এআই যুগে চাকরি ছাঁটাইয়ের আড়ালে || ড. জীবন বিশ্বাস
আমেরিকার বৃহৎ সুপারমার্কেট প্রতিষ্ঠান ক্রোগার (কৎড়মবৎ) ১২ অক্টোবর ঘোষণা করেছে, আগামী তিন বছরে তারা প্রায় ৩,০০০ কর্পোরেট পদ বিলুপ্ত করবে, যা প্রায় ৮,২০০ সদস্যের কর্পোরেট কর্মীবাহিনীর আনুমানিক ৩৭ শতাংশ। তবে দোকান ও বিতরণব্যবস্থার সম্মুখসারির কর্মীরা এই ঘোষিত ছাঁটাইয়ের আওতায় পড়বেন না। প্রধান নির্বাহী গ্রেগ ফোরানের ভাষায়, প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যবস্থাপনা স্তর, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ওভারহেড বেড়ে গেছে। একই সময়ে ক্রোগার এআই (অও) ও অটোমেশনের ব্যবহারও সম্প্রসারিত করছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, এই লেঅফ বা ছাঁটাইয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে তা জিনিসপত্রের দাম কমাতে, দোকানের কর্মী, গ্রাহকসেবা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পুনর্বিনিয়োগ করা হবে। টেক—জায়ান্ট কোম্পানিগুলোও নীরবে একই কাজ করে চলছে। তাই ক্রোগারের এই বক্তব্য যেন পুরো কর্পোরেট আমেরিকাকেই প্রতিনিধিত্ব করছে। ছাঁটাইয়ের এই ধারা নিয়েই আজকের উপসম্পাদকীয়।
ক্রোগারের ঘোষণার আসল তাৎপর্য এই নয় যে কোনো যন্ত্র সরাসরি ৩,০০০ মানুষের চেয়ার দখল করতে যাচ্ছে। আরও গভীর সম্ভাবনাটি অনেক সূক্ষ¥। এআই হয়তো প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করতে সাহায্য করছে, যেখানে তথ্য সমন্বয়, প্রতিবেদন তৈরি, সিদ্ধান্ত এক স্তর থেকে আরেক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং ওয়ার্কফ্লো তদারকের জন্য আগের মতো এত মানুষের প্রয়োজন হচ্ছে না। ২০২৬ সালের কর্পোরেট কর্মীসংকোচন বোঝার জন্য এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চ্যালেঞ্জার, গ্রে অ্যান্ড ক্রিসমাস (ঈযধষষবহমবৎ, এৎধু ্ ঈযৎরংঃসধং)—এর হিসাবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ১৬৫,৯২৫টি চাকরি বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক চিত্র প্রায় বিপরীত। সব শিল্প মিলিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘোষিত চাকরি হ্রাস ৫৭৩,১৯৫, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ শতাংশ কম। অর্থাৎ প্রযুক্তি খাত কোনো সর্বব্যাপী কর্মসংস্থান—ধসের প্রতিচ্ছবি নয় বরং তার নিজের ভেতরেই তুলনামূলকভাবে তীব্র এক পুনর্গঠন ঘটছে।
অন্যান্য কোম্পানির ঘটনাগুলোও এই জটিলতাই তুলে ধরে। ওরাকল (ঙৎধপষব)—এর ২০২৬ অর্থবছর শেষে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার, যা আগের বছর ছিল প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ২১ হাজার বা ১৩ শতাংশ কর্মী কমেছে। কিন্তু এই পুরো সংখ্যাকে একবারে সংঘটিত ২১ হাজার জনের ‘এআই ছাঁটাই’ বলা ভুল হবে। ওরাকলের এসইসি ফাইলিং (ঝঊঈ ভরষরহম)—এ পুনর্গঠন ও সেভারেন্স ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু ছাঁটাইয়ের মধ্যে আরও বিস্তৃত সাংগঠনিক পরিবর্তনও রয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ক্লাউড এবং এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার সম্প্রসারণে বিপুল বিনিয়োগ করছে।
