রূপকথার মানুষ মৃদুল আহমেদ নিউইয়র্ক

 (ভূমিকা: তাসিনের জন্মদিন ২৮ জুন। 

২০২২ সালে ওর জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলাম সাপ্তাহিক বাঙালীতে। তখন কি ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিলাম মৃত্যুর দিনটি নিয়েও লিখতে হবে?

সেই পুরনো লেখাটিই এবার নতুন করে দিলাম বাঙালীতে। এই লেখাটায় তাসিনের গুণপনা, ওর শিল্পচর্চা, ওর পরিবেশনা নিয়ে প্রথম দর্শনের মুগ্ধতার গল্পটাও ছিল।

জন্মদিনের লেখা দিয়েই ওকে স্মরণ করলাম। তাসিন তো এখন আমাদের প্রতিদিনের অজস্র দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে বার বার নতুন করে জন্মায়।) 

রূপকথার রাজপুত্রের সাথে কখনো কি আমাদের দেখা হয়? 

আমার একবার দেখা হয়েছিল।

তাও এখানে ওখানে নয়, খোদ নিউইয়র্কের মাটিতে!

তখন দু’হাজার চোদ্দ কি পনেরো। টিকিট কেটে দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে গেছি তাসের দেশ দেখতে।

তাসের দেশ বিপার একটি প্রযোজনা।

মনে মনে ইচ্ছেটা ছিল এমন, মেয়েরা এখানকার বাঙালি পরিবেশনা দেখুক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সাথে নতুন করে পরিচিত হোক। বাবা—মায়ের চাপে নয়, মুগ্ধতার আবেশেই ওরা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হোক।

আমার উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই তাসের দেশের কী অপূর্ব পরিবেশনাই না দেখেছিলাম সেদিন!

বিশাল বিশাল সব মুখোশ আর তার সাথে অপরূপ সাজসজ্জা। তার সাথে নৃত্যের ছন্দময় চমৎকারিত্ব।

আমার মেয়েরা তখন অনেক ছোট ছোট। টলটলে চোখ মেলে সেই পরিবেশনা দেখছিল তারা। তাদের চোখেমুখে মুগ্ধতাই দেখেছিলাম সেদিন।

সে যাই হোক, সেই পরিবেশনায় আমিও মুগ্ধ হয়েছিলাম। সবচেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম রাজপুত্রকে দেখে।

সেই রাজপুত্রের প্রতিটি চাহনি, ছন্দবদ্ধ পদক্ষেপ, নাচের প্রতিটি মুদ্রা এত লালিত্যময় মনে হয়েছিল!

অবাক হয়ে ভাবছিলাম এই বাচ্চা ছেলেটা কে? ঠিক যেন রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা এক রাজপুত্র। তেমনই কোমল রসে ভরা মুখটা, তার মধ্যে রোমাঞ্চ, ভালোবাসা, আনন্দ, উৎসব, হৃদয়বত্তা, জীবনের সবকটা উপাদানই উপস্থিত। 

অনুষ্ঠান শেষ হল। দর্শকরা বেরিয়ে পড়েছে হল থেকে। নৃত্যের কুশীলবরাও বেরিয়ে এসেছে বাইরে। পরিবার পরিজন বন্ধুদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় চলছে। 

সেই রাজপুত্রটিকে অনেক খুঁজলাম কিন্তু পাওয়া গেল না।

তারপর হল থেকে বেরিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হলাম আমরা।

সেদিন দেখা না পেয়ে চলে এলাম। কিন্তু সেই রাজপুত্রটিকে আমি আর ভুলিনি। 

মনে মনে ভেবেছি নিশ্চয়ই কোনো না কোনো একদিন দেখা হবে। অন্য কোনো আয়োজনে।

কিন্তু তার সাথে আর দেখাই হয় না!

রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে কোনো অদৃশ্য জাদুবলে যে বেরিয়ে এসেছিল, আবার সেই অদৃশ্য জাদুবলেই সে যেন বইয়ের ভেতরেই ফেরত চলে গেল!

