সারাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব

ঢাকা থেকেঃ সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে হিন্দু স¤প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজামন্ডপকেন্দি্রক নিরাপত্তা জোরদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা এবং প্রশাসনের নজরদারিতে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসব। বড় ধরনের কোনো সা¤প্রদায়িক সহিংসতা ছাড়াই উৎসব সম্পন্ন হওয়াকে সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পাঁচ দিনের মূল পূজার আনুষ্ঠানিকতা চলে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মন্ডপে পূজা, অঞ্জলি, আরতি, দর্শনার্থীদের সমাগম এবং প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে ছিল উৎসবের আমেজ। এবারের পূজাকে নির্বিঘ্ন রাখতে উৎসব শুরুর আগেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। পুলিশ, বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিজিবি, আনসার—ভিডিপি ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সরকারের এ প্রস্তুতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল পূজামন্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো ঠেকানো এবং প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। উৎসবের সময় এসব ক্ষেত্রে নজরদারি জোরদার করা হয়। ফলে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে। এবারের পূজা সফলভাবে সম্পন্ন করতে তিন লক্ষাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ৩৪ স্থানে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর এবং মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করে। ওইসব ঘটনার তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ঘটনায় নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অভ্যাসগত চোর কর্তৃক মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি, সরকারি বরাদ্দ বণ্টন নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব, মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি কর্তৃক প্রতিমা ভাঙচুরের বিষয় উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি ক্ষুন্নকরণ, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং আনন্দঘন পরিবেশে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন করতে না দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহকারী পরিচালক (গণসংযোগ কর্মকর্তা) নাজমুস সাকিব স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুর্গাপূজাকেন্দি্রক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ১৩১ ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধমূলক ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিমা ভাঙার চেষ্টাসহ ভাঙচুর প্রতিরোধের ২০টি, বিবদমান সমস্যা সমাধানের ৩৬, অগ্নিসংযোগ প্রতিরোধের দুটি এবং মাদকসংক্রান্ত ১৩টি ঘটনার তথ্য রয়েছে। এ সময়ে ২৪টি পৃথক ঘটনায় ৪৯ জন দুষ্কৃতকারীকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ শিশুকে উদ্ধার এবং চুরির অপরাধে ছয়জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া ১৫ ঘটনায় মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধারসহ বিবিধ সমস্যাসংক্রান্ত ৯টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

গত কয়েক দিন ঢাকার বিভিন্ন পূজামন্ডপ ঘুরে বিভিন্ন দর্শনার্থী এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের দুর্গাপূজা সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। ঢাকা শহরসহ দেশের কোথাও কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেনি। এ জন্য হিন্দু স¤প্রদায়ের পক্ষ থেকে সরকারকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।

ঢাকার রমনা কালীমন্দিরে আসা দর্শনার্থী রাহুল দে বলেন, এবারের পূজা উদযাপনের পরিবেশটা একেবারেই অন্য রকম। কোনো ভয় ও শঙ্কা দেখিনি কারোর মধ্যে। আমার মুসলিম বন্ধুরাও পূজার অনুষ্ঠানে এসেছে, তারাও কোনো ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। প্রতিবার সরকার যেন আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব এমন সুন্দরভাবে ব্যবস্থা করে। সাধারণত অন্য যেকোনো বার একটু ভয় লাগে। এবার সারা দেশের শান্তিপূর্ণ অবস্থা দেখে খুবই ভালো লাগছে।

গত বুধবার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার আগ মুহূর্তে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সন্তোষ শর্মা বলেন, এবারের পূজায় বরাদ্দ এবং সরকারি ছুটি বেশি ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত মন্ডপে পূজার্চনা চলেছে। সাধারণ মানুষসহ দর্শনার্থীরা চলাফেরা করেছে;, তবে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সরকারের পক্ষ থেকে পূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক বাসুদেব ধর বলেন, এবার অত্যন্ত উৎসবের পরিবেশে দুর্গাপূজা পালন করা হয়েছে। সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। সব স¤প্রদায়ের মানুষ উৎসবে শামিল হয়েছে। আর প্রশাসন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। বর্তমান সরকার চেয়েছে, এবার অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে পূজা হোক, তাই হয়েছে। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর পরিশ্রম করে একেবারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিয়েছে। প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল ছিল। দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাই।

বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, দুর্গাপূজা চলাকালে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশের পাশাপাশি সোয়াত, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), ক্রাইম সিন ভ্যান এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত ছিল। পূজাকেন্দি্রক অনাকাঙ্খিত ঘটনা মোকাবিলায় জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়। এবারের দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রায় তিন লক্ষাধিক পুলিশ, আনসার ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে দুর্গাপূজা শেষ হওয়ায় সব স্টেকহোল্ডারের প্রতি কৃতজ্ঞ পুলিশ।

Related Posts