পাতা ঝরা দিনের কবিতা

তারার আর্তি

শামীম আজাদ


ঘুম ভেঙে দেখি সামনে এক অপার্থিব নৃতাত্ত্বিক রাত

শরৎ ও হেমন্তের ফুলগুলো তৃণমূল থেকে ফুটছে 

রাত্রির এমন মানবিক মুখ আমি আগে দেখি নাই

গগনে উর্ধে তারাদের যেন ক্যাসুয়াল কনফারেন্স চলছে।

 

বর্ষা ভেদে বৃষ্টি ফেলে পূর্ণ শরৎকাল এসে গেছে,

এখন ক্যাফে ও কিচেনে শুধু কাশফুল উড়বে।

কফি হাতে কাফকাও কম্পিউটারে আসবেন

কানন বালা, কলিম শরাফী ও বিলাবল বাজবে।

 

এমন নিশ্চুপ রাতে অন্যরকম একটা কিছু থাকেই থাকে

বহিষ্কৃত তারাদের গায়ে পাপ ও তাপ স্তরে স্তরে বসে যায়

কবির অস্থিরতায়, স্বপ্নশব্দ ও শ্রুতি অসুস্থ হয়ে পড়ে 

জ্বর আসে, পরাবাস্তব কবিতা রচনা হয় তীব্র উন্মাদনায়।

-লন্ডন 



হাওয়ার কেশর

বদরুজ্জামান আলমগীর


নিত্য অনিঃশেষ, কীভাবে চলে যাও তুমি

চলে যাওয়া কাকে বলেই বা এমন সন্তাপে

আটপৌরে বাগান বিলাসে তুমিই সঞ্চারী

কোন রূপকথার দেশে পানির কেশরে বাড়ি!


এই যে আমাদের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি

করপুটে ছেঁড়া ভাগ্যের শত অমাদীর্ণ রেখা

স্বপ্নের ভিতরে রাতের রুপালি সংহার নির্ণয়

কবে থেকে শিয়রে তুলেছো এতো বরাভয়?


আমার অক্ষয় স্মৃতির ভিতরে তুমি এসো

জড়িয়ে থাকো মালবেরির প্রতিটি দানায়

ছড়াও আমার নদী ভাঙন অন্ধ রাত্রির খামে

কার সাধ্য তোমাকে সরায় পাতাঝরা মৌসুমে?

-ফিলাডেলফিয়া


নীল ময়ূর

লায়লা ফারজানা 


অপরিচিতের মতো সে আমার পাশে দাঁড়িয়ে,

আমরা একই রাইডের জন্য অপেক্ষা করছি।


জানি না কখন দরজা খুলবে।

কখন কার পালা ...


দূরত্বই আমাদের কাছে নিয়ে এসেছিল,

অথচ এখন মধ্যবর্তী কয়েক ইঞ্চি

মনে হলো যোজনবিস্তৃত দুর্ভেদ্য প্রাচীর।


আমরা নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকি,

এ এক প্রদর্শনী,

থিম পার্কের বিশাল লাইন।

সবাই এখানেÑওয়েটিং ফর দেয়ার টার্ন।

যেন অপেক্ষাই

বেঁচে থাকা।


বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠে বুকের ওপর মাথা রেখে 

আকাশ—দেখা—হেমন্ত এসে গেছে...


নির্মম উষ্ণতায় গলে যাচ্ছে আমার হাতের আইসক্রিম।

নীল ময়ূরের পেখম হয়েছে হলুদ।


অথচ—

আমরা আর সেখানে নেই।


আমরা আর এখানে থাকি না।

—নিউইয়র্ক


ও পাতা, বান্ধব আমার

মনিজা রহমান 


ও পাতা, বান্ধব আমার, 

তোমাকে বলতে হবে, কেন যাও নিঃশব্দে ঝরে

এ কেমন স্বেচ্ছা পতন, এ কেমন নন্দিত মরণ?

যাওয়ার আগেই চলে যাওয়া ডালপালা রেখে?

ও পাতা সুহৃদ আমার, তোমারো কি ঘুমহীন রাত?

তোমারো কি বর্ণিল অসুখ? তোমারো কি ১০৪ ডিগ্রি? 

ঘটে যাওয়া বাতিল রাতে ছিঁড়ে যায় নিবিড় প্রপাত? 

