উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ঃ ম্যানসিটি ও লিভারপুলের জয় || বার্সেলোনার জালে এক হালি গোল পিএসজির
স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুই পরাশক্তির রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে বাজিমাত করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। মঙ্গলবার রাতে ঘরের মাঠ পার্ক দ্য প্রিন্সেসে লামিনে ইয়ামালের বার্সেলোনাকে ৪—২ ব্যবধানে হারিয়েছে ফরাসি জায়ান্টরা। ম্যাচে যখন ২—২ সমতা, ঠিক তখনই ৮১তম মিনিটে দৃশ্যপটে আসেন ভিতিনিয়া। বক্সের বাইরে বল বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চমৎকার এক শটে বল জালে পাঠান গত বছরের ব্যালন্ ডি'অর তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা এই পর্তুগিজ প্লেমেকার। এরপর শেষ দিকে ফ্যাবিয়ান রুইসের গোলে সহজ জয় নিশ্চিত হয় পিএসজির। এ জয়ে চলতি আসরে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিল ফরাসি ক্লাবটি। এদিন ম্যাচের শুরুতেই গোলের সুযোগ তৈরি করে পিএসজি। এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে খভিচা কাভারৎসখেলিয়ার শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। তবে শুরুতে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও ২০ মিনিটে বড় ধাক্কা খায় স্বাগতিকরা। চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয় ওসমান দেম্বেলেকে। তার বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ফেরান তোরেস। চোটের কারণে কিছুক্ষণ পর বার্সেলোনাও হারায় দানি ওলমোকে।
প্রথমার্ধের ৩৮তম মিনিটে এগিয়ে যায় পিএসজি। নিজেদের অর্ধে বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বার্সেলোনাকে বিপদে ফেলেন লামিনে ইয়ামাল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বক্সের বাইরে থেকে নিচু শটে গোল করেন ডেজিরে ডুয়ে। বিরতিতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরাই।
দ্বিতীয়ার্ধে ফিরেই ম্যাচে সমতা আনে বার্সেলোনা। ৫৫তম মিনিটে ফারমিন লোপেজের পাস ধরে বক্সে ঢুকে গোল করেন তরুণ জাভি এসপার্ট। সিনিয়র দলের হয়ে এটি তার দ্বিতীয় গোল। এরপর ম্যাচে গতি বাড়ে আরও। ৭২তম মিনিটে আবার এগিয়ে যায় পিএসজি। কর্নার থেকে আসা বলে হেড করে গোল করেন লুকাস হার্নান্দেজ। নিয়মিত বাঁ—পাশের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় নুনো মেন্দেস না থাকায় ইয়ামালকে সামলানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন হার্নান্দেজ। গোল করার কিছুক্ষণ পরই তাকে তুলে নেন কোচ লুইস এনরিকে।
তবে পিএসজির সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৭৯ মিনিটে উঁচু হয়ে আসা বল সামলাতে গিয়ে ভুল করেন বদলি হিসেবে নামা ওয়ারেন জাইরে—এমেরি। সেই সুযোগে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোল করেন ইয়ামাল। এতে ২—২ সমতায় ফেরে বার্সেলোনা। চলতি মৌসুমে এটি ইয়ামালের দশম গোল। এই গোলের মধ্য দিয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মৌসুমে ৫০ গোলের মাইলফলকও স্পর্শ করে বার্সেলোনা। ম্যাচের শেষদিকে অবশ্য আর কোনো সুযোগ দেয়নি পিএসজি। ৮১তম মিনিটে বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত শটে গোল করেন ভিতিনিয়া। পর্তুগিজ মিডফিল্ডারের গোলে ৩—২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। এরপর ৮৬তম মিনিটে কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে পিএসজির জয় নিশ্চিত করেন ফাবিয়ান রুইজ।
