এআইএর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে? || ড. জীবন বিশ্বাস
সভ্যতার ইতিহাসে প্রযুক্তির উত্থান বারবার ক্ষমতার বিন্যাস বদলে দিয়েছে। শিল্পবিপ্লব শ্রম ও উৎপাদনের সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছে। পারমাণবিক প্রযুক্তি মানবসভ্যতার অস্তিত্বকেই বিপন্ন করার আশংকা সৃষ্টি করেছে, আর ইন্টারনেট যোগাযোগের বিপ্লব ঘটিয়েও নজরদারির অভূতপূর্ব দরোজা উন্মুক্ত করেছে। আর এআই আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে, যেখানে জ্ঞান, কর্মসংস্থান, সৃজনশীলতা, রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা একই সঙ্গে পরিবর্তনের মুখোমুখি। কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটি, যন্ত্র কতখানি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে তা নয়। বরং প্রশ্নটি হচ্ছে, এই প্রযুক্তির ক্ষমতা কার হাতে কেন্দ্রীভূত হবে এবং তার পরিণতি কে নিয়ন্ত্রণ করবে। এ প্রসঙ্গ নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং ভারতীয় ঔপন্যাসিক, রাজনৈতিক প্রাবন্ধিক ও একটিভিস্ট অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি এই সংকটকে দুটি ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। ওবামার উদ্বেগ প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। অন্যদিকে অরুন্ধতী রায় প্রশ্ন তুলেছেন পুঁজিবাদ, করপোরেট মালিকানা, সাংস্কৃতিক অধিকার হরণ এবং মানবিক সৃজনশীলতার পণ্যায়ন নিয়ে। তাঁদের চিন্তার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ; তবে দুজনের বক্তব্যেই প্রতিফলিত হয়েছে একটি অভিন্ন আশঙ্কাÑজনগণের কাছে জবাবদিহিতাহীন প্রযুক্তিগত ক্ষমতা সমাজের বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কোলগেট ইউনিভার্সিটিতে এক আলোচনায় ওবামা সতর্ক করেন, এআই’র সক্ষমতা যে গতিতে বাড়ছে, সেই অনুপাতে এর পরিণতি নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি গড়ে উঠছে না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার মূল্যায়ন অতিরঞ্জিত হতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তিটির মৌলিক সম্ভাবনাকে তিনি সাময়িক উন্মাদনা হিসেবে দেখেন না। তাঁর আশঙ্কা, উন্নত এআই ব্যবস্থা মানুষের নির্ধারিত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে; আবার অসৎ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এগুলো ব্যবহার করতে পারে সাইবার আক্রমণ, প্রতারণা কিংবা বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডে।
ওবামার যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই এর বিপদ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান, অথচ মুনাফার প্রতিযোগিতা তাদের সতর্কতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই তিনি মনে করেন, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত করপোরেট অঙ্গীকার জনস্বার্থ রক্ষার নিশ্চয়তা নয়। বিমান পরিবহন কিংবা ওষুধশিল্পের মতো এআই’র ক্ষেত্রেও প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় বিধিনিয়ন্ত্রণ। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেইÑপ্রযুক্তির অগ্রগতি শুধু বাজারের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, জনগণের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার বিষয়ও।
অরুন্ধতী রায়ের সমালোচনা আরও মৌলিক। ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত অঢ়ড়পধষুঢ়ংব ঘড়ি ধহফ ঞযবহ প্রবন্ধে তিনি এআইকে অভিহিত করেছেন ‘পুঁজিবাদের চূড়ান্ত গন্তব্য’ হিসেবে। তাঁর মতে, মানবসভ্যতার দীর্ঘদিনের সম্মিলিত জ্ঞান, ভাষা ও সৃজনশীলতাকে অল্প কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদে পরিণত করার প্রক্রিয়া চলছে। ১৯ অক্টোবর নিউইয়র্কের ‘পিপলস এআই অ্যাসেম্বলি’তে আলোচনার জন্যও তাঁর প্রবন্ধের অংশ নির্ধারিত ছিল।
লেখক হিসেবে রায়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর সমালোচনাকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। নিজের বই অনুমতি ছাড়া এআই’র প্রশিক্ষণে ব্যবহারের অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি একে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অজান্তে তুলে নেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই রূপক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়; বরং সৃজনশীল শ্রমের ওপর অধিকার হারানোর গভীর অনুভূতির প্রকাশ। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে: লেখক, শিল্পী ও সংগীতস্রষ্টাদের সম্মতি এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক ছাড়া তাঁদের সৃষ্টিকর্ম থেকে করপোরেশনগুলো কতখানি বাণিজ্যিক সুবিধা নিতে পারে?