ও পাতা, ও বান্ধব, ও আমার বর্ণাঢ্য সুন্দর 

বাদাম ফুলের মত বেঁচে ওঠো মাটির ভেতর। 

বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে ঝরে যায় যে সম্মিলিত পাতা 

সে পাতাই সকাল হয়ে ফিরে ফিরে আসে

ধূপখোলা মাঠে কিশোরীর ফ্রকে, বিনম্র বেণীতে। 

ও পাতা বান্ধব আমার, হেমন্তের সোনাফুল তুমি

তোমাকে যেতেই হবে জানি সব পিছুটান ধুয়ে

ঘুম ঘুম চোখে মেঘমাখা ভোর তোমার পতন দেখবে

 খালিহাতে দাঁড়িয়ে। 

ও পাতা, বান্ধব আমার, পুনর্জন্মের বাদাম ফুল

শেষবার ঝরার আগে আমাকে ডাক দিও ডাকনাম ধরে। 

—নিউইয়র্ক



ঝরা পাতার শোকার্ত সংলাপ

হোসাইন কবির


ভাবো বৃক্ষহীন পৃথিবীর কথা!

কোথাও শরৎ কিংবা হেমন্ত নেই

আছে শীতের ধূসর কুয়াশায় বরফের কোলাহল

পাতা ঝরার শোকার্ত সংলাপ


বুকপকেটে জমানো স্মৃতি

শুকনো পাতার মর্মরে কুয়াশা—ভোরে

বনপথে যেতে যেতে

অজস্র অক্ষম অক্ষরের বিলাপ

শুনেছি বহুদিন

 

জানি শীত আর হেমন্তে

বৃক্ষের সব পাতা ঝরে যাবে

তবু বসন্ত—দিনের গান গেয়ে 

আশার প্রদীপ জ্বেলে

পাতারা জাগবে বলে অপেক্ষায় থাকি 

মেঘের আকাশ যদিবা নেমে আসে

মাটির কাছাকাছি


তবু পাতা ঝরে, ঝরে যায় 

মাটির গভীরে ধূলিমাখা পুরনো কফিনে

পাতারাও শুয়ে থাকে মানুষের অবিকল

বুঝিবা একাকী ফসিল হবার বেদনায়

—নিউইয়র্ক


অনাবাদী শব্দের গান

রাকীব হাসান


বাতাসের শিসে কাঁপছে বৃষ্টির হলুদ ঠোঁট

পাতার বোটায় শেষ চুমুতে ভিজে যায় দুঃখ

বুকে মরমর শব্দে ঘর ছেড়ে যায় এক আয়ুষ্কাল

তবুও চাঁদের আলোতে মুখ তুলে আছে হরিণীর মাঠ

কে যেন ধীর শব্দে সাঁতার কেটে ভেসে আসে।


ম্যাজেন্টায় সন্ধ্যা মেখে দূরের আকাশে সূর্যাস্ত বসে আছে

এভাবে বহু জনম আঙুলে গুনে কেউ কেউ ঝরে যায় 

হেমন্তকাল কেমন অতিথির মতো হলুদের পাশে

লাল হয়ে চলে আসে, তবু সে আগন্তুক নয়Ñ

শীতকাল ধ্রুপদীর ঘরানায় আর এক দীর্ঘ বিন্যাস

তীক্ষè উত্তরের সুরে তাপমাত্রার ব্লেডে কেটে যাবে 

পাখিদের ডাক।


প্রতিবার ঝরে যাওয়ার আগে বৃষ্টি সব রঙ ঢালে 

সব ফসল তোলা হয়ে গেলে অকর্ষিত জমিনের রাজহাঁস উড়ে যায়

মাটির শাঁসের ভিতরে অনাবাদী শব্দের গান বাজেÑ

কিছু কাটুক, কেউ কাটুক হেমন্তের মাঠের সাথে 

পরানের নির্মিত কিছু আগাছা, কিছু জমানো ঘাসের স্মৃতি। 

-মন্ট্রিয়েল



অন্ধকারের উত্তরাধিকার

বেনজির শিকদার 


গগন শিরিষে ডুবে গেছে, হেমন্তের চাঁদ

মিঠে মিঠে অন্ধকারে—

বেড়ে ওঠে যাবতীয় ক্ষত—আহ্লাদ!

আয়নাতে মুখ নেই, ছায়া টলমল 

কতিপয় কারুকাজে কুয়াশার ছল;

ভাঙা ইটে পোড়া স্মৃতি, বিয়োগের জল।


ক্ষতরা ফুল হয়, ফুলেরা ক্ষত

বিষাদের বুকে জ্বলে নির্বাসন যত।

ঝরে পড়ে— 

ঝরে ঝরে পড়ে, মরে যাওয়া ঈশ্বরের পালক।

শিরীষের শেকড়ে ঘুমায় সময়ের বালক।

বিবিধ বহ্নি আর পুরাণ প্রবচনে—

ভাবি আনমনে—

হাত—মুঠে বালিঘড়ি, চোখে আদি রাত

কপালে লেখা ছিল পৃথিবী প্রপাত।


পৃথিবীর পথে পথে আলোক অবাধ 

পুড়িয়ে পুড়িয়ে শেষে অন্ধকারই সাধ;

আঁধারে আধারে মিশে থেমে যায় ঘড়ি

শূন্যতার গর্ভে বাড়ে গোপন অনুবাদ।

আমি কি আমিই, নাকি অন্য কারও লেশ?

