বাংলাদেশের মানচিত্র নয়, আহত আজ প্রাণচিত্র || আনিস আহমেদ
আমাদের সেই প্রিয় পরিচিত বাংলাদেশ কি আজ আছে সেই বাংলাদেশেই? আমার খানিকটা বিস্ময়, খানিকটা জিজ্ঞাসা দেখে হয়তো অনেকেই হতবাক হবেন, ভাববেন এসব কী বলছি আমি! আমার কি মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটেছে? না, আমি মানচিত্র বদলের কথা বলছি না, মানচিত্রের মাপকাঠিতে বাংলাদেশ তার পুরনো আকৃতিতেই আছে। এ আকৃতি তো বহুদিনের। সেই যে একাত্তরে আমরা যে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের মানচিত্র পেয়েছিলাম, সেটি অক্ষত রয়েছে। আমার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের মানচিত্র নয়, প্রাণচিত্র। কাগজে আঁকা সেই মানচিত্রটি অটুট আছে বটে কিন্তু যার অন্তরালে রয়েছে যে চিত্র, যাকে আমি প্রাণচিত্র বলছি, সেই চিত্র খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সেই চিত্রটিকে প্রাণবন্ত করে তোলার চেষ্টা করছেন অনেকেই। বিশেষত যাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে কথিত ‘৩৬শে জুলাই’য়ের পরিবর্তনে বাংলাদেশের সেই প্রাণচিত্রকে মুছে ফেলে দেয়া হয়েছে, তাঁরা সামাজিক মাধ্যমে এবং বিদেশের সংবাদপত্রে সোচ্চার কন্ঠে সেই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখার জোর আহ্বান জানাচ্ছেন। বিদেশের সংবাদপত্রের কথা বলছি, এ কারণে যে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে বাংলাদেশের প্রাণচিত্রের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না আমরা। সেখানে মাঝে মাঝে মানচিত্রের কথা আসে বটে, কখনও কখনও এমন অপপ্রচারও চালানো হয় যে ভারত বুঝি আমাদের মানচিত্রে থাবা দিচ্ছে। কিন্তু পাকিস্তান যে গোপনে গোপনে আমাদের প্রাণচিত্রে হানা দিয়েছে সে কথা আমরা অনেকেই বুঝতে পারি না। ২০২৪ সালের ইংরেজি পঞ্জিকায় ৩৬শে জুলাইয়ের অভ্যুদয় নিজেদের স্বার্থে প্রচলিত ক্যালেন্ডারকেও পাল্টে দেয়ার এক হাস্যকর প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিল বিভেদে বিভ্রান্ত একদল তরুণ। তাদের মধ্যে কিছু তরুণ হয়ত দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অবসান চাইছিল। কিন্তু গোটা আন্দোলনটির পেছনে ছিল পাকিস্তানের মদদপুষ্ট সেই গোষ্ঠীটি যারা বার বার বাংলাদেশের মানচিত্র মুছতে পারেনি, কিন্তু প্রাণচিত্রে বসাতে চেয়েছে ভিন্ন এক ছবি, যে ছবিতে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল পাকিস্তান ভাঙার এক ভারতীয় ষড়যন্ত্র এবং তাদের কথায় সেই ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত ছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সম্প্রতি ইউটিউবে দেখলাম ‘ইন্ডিয়া’স সিক্রেট মাস্টারপ্ল্যান বাহাইন্ড ১৯৭১ ওয়ার’ শীর্ষক ইকবাল চাঁদ মালহোত্রা এবং সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের কিছু বক্তব্য। সেখানে এই দু’জন বলার চেষ্টা করেছেন যে ১৯৬১ সাল থেকে ভারতের এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তাদের কথায়, “শেখ মুজিব যুক্ত ছিলেন” যাতে পাকিস্তান ভাঙা হয় এবং একাত্তরের যুদ্ধে তা বাস্তবায়িত হয়। এই কথিত ‘ইতিহাসবিদ’দের মাথায় এই কথা এলো না কেন যে ১৯৬৫ সালে পাক—ভারত যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানকে খন্ডিত করার এই ‘নীল নকশা’ কেন বাস্তবায়ন করা হলো না। সেই সময়ে তো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ভারত তখন পূর্বাঞ্চলে কার্যত কোনো যুদ্ধই চালায়নি। পাকিস্তানকে ভাঙার এই মাস্টারপ্ল্যান যদি ১৯৬১ সালেই ভারত করে থাকে তাহলে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময়ে ভারত কেন এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় ছিলো? মনে রাখা প্রয়োজন যে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর, বঙ্গবন্ধুই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দাবি তুলেছিলেন। আসলে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়ে