এরপর আস্তে আস্তে বিপা সংগঠনটির সাথে পরিচয় হল। সম্পর্ক তৈরি হল।

একদিন কথায় কথায় কাকে যেন জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আপনাদের একটি পরিবেশনা ছিল না, তাসের দেশ?

হ্যাঁ ছিল তো!

ওই আয়োজনটা আপনারা নতুন করে আর করেন না কেন?

ওঃ ওটা অনেক বড় আয়োজন তো! সময় দিতে হয়, লোকবল লাগে!

তা তো ঠিকই। আচ্ছা ঐ যে রাজপুত্রের ভূমিকায় যে ছেলেটি ছিল, ও কে? ওকে আর দেখি না কেন?

রাজপুত্র ভূমিকায়? আরে ও তো তাসিন!

তাসিন? এই নামের কোনো ছেলেকে তো আমি দেখিনি নাচ করতে?

আমার কথা বলার সঙ্গী হো হো করে হেসে উঠলেন। আরে ঐ রাজপুত্র কোনো ছেলে ছিল নাকি? ও তো তাসিন! আমাদের তাসিন ফেরদৌস! 

তখনই তাসিনের দিকে আমি চোখ ঘুরিয়ে তাকালাম। ও তখন বাচ্চাদের নাচ শেখাচ্ছিল। 

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আসলেই তো, চেহারার আদল তো মিলে যাচ্ছে। কিন্তু কে বলবে, এই মানুষই সেই মানুষ? 

পারফরমেন্সের পারফেকশন মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, সেদিনই আমি আরেকবার নতুন করে আবিষ্কার করলাম।

তাসিনের সাথে আমার কতবার দেখা হয়েছে। কতবার কথাও বলেছি। কখনো ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি, এই সেই রাজপুত্র।

সেদিনের সেই পরিবেশনায় তার সমস্তটার মধ্যে যে ব্যক্তিত্বকে সে ধারণ করেছিল, প্রতিদিনের জীবন থেকে তা বহু ওপরে।

তাসিনকে নিয়ে সেই আমার মুগ্ধতার শুরু। আস্তে আস্তে ওর সম্পর্কে আরো জেনেছি। নাচ নিয়ে তার সংগ্রাম, তার পড়াশোনা, তার উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার খবরও পেয়েছি।

মাঝেমধ্যেই রাস্তায় ওর সঙ্গে দেখা হয়েছে। ও চুপচাপ একা হেঁটে হেঁটে স্কুলের দিকে আসছে। নাচের ক্লাসের হাসিখুশি তাসিনের থেকে ঐ চুপচাপ হেঁটে আসা উদাস মুখের তাসিনকেও মনে হয়েছে অন্য জগতের মানুষ।

ও কী কী যেন ভাবে। আকাশ থেকে কাদের সব ছবি যেন কুড়িয়ে নেয়। 

পৌষের পাতা—ঝরা তপোবনে/ আজি কী কারণে/ টলিয়া পড়িল আসি বসন্তের মাতাল বাতাস/

নাই লজ্জা, নাই ত্রাস/ আকাশে ছড়ায় উচ্চহাস/ 

চঞ্চলিয়া শীতের প্রহর/ শিশির—মন্থর।

বসন্তের সেই মাতাল বাতাসকেও যেন দেখেছি তাসিনের পিছু পিছু হাঁটতে।

ওর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, সে এক অন্য জগতের মানুষ। শিল্পের তুষারাবৃত পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে সূর্যের আলো ঝিকিমিকি করে স্ফটিকের মতো জ্বলে ওঠে, সেখানে ওর বসবাস।

প্রতিদিনের জীবনে ও প্রতিদিনের মানুষের মতো করেই মেশে। শুধু যখন নাচের পরিবেশনায় ও মঞ্চে ওঠে, তখন সে আর আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত তাসিন থাকে না। তখন সে হয়ে ওঠে সেই অন্য উচ্চতর জগতের মানুষ। আমাদের অনুভবকে নিয়ে যায় মুগ্ধতার শিখরে।

তাসিন ভবিষ্যতে আরো অনেক বড় বড় কাজ করবে।

আমি মুগ্ধতা নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।

শুভ জন্মদিন তাসিন। তোমার মঙ্গল হোক। 

Related Posts