তুমি কি তুমিই, নাকি স্মৃতির অবশেষ?

আদলে অর্ধসত্য; আহারে আবেশ!

আমাদের মাঝেখানে ভুলের বিদেশ।


গগন শিরিষে চাঁদ, দেখে যাও আজ!

হেমন্ত ডুবিয়া গেল—

অন্ধকারে জেগে আছে যাবতীয় ক্ষত—আহ্লাদ!

—নিউইয়র্ক




হেমন্ত হলুদে পার্সেফোনি

জেবুন্নেছা জোৎস্না 


ঝরে যাওয়া কার্নিভালে ভুল যতো 

তুচ্ছ সবই! রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যালে 

হেমন্ত হলুদে সাইড মিররে 

দেখেছি তোমায় পার্সেফোনি!

বৈরী হাওয়ার বিউগলে

নগ্নরোদে পাতার বসনে 

যেন জড়োসড়ো বৃক্ষের শরীর—


প্রাণের উন্মূল উড়াল দিনে 

করোটির বিস্মৃত প্লেব্যাক রিলে 

তুমি ডাকছো আমায় গ্রোথিত বাসনায়Ñ

মৃত নক্ষত্রের নেবুলা অংকুরোদগমে,

অন্ধকার পাতালে ডালিম শস্য বনে 


অস্তিত্বের শূন্যতায় যে সমুদ্র জন্মে

হলদে ফেনার ধাঁধায় তার উন্মাদনা—

সৌন্দর্যের স্ফুরিত জীয়ন জলে

তোমাকে আবক্ষ পাওয়ার প্রার্থনা

অদৃশ্য আর্কষণের নাম যদি হয় স্পর্শ


আমি দূর থেকেও তোমাকে ছুঁয়ে থাকি 

পতিত পাতার দেহাতীত শীতল আত্মায় 

হেডিসের অনুচ্চারিত আলেখ্য আঁকি

—নিউইয়র্ক


মেঘাবৃত মর্মকথা

রওশন হাসান 


পাতাগুচ্ছের বদল রঙে অসমাপ্ত কথাপুঞ্জ 

খুঁজে ফেরে বিবর্ণ সংকেত অভিধা—

প্রকৃতি দিয়েছে অথৈ রূপান্তর অঙ্গীকার 

চেনা—অচেনা পাখিদের চোখে বরাবর হিমঘোর।

ভগ্ন বাতাসে বাতায়ন কেঁপে ওঠে কখনও কখনও 

ত্রৈমাত্রিক হ্যালুসিনেশন জাগে গৃহে, চেতনায়Ñ

কে কবে ঠাহর করেছিল এ পরিচয় অসঙ্গতির

কালযজ্ঞ বোধাতীত এ বোঝাবুঝি অফুরান

মনোজগতের ভাষায় কথা বলে যে নিঃস্ব নিঝুম চাতকÑ

সেকি বারংবার যাপনহেতু খুঁজে ফেরে? 

এইসব ভারাক্রান্ত পুষ্প, নহর—নগর

ধূসর আলোকে নতুন করে দেখি এ ভূলোক।


ভালোবাসি প্রেম, মিলনান্দের মোতিহার

মনভাঙা প্রেমিক—প্রেমিকার অনিয়ম দূরত্বে ব্যথিত হই শর্তহীনÑ

প্রশ্নবিদ্ধ হই মাটি ও আকাশের ফারাকে রোদ—বৃষ্টি  কেন অনুভূতিহীন? 

মেঘের ডানায় বুঝি জমা আছে রিক্ততার অর্বাচীন চিহ্নÑঅনুরাগ

আমিও ভালোবাসি অমরত্ব, ন হন্যতে বেঁচে থাকা

ভালোবাসি ক্ষণজন্মা হাসিকান্নার আয়তনÑ

এ বিদায়ী সায়াহ্ন জানাতে বিদায়—অপহৃত এ অন্ত—যোগাযোগে

ঝাঁকে ঝাঁকে শীতল দ্রবণ যেমন বাঁধ ভেঙে আসে নৈকট্য ব্যাকুলতায়।

বলো বিদীর্ণ সময়, বলো প্রতীক্ষার ব্যবধানÑ

দুকূল পৃথকী এ পারাপারের মায়াখেলা

আজ যদি এ প্রহর হয় স্মরণক্ষরীয়

ঝরাপ্রবণ বিচ্ছেদে জ্বলবে কি তবে অগ্নির সহবত?

—নিউইয়র্ক


Related Posts