পাকিস্তানের অপপ্রচারেরই একটি প্রতিধ্বনি যেন আমরা শুনলাম ভারতীয় এই কথিত ইতিহাসবিদদের বক্তব্যে। বস্তুত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণেই পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে, পাকিস্তানের খন্ডিত হওয়া বলে দেখে আর ভারত যে জয়ী হয়েছে সে কথা উচ্চকন্ঠে প্রচার করার জন্য কিছু ভারতীয়ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে কেবল মাত্র পাক—ভারত যুদ্ধ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে। পাকিস্তানের একটি বিশাল গোষ্ঠী এখনও স্বীকার করে না যে তারা ১৯৭১ সালে ভারতের ও বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, মূলত বাঙালিদের দুর্বল প্রমাণ করার জন্য আর কিছু ভারতীয়ও সে কৃতিত্ব নিতে চায়। কিন্তু পাকিস্তানিরা যে যৌথ বাহিনীর কাছে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করে তার দালিলিক প্রমাণ আছে।
আসলে কিছু মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খাটো করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের মানুষ যখন জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে সামাজিক মাধ্যম শোক বার্তায় ভরিয়ে দিয়েছে তখন এই দিনটি পালন করতে বাংলাদেশ সরকার কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। তারেক রহমান এবং তাঁর সরকারের সবাই মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন যেন ৩ নভেম্বর কোনো ঘটনাই ঘটেনি। এই সরকার ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে ১৯৭৫ সালের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হয়েছিলো। যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার সাথে জড়িতদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। এই অভ্যুত্থানে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ক্ষমতা গ্রহণ ও রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ সুগম হয়। এই ঘটনা বিএনপি সরকারর জন্য নিশ্চয়ই আনন্দের দিন। কিন্তু এই দিনে বস্তুত ক্ষমতার শীর্ষে এসেও জিয়াউর রহমান স্মরণ করেননি মাত্র কয়েক মাস আগে নিহত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের। বরঞ্চ খালেদ মুশাররফের সংক্ষিপ্ত সময়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম বারের মতো বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে দোয়া ও মিলাদ মহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। জাসদের কর্ণেল তাহেরের সহযোগিতায় খালেদ মুশাররফকে সরিয়ে জিয়া ক্ষমতায় আসলেন বটে, তবে অচিরেই কর্ণেল তাহেরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হলো। খন্দকার মুশতাককে অপসারণ করলেন বটে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের পুরস্কৃত করা হলো। বাংলাদেশের প্রাণচিত্রে সেই প্রথম আঘাত এলো এবং আজ তাই যখন শুনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চার শহীদ নেতার স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান করতে দেয়নি তারেক রহমান সরকার, তখনই বুঝতে পারি আমাদের প্রাণচিত্রে এ যেন সেই আঘাতের পুনরাবৃত্তি যা জাতি দেখেছিল ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। মুজিব নগরের প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, দু’জন মন্ত্রী এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে মুশতাকের সরাসরি নির্দেশে কারাগারের ভেতরে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার মতো ঘাতক মুশতাকের সরকারে যোগ দেননি। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমৃত্যু বিশ্বস্ত এই নেতাদের প্রতি যারা সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ব্যর্থ হন, তারা বস্তুত বাঙালির প্রাণচিত্রের ওপর নির্মম আঘাত হানেন।
তাইতো বলি, বাংলাদেশের মানচিত্র এখনও অক্ষত আছে বৈকি, কিন্তু প্রাণচিত্রে তো মুহূমুর্হূ আঘাত পড়ছে।
