টাইমস স্কয়ারে হয়ে গেল দুর্গোৎসব

নিউইয়র্কঃ ১০ অক্টোবরের ঝলমলে রোদ আর ১১ অক্টোবরের মেঘ ভেজা বৃষ্টি, দুটি দিনের দুটি ভিন্ন রূপের মধ্যে রয়ে গেল একই অনুভূতি: মায়ের জন্য ভালোবাসা, মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন এবং দূরপ্রবাসে নিজের শিকড়কে ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

ম্যানহ্যাটানের ফাদার ডাফি স্কয়ারে ১০ ও ১১ অক্টোবর আয়োজিত এই উৎসব ছিল টাইমস স্কয়ারে দুর্গোৎসবের দ্বিতীয় আয়োজন। এর ভাবনা ছিল ‘মহামিলন ২০২৬’— বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষকে বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা। আন্তর্জাতিক পর্যটক, প্রবাসী পরিবার, শিল্পী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিতে এই পরিচিত প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল মিলনক্ষেত্র।

১০ অক্টোবর, শনিবার, ঝকঝকে রোদের নিচে দেবীবরণের আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে উৎসবস্থল। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি, পূজার আয়োজন এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মিলিয়ে টাইমস স্কয়ার পায় অন্য এক পরিচয়। প্রতিদিনের ব্যস্ত নগরজীবনের মধ্যে সেদিন জায়গা করে নেয় বাঙালির শারদীয় আবেগ। 

মহালয়া, পূজা, সংগীত, নৃত্য ও মানুষের উপস্থিতি মিলিয়ে দুদিনের আয়োজনটি হয়ে ওঠে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশের সম্মিলিত পরিসর। উৎসবের পূর্বঘোষিত কর্মসূচিতে সত্যম রায়চৌধুরীর চণ্ডীপাঠ, সুতিপা চৌধুরীর পরিচালনায় শিশু—কিশোরদের গীতাপাঠ এবং মালবিকা চ্যাটার্জির পরিচালনায় সংগীত সাধনা একাডেমির পরিবেশনার কথা ছিল। নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার এই ভাবনা আয়োজনটির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল নৃত্যাঞ্জলির ‘দশ মহাবিদ্যা’। চন্দ্রা ব্যানার্জির পরিচালনায় ষাটের অধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত এই নৃত্যানুষ্ঠানে শিল্পীদের নিষ্ঠা এবং সমবেত সাধনা মঞ্চে পূর্ণতা পায়। দেবীশক্তির দশটি স্বরূপকে নৃত্যের ভাষায় তুলে ধরে তাঁরা উপস্থিত সহস্র দর্শককে মুগ্ধ করেন।

সংগীতও প্রথম দিনের উৎসবকে দিয়েছে প্রাণ। শাহ্ মাহবুবের সুরেলা কণ্ঠ ও প্রাণবন্ত পরিবেশনায় দর্শকেরা আনন্দে উদ্বেলিত হন। তাঁর সংগীতের সঙ্গে শিল্পী মহিতোষ তালুকদার তাপসের নৃত্য যোগ করে বিশেষ মাত্রা। গান ও নাচের এই মেলবন্ধনে টাইমস স্কয়ারের উৎসবস্থল ভরে ওঠে উচ্ছ্বাসে। মানুষের সমবেত আনন্দে ব্যস্ত শহরের মধ্যেও তৈরি হয় এক আন্তরিক সাংস্কৃতিক পরিসর। মেখলা দাশগুপ্ত ও তাঁর দলের পরিবেশনা রাত দশটা পর্যন্ত দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে।

উৎসবে উত্তর আমেরিকার চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়। তাঁরা হলেন ড. মৃদুল পাঠক, অশোক রক্ষিত, মিলন আওয়ান এবং জয়প্রকাশ বিশ্বাস। অশোক রক্ষিতের হাতে সম্মাননা তুলে দেন বিশ্বজিৎ সাহা। মিলন আওয়ানের হাতে সম্মাননা তুলে দেন সংগঠনের সভাপতি শশধর হাওলাদার এবং জয়প্রকাশ বিশ্বাসের হাতে সম্মাননা তুলে দেন কোষাধ্যক্ষ সম্যব্রত দাশগুপ্ত। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন ড. কল্লোল বসু।

পরদিন, ১১ অক্টোবর, রবিবার, বদলে যায় আবহাওয়া। আগের দিনের উজ্জ্বল রোদের জায়গায় আসে বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ। কিন্তু মানুষের টান কমে না। দেবীর বিদায়ের দিনে প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে মিশে যায় বিসর্জনের বিষাদ। বৃষ্টিভেজা টাইমস স্কয়ারে উৎসবের আবেগ তখন আরও গভীর, আরও অন্তরঙ্গ।

দ্বিতীয় দিনের আয়োজনে ছিল মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলি, শান্তিজল প্রদান এবং বিসর্জনের অনুষ্ঠান। সিঁদুর খেলায় ফুটে ওঠে বিদায়বেলার পরিচিত শারদীয় রং। মায়ের বিদায় মানেই উৎসবের সমাপ্তি, অথচ সেই সমাপ্তির মধ্যেই থাকে আবার দেখা হওয়ার আকাক্সক্ষা। বৃষ্টির দিনে এই অনুভূতি যেন আরও নিবিড় হয়ে ওঠে।

প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় ছয়টি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনকে সম্মাননা প্রদানের বিশেষ অনুষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ দশক বা তার বেশি সময় ধরে দুর্গাপূজা আয়োজন এবং বাঙালি সংস্কৃতি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখা সংগঠনগুলো হলো ক্যালিফোর্নিয়ার বে এরিয়া প্রবাসী ইনক, ইলিনয়ের বেঙ্গলি এসোসিয়েশন অব গ্রেটার শিকাগো, ওহাইওর বাঙালি কালচারাল সোসাইটি, নিউইয়র্কের ইস্ট কোস্ট দুর্গা পূজা এসোসিয়েশন, নিউ জার্সির কল্লোল এবং পেনসিলভানিয়ার প্রগতি।

রবিবারের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সুদেষ্ণা সাহার একক নৃত্য এবং নৃত্যাঞ্জলির ধুনুচি নাচ উৎসবে বিশেষ মাত্রা যোগ করে। কানেকটিকাট থেকে আসা তাথৈ শিল্পীগোষ্ঠী পরিবেশন করে ‘প্রেমের বৃন্দাবন’; কোরিওগ্রাফি ও পরিচালনায় ছিলেন তানিয়া চন্দ্র। সবিতা দাসের একক সংগীতানুষ্ঠানও আয়োজনকে সমৃদ্ধ করে। বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস—বাফার নিবেদন ছিল ‘জয় মা দুর্গা’, পরিকল্পনা ও পরিচালনায় মার্জিয়া স্মৃতি। বিভিন্ন শিল্পীগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে একই মঞ্চে মিলিত হয় প্রবাসের নানা অঞ্চলের সৃজনশীল চর্চা।

বৃষ্টিস্নাত রবিবারে দিয়াসিনী রায় ও তাঁর ব্যান্ডের পরিবেশনা টাইমস স্কয়ারকে আবার প্রাণবন্ত করে তোলে। দর্শকরা গানের তালে নৃত্যে মেতে ওঠেন।

Related Posts