অসমাপ্ত অধ্যায়— নিলোফার জাহান নিউইয়র্ক

এই তো কিছুক্ষণ আগে, টেক্সট মেসেজে তাসিনের শেষ প্রস্থানের যাবতীয় আয়োজনের সময়সূচিতে চোখ আটকে গেল। এমন নিখুঁতভাবে সবকিছু গুছিয়ে লেখা হয়েছে, যেন এটি বিপার কোনো অনুষ্ঠানের সময়সূচি। বিপার অনুষ্ঠান যে কখনো পাঁচ মিনিট দেরিতে শুরু হয় নাÑএ যেন গত ৩৪ বছরের এক অলিখিত, কঠিন নিয়ম। অথচ সেই বিপারই এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়সূচিতে এমন ভুল! প্রথমে মনে হলো, এত বড় ভুলের জন্য পুরো সময়সূচিটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলি। তারপর একটি কঠিন টেক্সট মেসেজ লিখে জানতে চাই, বিপার প্রতিটি অনুষ্ঠানের নিখুঁত আয়োজনের মধ্যে এমন ভুল কী করে রয়ে গেল? কী করে বিশ্বাস করব!

মাত্র একটি নক্ষত্রের পতনে যে পুরো পৃথিবীটা অন্ধকারে ঢেকে যেতে পারে, আজ যেন তা—ই উপলব্ধি করছি। কতটা বিষাদ, কতটা কষ্ট, কতটা যন্ত্রণা আর বেদনাÑকোন উপমায় এই অনুভূতিকে প্রকাশ করলে তার গভীরতা বোঝানো সম্ভব, তা আমার জানা নেই। শুধু মনে হয়, সবই যেন এক দুঃস্বপ্ন। ইচ্ছে হয়, এই দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠব আগামী রবিবার। বিপার তিনতলায় গিয়ে প্রমাণ করে দেব, সবই মিথ্যে। সবাইকে চিৎকার করে বলব, “এই যে দেখো, তাসিন কী একাগ্রতায় নাচ শেখাচ্ছে! কে বলে ও নেই? ওই তো আমাকে দেখে চিরাচরিত সেই মিষ্টি—মধুর কণ্ঠে ডেকে উঠল—‘হায় আন্টি, কেমন আছ?’”

তাসিনকে নিয়ে আমাকে কখনো লিখতে হবে, এমনটা ভাবিনি। ওকে নিয়ে তো শুধু এ কথাই লেখা যায়Ñও আমাদের উত্তরাধিকার। যাকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন তার মা। আর আমরা পরম নিশ্চিন্তে ভেবেছি, তাসিন হবে তার মায়ের সেই যোগ্য উত্তরসূরি, যার হাত ধরে বিপা আরও বহু যুগ পথ পাড়ি দেবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে থাকবে তার তীক্ষè নজর। টেক্সট মেসেজ আর ইমেইলে প্রতিদিন জানাবে যাবতীয় নির্দেশনা, পরিকল্পনা ও আগামীর পথচলার নতুন নতুন বার্তাÑঠিক তার মায়ের মতো। আর আমরা আমাদের বৃদ্ধ বয়সে ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তি নিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে, কিংবা দূর আকাশ থেকে তাকিয়ে বলব, “পারলি মা! কথা রেখেছিস। আমাদের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে গেছিস?”

কথা ছিল, আমাদের সেই ঊনবিংশ শতকের পুরনো ভাবনার গণ্ডি পেরিয়ে তোমার হাত ধরে আমরা পৌঁছে যাব এক নতুন চিন্তার জগতে। তোমার আধুনিক ভাবনা, চিন্তা—চেতনা ও উৎকর্ষের স্পর্শে আমাদের পুরনো ধারণাগুলো আরও শাণিত হবে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ধারণা যুক্ত হবে, বিপার কাজ পাবে নতুন মাত্রা, আর আমাদের পথচলা হবে আরও সমৃদ্ধ। সেটাই তো কথা ছিল। সেটাই তো ছিল আমাদের ধ্রুব বিশ্বাস। কিন্তু তুমি কথা রাখোনি, তাসিন!

কোনো দিন কোনো দুষ্টুমি করোনি, এমনকি এমন কোনো কাজও করোনি, যা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা করতে হয়েছে। এত শান্ত, সভ্য, বিনয়ী, নম্র, ভদ্রÑসব গুণের আধার যে মেয়েটি, সে কী করে তার তিন মাকে এত কষ্ট দিল? আজ তোমাকে ‘দুষ্টু’ বলতে বাধ্য হচ্ছি। কী কঠিন দুষ্টুমিই না তুমি করে বসেছ! এমন দুষ্টুমি তো কোনো সন্তান তার মা—বাবার সঙ্গে করতে পারে না। কী করে মা—বাবার চোখের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাও? এ যে বড় অন্যায়, মা!

তোমার তিন মায়ের এত আদরের মেয়েটি, তুমি কী করে এভাবে ঝরে পড়লে? তোমাকে নিয়ে আমাদের কত অহংকার ছিল! আমার মেয়েটি, ও—ই বেস্ট ডটারÑওর বেস্ট সোল। জীবনের কিছু বিশেষ মুহূর্তে ও আমার মেয়ের পাশে কখনো বন্ধুর মতো, কখনো বোনের মতো দাঁড়িয়েছে। আমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে সেদিন ও যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছিল, তা আজও আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আজ সেই বোন, সেই বন্ধু হারানোর কান্না যে কিছুতেই থামছে না আমার মেয়ের। শুধু আমার মেয়েই নয়, কাঁদছে পুরো বিপা। কাঁদছে তাসিনের একান্ত কাছের শিক্ষার্থীরা। ওদের পক্ষে স্কুলে যাওয়াও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এ তুমি কী করলে, মা!