ম্যাচ শেষে কোচ লুইস এনরিকে ভক্তদের সমর্থন ও দলের পারফরম্যান্সে মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, ‘অসাধারণ এক পরিবেশ ছিল আজ মাঠে! আমাদের সমর্থকরা সব সময়ই অবিশ্বাস্য। আমার মনে হয় আজ দুটি দলই অসাধারণ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। আমরা প্রথমার্ধে নিখুঁত ফুটবল খেলেছি, তবে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৫ মিনিট কিছুটা চাপে ছিলাম। বার্সেলোনার মতো বড় দলের বিপক্ষে কঠিন সময় আসবেই। রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে নামা ফুটবলাররা দারুণ পারফর্ম করেছে। এ জয়টা তিন পয়েন্টের হলেও বার্সার মতো দলকে হারানো সব সময়ই বিশেষ কিছু। তবে এখানেই শেষ নয়, আমাদের এই জয়রথ বজায় রাখতে হবে।’
অন্যদিকে, চ্যাম্পিয়নস লিগে একই রাতে দেখা গেল দুই রকম গল্প। ম্যানচেস্টার সিটি জিতেছে ফিল ফোডেনের হ্যাটট্রিকে, প্রায় বিনা চাপে, ৫—১ গোলে। লিভারপুল দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে ভিয়ারিয়ালকে হারিয়েছে ৪—৩ গোলে। সেখানে নায়ক লিভারপুলের আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও ১৮ বছর বয়সী রিও এনগুমোহা।
আগে সিটির কথা। গত সপ্তাহেই ঘরের মাঠে পিএসজির কাছে ৪—২ গোলে হেরেছিল দলটি। সেই ধাক্কা কাটিয়ে জয়ে ফিরতে এনজো মারেসকার দল দল বেছে নিল এইকে এথেন্সকে।
ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যায় সিটি। গ্রীষ্মে দলে আসা এনজো ফার্নান্দেজের ফ্রি—কিক ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে বল জালে ঠেলে দেন এলিয়ট অ্যান্ডারসন। একটু পরে অ্যালানের শট আটকে যায় পোস্টে।
ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ফোডেন। রিকো লুইসের পাস থেকে দারুণ এক শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। গত সপ্তাহান্তে ডিসেম্বরের পর প্রথম গোল পেয়েছিলেন এই ইংলিশ তারকা। এবার পেলেন একসঙ্গে তিন গোল!
বিরতির পর ব্যবধান কমায় এথেন্স। লক্ষ্যে রাখা প্রথম শটেই সিটির রক্ষণ ভেদ করেন স্ট্যাভ্রোস পিলিওস। তবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায়নি সিটি। ফোডেনের পাস থেকে ট্রেডমার্ক ফিনিশিংয়ে ব্যবধান বাড়ান রায়ান শেরকি। এরপর ফোডেনের অনবদ্য এক ভলি। প্রথম স্পর্শেই বল পাঠান পোস্টের কোনায়। ১১ মিনিট পর কাছ থেকে জাল খুঁজে নিয়ে পূরণ করেন নিজের হ্যাটট্রিকও। তিন গোল করার সঙ্গে একটিতে সহায়তা, সব মিলিয়ে ইতিহাদে একেবারে ফোডেনের রাত।
অ্যানফিল্ডের ছবি ছিল একেবারে আলাদা। খেলার আধা ঘণ্টার মধ্যে ভিয়ারিয়ালের কাছে দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে বিপদে পড়ে যায় আন্দোনি ইরাওলার দল।
ব্রেন্টফোর্ডের বিপক্ষে জয়ী দল থেকে এই ম্যাচে ছয়টি পরিবর্তন এনেছিলেন ইরাওলা। আলেক্সান্দার ইসাক, ব্র্যাডলি বারকোলা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসকে রেখেছিলেন বেঞ্চে। এর মাশুল দিতে হয় শুরুতেই। রেনাতো ভেইগার লম্বা বল সামলাতে ভুল করেন অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক। আলিসনকে লক্ষ্য করে বাড়ানো তাঁর দুর্বল হেড কেড়ে নিয়ে গোল করেন জর্জেস মিকাউতাদজে। এরপর নাথান সালিবার সহজ পাস ধরে ভিয়ারিয়ালকে দ্বিতীয় গোল এনে দেন সের্হি কার্দোনা।
দুই গোল হজম করার পর ঘুম ভাঙে লিভারপুলের। ৩৬ মিনিটে কনস্তান্তিনোস সিমিকাসের কর্নার থেকে হেডে ব্যবধান কমান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। বিরতির ঠিক আগে এনগুমোহার চমৎকার চিপে পা ছুঁইয়ে সমতা ফেরান রোনাল্ড আরাউহো।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আরাউহোর জায়গায় ভির্টৎসকে নামান ইরাওলা। রায়ান গ্রাভেনবার্চকে পাঠান রাইট ব্যাক পজিশনে। এরপর মাঠে কার্যত রাজত্ব করে লিভারপুল।
কার্দোনাকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে ম্যাক অ্যালিস্টারের সামনে ফাঁকা জালের সুযোগ বানিয়ে দেন এনগুমোহা। ৩—২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় লিভারপুল। একটু পর বাঁ পায়ের ফিনিশিংয়ে ক্লাবের হয়ে প্রথম গোল পান ভির্টৎস, ৪—২।
শেষ দিকে আইওজে পেরেসের পাস থেকে তানি ওলুওয়াসেই গোল করে আশা জাগিয়েছিলেন ভিয়ারিয়ালের সমর্থকদের। শেষ রক্ষা হয়নি। ৪—৩ গোলের নাটকীয় জয়ে মাঠ ছাড়ে লিভারপুল।
