চলে গেলেন ভরতনাট্যম শিল্পী তাসিন ফেরদৌস || প্রবাসে একটি নক্ষত্রের পতন
বাঙালী প্রতিবেদনঃ তাসিন ফেরদৌসের চলে যাওয়ার খবর মুহূর্তে নিউইয়র্কের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য স্টেটে ও ক্যানাডায় ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় বাংলাদেশীদের সাগ্রহ শোক প্রকাশ এবং হৃদয়ে আঁচড় দেয়ার খবর প্রমাণ করে তিনি ছিলেন দেশের বাইরের সংস্কৃতি জগতে কতখানি গৌরবের জায়গায়। এই শোকাবহ ঘটনা আবার প্রমাণ করল যারা শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চা করেন এবং নতুন প্রজন্মের হাতে সেই সংস্কৃতির পতাকা তুলে দেয়ার নিরন্তর চেষ্টায় রত তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কতটা গভীর। মাত্র তিনদিন আগে এক অজানা ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেও তারা তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ক্রমশ বুকের ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ায় জ্যামাইকা হাসপাতালে গেলে সেখানে চিকিৎসা শুরু হয় শনিবার। ঐদিন অস্টিন থেকে চলে আসেন তার বড় ভাই ফাহিম ফেরদৌস। তাসিনের সাথে ছিলেন তার মা স্বনামধন্য কোরিওগ্রাফার ও নৃত্যশিল্পী ও বিপার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এ্যানি ফেরদৌস, বিপার নির্বাহী সদস্য তার বাবা জাফর ফেরদৌস, বিপার অপর প্রতিষ্ঠাতা সেলিমা আশরাফ, বিপার শিক্ষক নিলোফার জাহানসহ অন্য সদস্যরা। রবিবার সকাল ৮টার দিকে তাসিন ফেরদৌস চলে যান না ফেরার দেশে।
বাবা জাফর ফেরদৌস, সেলিমা আশরাফ, সাবিনা শারমিন, মিজান রহমান সাপ্তাহিক বাঙালীকে জানান, কোনো এক অজানা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত হয় তাসিন ফেরদৌসের রক্তে। কিন্তু চিকিৎসকরা আগের ২/৩ দিন তা শনাক্ত করতে পারেননি। জ্যামাইকা হাসপাতালে শনাক্ত করার সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে এই ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত শরীরে। ফলে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি (ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহে রাজেউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৩৫ বছর। তার চার বছর বয়সী একটি পুত্র রয়েছে।
তাসিন ফেরদৌস শৈশব থেকেই নাচে মায়ের কাছে প্রশিক্ষণ পেলেও তিনিই প্রথম কোনো বাংলাদেশী তরুণী, নিউইয়র্কে দক্ষিণ ভারতীয় গুরুর কাছে সরাসরি ৮ বছর ভরতনাট্যমের প্রশিক্ষণ নিয়ে দর্শকদের উপস্থিতিতে অরিঙ্গাত্রেম অর্থাৎ গ্রাজুয়েশন করেন একটানা ৩ ঘন্টা এই ধ্রুপদী নৃত্য পরিবেশন করে। এছাড়াও তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিনৃত্যনাট্য চন্ডালিকা, তাসের দেশে অংশ নিয়ে বিপুলভাবে প্রশংসিত হন। তাসিন তার মা এ্যানি ফেরদৌসের সাথেও ডুয়েট নৃত্য করেন। মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন বিপার সাধারণ সম্পাদক এবং ভরতনাট্যমের শিক্ষক।
তাসিন ফেরদৌস নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি দুটি মাস্টার্স করেন।
দেশের বাইরে এমন নক্ষত্র বিরল। এমন প্রতিভাধর ও স্বনামধন্য হওয়া সত্ত্বেও তাসিন ফেরদৌস ছিলেন স্বল্পভাষী অনেকটা নিভৃতচারী। বড়দের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ ছিল অপরিসীম। তার সমবয়সীদের কাছে ছিলেন প্রিয়জন। শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন প্রাণপ্রিয়। আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি এমন ভালোবাসা এবং নিবেদিতপ্রাণ থাকা অত্যন্ত অনুকরণীয় এবং বিরল।
বুধবার পাক ফিউনেরাল হোমে আসরের নামাজের পর তার প্রথম নামাজে জানাজা হয়। দ্বিতীয় জানাজা হয় বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পর। শুক্রবার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে সমাধীস্থ করা হয় ম্যাসপেথের মাউন্ট অলিভেট সেমিটারিতে।
