও মধ্যপন্থীসহ আন্ডারগ্রাউন্ড সশস্ত্র দলগুলো। এত বছর পর বুঝতে অসুবিধা হয় না, এরা ছিল কারা? কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য? বঙ্গবন্ধুর সরকারের নমনীয় নীতিতে যারা সংবাদপত্র প্রকাশের ডিক্লারেশন নিয়েছিল, তারা সকলেই সংবাদপত্র প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করতে থাকে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেইসব সংবাদপত্রের অধিকাংশই আর চালানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি।

এখন যারা সর্বশেষ প্রপাগান্ডা হিসাবে সোশাল মিডিয়ায় বঙ্গবন্ধুকে ‘র’এর এজেন্ট বলছেন, তারা নিশ্চয় জানেন, ১৯৭১ এর মার্চে সংসদের অধিবেশন আকস্মিক স্থগিত করার পর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত স্বাধীনতা নিয়ে যেসব কর্মসূচী দিয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু সেখানে ভারত ছিল না। এমন কি আজো জানা যায়নি এই ২৫ দিনে কোনো ভারতীয় গোয়েন্দা বা কূটনীতিকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ হয়েছিল কিনা। বরং মার্চের ৩০ তারিখে মেহেরপুর সীমান্তে তাজউদ্দীনের উপস্থিতিও ছিল ভারতের সীমান্ত রক্ষীদের কাছে আকস্মিক ঘটনা। আরো একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য। তাহলো প্রবাসী মুজিবনগর সরকার কিন্তু ভারতের মাটিতে শপথ নেয়নি। তারা শপথ নিয়েছিল মেহেরপুরের আ¤্রকাননে। যা বাংলাদেশের অংশ।

হায়, অতীত বিস্মৃত জাতি।

Related Posts