প্রায় ২৮—২৯ বছরের সম্পর্ক আমাদের। এই দীর্ঘ সময়ের স্মৃতির ভান্ডারে এত কিছু জমা হয়ে আছে যে, সেসব একত্র করলে অনায়াসেই একটি বই লেখা যায়। ছোটবেলায় মাঝেমধ্যে তাসিনকে আমার বাসায় রাখা হতো। পরে শুনেছি, ও নাকি মাকে বলত, “মা, আমাকে নিলু আন্টির বাড়িতে রেখো না।” কারণটা শুনে আজও মনে পড়লে হাসি পায়Ñআমি জোর করে ওকে খেতে দিতাম! ও তো কাউকে ‘না’ বলতেই শেখেনি। আর আমি হয়তো ওর সেই না—বলতে—পারা স্বভাবটুকু বুঝেও বুঝতাম না।

মনে পড়ে, ওর বাবার অসীম ভালোবাসার কথা। ব্রুকলিনে আমার সাড়ে আট বছরের অবস্থানকালে বাবার প্রতি তাঁর সেই গভীর স্নেহ ও ভালোবাসার দৃশ্য আমাকে বারবার অভিভূত করত। দীর্ঘ বহু বছর নিজের বাবাকে না—দেখার যে বেদনা আমার ভেতরে ছিল, সেই দৃশ্যগুলো যেন আমাকে আমার বাবার স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। আজ ভাবি, মেয়েটি কী করে নিজেকে বাবার সেই অপরিসীম ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করতে পারল!

ময়ূরের মতো নানা রঙের পেখম মেলে ধরা সেই নৃত্যপটীয়সী মেয়েটি আমার কাছে ছিল এক বিস্ময়ের নাম। ফ্লাশিংয়ের একটি মন্দিরে ওর ভরতনাট্যমের ক্লাসে ওর মায়ের সঙ্গে প্রায় নিয়মিতই যেতাম, ক্লাস শেষে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসতে। তখন আমি থাকতাম ব্রুকলিনে। বিস্ময়ভরা চোখে দেখতাম ওর নাচ, ওর অভিব্যক্তি, আর এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা। এত অল্প বয়সে এমন একাগ্রতা, এমন নিষ্ঠাÑআমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতো।

তারপর একদিন এলো ওর জীবনের বিশেষ একক নৃত্যানুষ্ঠান—‘আরঙ্গেত্রম’। সেদিন আমি যেমন শিহরিত হয়েছিলাম, তেমনি মুগ্ধ হয়েছিলেন উপস্থিত সবাই। সেই থেকেই আমাদের সবার একটাই তাড়াÑকবে তাসিন বিপার শিক্ষক হবে! আজ একজন অভিভাবকের অভিব্যক্তি পড়ে মনটা আরও ভারী হয়ে এলো। তিনি লিখেছেন— “ইওচঅ—তে ক্লাসের জন্য সন্তানদের নিয়ে যাওয়ার সময় তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে করতে তাসিনের ভরতনাট্যম নাচের ছন্দ ও ধ্বনি হৃদয়ে এক অপূর্ব স্পন্দন জাগাত। মুগ্ধ হয়ে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর নাচ দেখতাম”। সেই অভিভাবকই শুধু নন, মুগ্ধ হয়েছিল তাঁর ছোট্ট মেয়েটিও। তাসিন ছিল তার নৃত্যগুরু। শুধু তারই নয়, আরও অনেক শিক্ষার্থীর নৃত্যগুরু ছিল তাসিন। ওর নাচের ছন্দ, ওর একাগ্রতা, ওর শেখানোর ভঙ্গিÑকত মানুষের হৃদয়ে যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিল, তা হয়তো ও নিজেও জানত না।

তাসিন, তুমি তো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, তোমার শিক্ষার্থীদের নৃত্যশিক্ষার এই পথ সম্পূর্ণ করবে। তাদের হাতে তুলে দেবে তোমার অর্জিত জ্ঞান, তোমার সাধনা, তোমার ভালোবাসা। তাদের নাচের প্রতিটি ছন্দে, প্রতিটি মুদ্রায় তুমি বেঁচে থাকবেÑএমনটাই তো ছিল আমাদের বিশ্বাস। তাহলে, মা, কী করে এত কিছু অসম্পূর্ণ রেখে তুমি চলে গেলে? কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা, কত প্রতিশ্রুতি, কত মানুষের ভালোবাসাÑসবকিছু এভাবে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কী করে চলে গেলে?

আজ তোমাকে নিয়ে লিখতে বসে বুঝতে পারছি, কিছু বিদায় কখনো মেনে নেওয়া যায় না। কিছু শূন্যতা কোনো ভাষায় পূরণ করা যায় না। আর কিছু অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়ে গেলেও, সেগুলোর গল্প শেষ হয় না। তুমি নেইÑএই সত্য মেনে নেওয়া কঠিন। তবু তোমার শেখানো নাচের ছন্দে, তোমার শিক্ষার্থীদের পদচারণায়, বিপার প্রতিটি কাজে, তোমার মায়ের গড়ে তোলা স্বপ্নের প্রতিটি স্তরে তুমি থেকে যাবে।

তোমার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তোমার নিজের হাতে যে ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠার কথা ছিল, যে স্বপ্নের পূর্ণতা দেখার কথা ছিল আমাদের, সেই অপূর্ণতার বেদনা কী করে মুছে ফেলব, মা? তাসিন, তুমি আমাদের স্বপ্নের উত্তরাধিকার ছিলে। তুমি আমাদের আগামী দিনের প্রতিশ্রুতি ছিলে। অথচ আজ তুমি নিজেই হয়ে গেলে আমাদের জীবনের এক অসমাপ্ত অধ্যায়।

Related Posts