আমাজনের ছবিটিও একইভাবে বহুস্তরীয়। জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটি ১৬ হাজার কর্পোরেট চাকরি বিলুপ্তির বিষয় নিশ্চিত করেÑযা আগের বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া মোট প্রায় ৩০ হাজার পদের বৃহত্তর কর্মীসংকোচন কর্মসূচির অংশ। অক্টোবরের আরেকটি পুনর্গঠনে স্টোর ডিভিসন—কেন্দ্রিক এক হাজারের মত হোয়াইট—কলার চাকরি ছাঁটাই করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সিইও এন্ডি জেসি আগেই বলেছিলেন, জেনারেটিভ এআই ও অটোমেটেড এজেন্টস কিছু রুটিন কাজ গ্রহণ করায় ভবিষ্যতে আমাজনের কর্পোরেট ওয়ার্কফোর্স কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি প্যান্ডেমিকের সময় অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ, আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়িক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনকেও কর্মীসংকোচনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে এআই ও ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের চাহিদা মেটাতে ২০২৬ সালের সম্ভাব্য ক্যাপিটাল ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলার করেছে আমাজন।
মাইক্রোসফট কর্পোরেশন এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে তীক্ষè উদাহরণ। জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪,৮০০ চাকরি বিলুপ্তির ঘোষণা দেয় যা বিশ্বব্যাপী কর্মীর প্রায় ২.১ শতাংশ। এর মধ্যে শুধুমাত্র এক্সবক্স পুনর্গঠনের আওতায় পড়ে প্রায় ৩,২০০ পদ। অথচ ২০২৬ অর্থবছরেই মাইক্রোসফট প্রপার্টি এবং ইকুইপমেন্ট সংযোজনে প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেÑযার বড় অংশই ক্লাউড ও এআই ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। অক্টোবর নাগাদ প্রতিষ্ঠানটি ১৭৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্যাপিটাল ব্যয়ের কথা বলছে এবং নিজস্ব এআই চিপের (অও পযরঢ়) বিশাল ব্যয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই ব্যালান্সশিটে তাই পে—রোল সংকোচন ও কম্পিউটেশনাল ক্যাপাসিটির বিস্ফোরক সম্প্রসারণ পাশাপাশি চলছে।
লেঅফ শব্দটির অর্থও ক্রমে কম স্বচ্ছ হয়ে উঠছে। আধুনিক পুনর্গঠনজনিত কর্মী ছাঁটাই ঘটতে পারে ছোট ছোট কর্মীদল হ্রাস, নিয়োগ স্থগিতকরণ, ঠিকাদারদের চুক্তি নবায়ন না করা, স্বেচ্ছায় প্রস্থান অথবা কর্মদক্ষতা—ভিত্তিক ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে। এগুলোকে কখনো ‘নীরব ছাঁটাই’ বলা হচ্ছে, কিন্তু শ্রমবাজারের কোনো স্বীকৃত পরিসংখ্যানগত শ্রেণি এগুলো নয়। বরং এর তাৎপর্য অন্যত্র; একটি সাংগঠনিক স্তর যদি একদিনে নাটকীয়ভাবে বিলুপ্ত না হয়ে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়, তবে তার সামগ্রিক অভিঘাত কর্মী, সাংবাদিক কিংবা নীতিনির্ধারকের চোখে একই সময়ে ধরা পড়া অনেক কঠিন। কর্পোরেট আমেরিকা, বিশেষ করে টেক—জায়ান্টগুলো এই নীরব ছাঁটাই করে চলেছে নিয়মিতভাবে।
যে প্রবণতাটি ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো, এআই—এর তাৎক্ষণিক শ্রমবাজারগত প্রভাব সম্ভবত পেশার বিলুপ্তি নয়, টাস্ক এবসর্পশন জেনারেটিভ সিস্টেম এখন নথি সংক্ষিপ্ত করতে পারে, প্রাথমিক প্রতিবেদন লিখতে পারে, প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে পারে, কোড জেনারেট করতে পারে, গ্রাহকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ সামলাতে পারে, তথ্য বিন্যস্ত করতে পারে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে সহায়তা করতে পারে। একজন পেশাজীবী যদি এখন এমন কয়েকটি কাজ একাই করতে পারেন, যেগুলো আগে কয়েকজনের মধ্যে ভাগ হয়ে ছিল, তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মীর জায়গায় একটি এলগোরিদম বসানো কোম্পানির প্রয়োজনই নাও হতে পারে। তারা হয়তো শুধু শূন্য পদটি আর পূরণ করবে না, দুটি দায়িত্ব একত্র করবে, অথবা একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা স্তর সরিয়ে দেবে।