রায়ের উদ্বেগ শুধু সাহিত্য কিংবা সত্ত্বাধিকারে সীমাবদ্ধ নয়। এআই’র পেছনে রয়েছে বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী তথ্যকেন্দ্র, খনিজ সম্পদ আহরণ, ব্যয়বহুল অবকাঠামো এবং প্রায় অদৃশ্য মানবশ্রম। উন্নয়নশীল দেশের অসংখ্য কর্মী তথ্য চিহ্নিতকরণ ও ক্ষতিকর বিষয়বস্তু বাছাইয়ের মতো শ্রমসাধ্য কাজে যুক্ত থাকলেও প্রযুক্তির সৃষ্ট সম্পদের ন্যায্য অংশ তাঁরা কতটা পাচ্ছেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। রায়ের কাছে এটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ও মানবিক মর্যাদার সংকট।
এই জায়গাতেই ওবামা ও রায়ের চিন্তা পরস্পরকে স্পর্শ করে। ওবামা বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রযুক্তির গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান; রায় প্রশ্ন তুলছেন সেই কাঠামোর নৈতিক বৈধতা নিয়েই। একজন নিরাপদ ও দায়িত্বশীল প্রযুক্তির সম্ভাবনা দেখছেন, অন্যজন প্রযুক্তিটির মালিকানা ও মুনাফা বণ্টনের ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
বাস্তব পরিসংখ্যানও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ দেখায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৪ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান এআই’র প্রভাবে আসতে পারে; উন্নত অর্থনীতিতে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের গবেষণায় বিশ্বের প্রায় এক—চতুর্থাংশ কর্মসংস্থানের ওপর সৃজনক্ষম এআই’র সম্ভাব্য প্রভাব চিহ্নিত হয়েছে। তবে উভয় গবেষণার মূল তাৎপর্য চাকরি বিলুপ্তির নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়; বরং কাজের প্রকৃতি, দক্ষতার চাহিদা ও শ্রমবাজারের পরিবর্তন।
আইন, হিসাবরক্ষণ, সাংবাদিকতা, শিক্ষা ও সফটওয়্যার নির্মাণের বহু কাজ স্বয়ংক্রিয় হতে পারে। কিন্তু একটি পেশার কিছু দায়িত্ব যন্ত্র সম্পন্ন করতে পারা এবং সম্পূর্ণ পেশাটি বিলুপ্ত হওয়া এক বিষয় নয়। উৎপাদনশীলতা বাড়লেও তার সুফল শ্রমিকের কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটি নির্ভর করবে মজুরি, মালিকানা ও দরকষাকষির ক্ষমতার ওপর।
প্রযুক্তিগত আশংকার ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ও অনুমানের পার্থক্য জরুরি। বর্তমান এআই ভাষা, চিত্র ও সফটওয়্যার তৈরি করতে পারে; উন্নত কার্যসম্পাদনকারী ব্যবস্থা একাধিক ধাপে জটিল কাজও সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু এসব সক্ষমতা স্বাধীনভাবে আত্মোন্নয়নশীল অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না। অন্যদিকে প্রতারণা, বিভ্রান্তিকর সংবাদ, গোপনীয়তা লংঘন এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি ইতোমধ্যে বাস্তব প্রমাণিত হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে এআই সংশ্লিষ্ট ৩৬২টি নথিভুক্ত ক্ষতিকর ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, আগের বছর যা ছিল ২৩৩টি।
তবে প্রযুক্তিটির ইতিবাচক সম্ভাবনাও অনস্বীকার্য। চিকিৎসাবিজ্ঞান, ওষুধ উদ্ভাবন, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভাষাগত ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নতুন মানুষের সৃজনশীল অংশগ্রহণও সম্ভব। তাই সমাধান প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা নয়, আবার অন্ধভাবে গ্রহণ করাও নয়।
প্রয়োজন স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন, স্বচ্ছতা, লেখক—শিল্পীদের সত্ত্বাধিকার সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং কার্যকর গণতান্ত্রিক তদারকি। তবে বিধিনিয়ন্ত্রণের জটিলতা যেন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে বৃহৎ করপোরেশনের একচেটিয়া ক্ষমতাই প্রতিষ্ঠা না করে, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রযুক্তি মানুষের মুক্তি কিংবা বিপর্যয়ের চূড়ান্ত নির্ধারক নয়; সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোই তার সুফল ও ক্ষতির বণ্টন নির্ধারণ করে। ওবামা জানতে চাইছেন, মানুষ ক্রমবর্ধমান বুদ্ধিমান যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে কি না। রায় জানতে চাইছেন, সেই যন্ত্রের নির্মাতা ও মালিকদের ওপর মানুষ গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি না।
অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এআই অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এর জ্ঞান ও কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে চলেছে, সে দিক থেকে জরুরী সতর্কবার্তার সন্ধিক্ষণে এআই। তবে এআই’র সবচেয়ে গভীর বিপদ হয়তো যন্ত্রের ক্রমবর্ধমান মেধায় নয় বরং প্রযুক্তিগত ক্ষমতা অর্জনের চেয়েও দ্রুতগতিতে মানবসমাজ তার গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলতে পারেÑএই আশংকায় নিহিত। ভবিষ্যতের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তাই শুধু যন্ত্রকে মানুষের উদ্দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা নয়; অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে মানুষের মর্যাদা ও সামষ্টিক কল্যাণের অধীনস্থ করাও।