গবেষণাও ক্রমে এই সূক্ষ¥ ব্যাখ্যাকে সমর্থন করছে। স্ট্যানফোর্ড ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাব এখনও সমগ্র অর্থনীতিজুড়ে ব্যাপক এআই সম্পর্কিত কর্মসংস্থান বিলুপ্তির প্রমাণ পায়নি। কিন্তু উৎপাদকধর্মী এআই—এর প্রভাবযুক্ত পেশায় ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী কর্মীদের কর্মসংস্থানের গতিপথ তুলনামূলকভাবে কম উন্মুক্ত সমবয়সীদের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল। ৪১টি দেশের ওপর আরেকটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এআই ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মীদের দিকে কর্মীবিন্যাস সরাচ্ছে এবং নবীন পদের অনুপাত কমছে। ফলে সতর্কবার্তাটি শুধু আজকের চাকরি নিয়ে নয়, আগামী দিনের পেশাগত সিঁড়ি নিয়েও।
এখানেই কর্পোরেট স্তর—সংকোচন কেবল দক্ষতার প্রশ্ন না থেকে সামাজিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে। মধ্যস্তরের ব্যবস্থাপক, নবীন বিশ্লেষক কিংবা সমন্বয়—নির্ভর পেশাজীবীরা শুধু তথ্য এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে পাঠান না। তাঁরা নতুন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেন, প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতার স্মৃতি বহন করেন, অস্পষ্ট পরিস্থিতির অর্থ উদ্ধার করেন এবং যে সিঁড়ি বেয়ে অনভিজ্ঞ কর্মী একদিন অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন, সেই সিঁড়িটিও নির্মাণ করেন। কর্পোরেট ভবনের মাঝের তলাগুলো যদি অতিরিক্ত দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়, একসময় হয়তো জ্যেষ্ঠ দক্ষতার দিকে ওঠার লিফটের থামার মতো মাঝপথই আর থাকবে না।
আমেরিকার বর্তমান সামগ্রিক শ্রমবাজারও তেমন কোনো ব্যাপক কর্মসংস্থান—ধসের ছবি দিচ্ছে না। সেপ্টেম্বরে বেকারত্বের হার ছিল ৪.২ শতাংশ। আগস্টে শূন্যপদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭১ লাখ, নতুন নিয়োগ প্রায় ৫২ লাখ এবং চাকরিচ্যুতি ও পদবিলুপ্তির সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে কৃষিবহির্ভূত শ্রম উৎপাদনশীলতা এক বছর আগের তুলনায় ২.২ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতি প্রযুক্তি খাতের ছাঁটাই—সংবাদে যে ছবি দেখা যায়, তার তুলনায় অনেক বেশি মিশ্র সংকেত দিচ্ছে।
তাই সমাজের সামনে প্রশ্নটি এআই ‘চাকরি ছাঁটাই করে কিনা’—তার চেয়েও বড়। আগের স্বয়ংক্রিয়তার ঢেউ প্রধানত উৎপাদনকে বদলেছিল; উৎপাদকধর্মী এআই এখন প্রবেশ করছে ভাষা, বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, প্রশাসন ও সমন্বয়ের জগতেÑঅর্থাৎ আধুনিক পেশাজীবী কাজের বৌদ্ধিক অবকাঠামোয়। সম্ভবত এই পরিবর্তনের সবচেয়ে যথার্থ প্রতীক হয়ে উঠবে সেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কর্পোরেটের মধ্যতলা।
কম সাংগঠনিক স্তর দিয়ে যদি কোনো প্রতিষ্ঠান আরও বেশি উৎপাদন বা সেবা দিতে পারে, তার অর্থনৈতিক সুফল উল্লেখযোগ্য হতে পারে। কিন্তু দক্ষতা একা বলতে পারে না সেই সুফল কার হাতে যাবে, ঝুঁকি কে বহন করবে, তরুণ কর্মীরা কোথায় অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, কিংবা যাঁদের দক্ষতা এখনও মূল্যবান অথচ সাংগঠনিক পদটি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছেÑতাঁদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের দায় কতটুকু।
এআই যুগের সবচেয়ে গভীর রূপান্তর হয়তো শেষ পর্যন্ত এই নয় যে যন্ত্র মানুষের কাজ শিখছে। বরং আশংকাজনকভাবে আরও মৌলিক পরিবর্তনটি হতে পারেÑপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের এমনভাবে কল্পনা করতে শিখছে, যেখানে কৌশল নির্ধারণকারী মানুষের সঙ্গে সেই কৌশল বাস্তবায়নকারী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মাঝখানে আগের তুলনায় অনেক কম মানুষের প্রয়োজন। বিষয়টি সার্বিকভাবে রাষ্ট্র, প্রযুক্তিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীদের নজরে যত তাড়াতাড়ি আসে, ততই ভালো।
