রবীন্দ্রনাথের আলো
গত সপ্তাহের সম্পাদকীয় কলামে লেখা হয়েছিল, পরমপ্রিয় সুহৃদ এবং অনিবার্য, চিরায়ত ব্যক্তিকে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে শত্রুরা। তবে সব শত্রু নয়। কিছু শত্রু আছে অতি চতুর, তারা নিরবে কৌশল নির্ধারণ করে, আর আহাম্মক শত্রুরা তাতে আঁচড় দেয়। আঁচড়ের মাধ্যমে জানান দেয় জাতির অহংকার ঐ গুরুত্বপূর্ণ, মহান ব্যক্তি তাদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। অর্থাৎ তারা যে সংকীর্ণ গন্ডির ভেতর নানা কুসংস্কার ও কূপমণ্ডুকতা নিয়ে বাস করে জানালা—দরজাহীন প্রকোষ্ঠে, যেখানে ছিঁটে—ফোটাও আলোর প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেখানে এত বড় মাপের মানুষ অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই মানুষগুলো মহানকে ভয় করে, প্রগতিশীলতাকে ভয় করে, মানুষের এগিয়ে যাওয়াকে ভয় করে। এক কথায় তারা আধুনিকতাকে ভয় করে। তা হয়ত তারা করতে পারে। করতে পারে মনে মনে। তাদের মনে করার অধিকার আছে। কিন্তু তারা অন্যের চিন্তায়, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে বোঝাতে চেষ্টা করে, তারা যা চাইবে তা হতে হবে, সবাইকে মানতে হবে, বিপত্তি সেখানেই। নিশ্চয়, সৎ হওয়ার জন্য, ন্যায়ের পথে থাকার জন্য, সুন্দরের আরাধনা করার জন্য গুরুজন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং পথ প্রদর্শকরা বলতেই পারেন। কেউ অসৎ হলে, অন্যের ক্ষতি করলে প্রকৃতির এবং দেশের আইনে তাকে বিচার করে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু সততার জন্য কারো বিচার হয় না।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের কত বড় সম্পদ তা নতুন করে বলা অপ্রয়োজনীয়। বাংলাদেশে এখনো যেসব মহান লেখক—শিল্পীর কারণে বিপুল সংখ্যক মানুষ উদার, মানবিক, প্রেমময়, অসাম্প্রদায়িক ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত তাদের অন্যতম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, নূরলদীন, চন্ডীদাস, মাইকেল মধুসূদন, আব্বাসউদ্দিন, জয়নুল, আরজ আলী, সত্যজিত, ঋত্বিক, জগদীশচন্দ্র। এর বাইরেও আরো অনেকে আছেন। বাংলার মাটিতে তাদের জন্ম না হলে এ মাটি যেমন এমন নরম ও উর্বর হতো না, তেমনই এই মাটির সন্তানরা এত প্রতিবাদীও হতো না। তারা বারবার নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের বুকের রক্ত ঢালত না। অকাতরে প্রাণ দিত না স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য।
সেই চতুর্দশ শতাব্দীতে বাঙালি কবি চন্ডীদাস লিখেছিলেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। নূরলদীন ডাক দিয়েছিলেন ‘শোনো বাহে, কুনঠে সবাই’, আবদুল হাকিম লিখেছিলেন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,/সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’, লালনের ‘এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু—মুসলমান বৌদ্ধ খৃস্টান, জাতি গোত্র নাহি রবে’, রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘এই কথাটি ধরে রাখিস, মুক্তি তোকে পেতেই হবে’, নজরুলও বলছেন ‘গাহি সাম্যের গানÑমানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’, ‘মাইকেল মধুসূদন লিখেছিলেন, ‘ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি, এ ভিখারী—দশা তবে কেন তোর আজি?’। এই রকম অজ¯্র উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। এমন কি শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, সৈয়দ শামসুল হক থেকে রুদ্র মুহামমদ শহীদুল্লাহ পর্যন্ত। আমরা সকলেই তাদের লিগেসি, তাদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি। এদেশে বঙ্গবন্ধুর মত নেতা জন্ম নিয়েছিলেন বলে আমরা আধুনিক জাতি হতে পেরেছি। তিনি একটি রাষ্ট্র, একটি পতাকা, এটি সংগীত দিয়েছিলেন। অথচ মাঝে মাঝে কিছু মানুষ এমন আচরণ করে যে মনে হয় আমরা অন্ধকারে তলিয়ে গেলাম। প্রকৃতপক্ষে তারা অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে চায়, কিন্তু মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়ায় এইসব মহান ব্যক্তিদের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে।
১৯৬১ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলছে। যারা নিষিদ্ধ করতে চেয়েছে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসেরই বিচারে। মাঝে মাঝে এই পায়ঁতারা শুরু হয়। বৃটিশদের গৌরব উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, ফরাসিদের ভিক্টর হুগো, জার্মানদের জোহান ফন গ্যাটে, স্প্যানিশদের ফেদেরিকা গারসিয়া লোরকা, আমাদেরও তেমন রবীন্দ্রনাথ—নজরুল। বাংলাদেশে শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে ব্রেখটের নাটক মঞ্চস্থ হয় অকাতরে। কেউ বাধা দেয় না। তাদের পড়ানোও হয়, চর্চাও হয়। অথচ যত রাগ রবীন্দ্রনাথের ওপর। কেন?
খুব সহজ। রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম অনুপ্রেরণা, মানবতাবাদের মূলমন্ত্র। যারা তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে তারা নিজেদেরই চেনে না। নিজেদের চেনে না বলে রবীন্দ্রনাথকেও চেনে না। মহান মানুষদের চেনে না। তারা মানুষের যে ‘মহত্ব’ তাও বোঝে না। প্রকৃতপক্ষে, ওরা সংস্কৃতি বোঝে না। সংস্কৃতির মূল সত্য হচ্ছে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হচ্ছে সুকুমার বৃত্তি ও প্রবৃত্তিকে ভালোবাসা। কারো সৃষ্টিকে পছন্দ না হলে কোনো জবরদস্তি সংস্কৃতি অনুমোদন করে না। যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, যার নানাবিধ লেখা এবং সার্বিক লেখালেখির সমতুল্য পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়জন নেই। পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীরা তাকে প্রাচ্যের দার্শনিক বলে মনে করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, উন্নত ও অনুন্নত, তার আবক্ষ এবং পূর্ণাবয়ব ভাস্কর্য ও মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে সেসব দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরের ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ লোকেশনে।
অথচ আমাদের দেশের কতিপয় অর্বাচীন, অকৃতজ্ঞ, কূপমণ্ডুক তাকে নিষিদ্ধ করতে চায়, অপদস্থ করতে চায়। এই অর্বাচীনরা জানে না কোনো কোনো মানুষকে নিষিদ্ধ করা যায় না, অপদস্থ করা যায় না। তাদের কর্মযোগ এতটাই গৌরবের যে সেই কর্মযোগের গায়ে কালিমা লেপন করা যায় না। কবি আবদুল হাসিম এদের উদ্দেশ্য করেই এত বছর আগে লিখেছিলেন, ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী,/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হল, এইসব অর্বাচীনদের পিছনে উস্কানিদাতা হিসাবে আছেন কতিপয়, হ্যাঁ অবশ্যই কতিপয় ‘উচ্চ’ শিক্ষিত ব্যক্তি। তারা সব জেনেও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অনর্গল মিথ্যা বলে (কোনো প্রমাণ ছাড়া) অশিক্ষিত, সিকি—শিক্ষিত তরুণদের বিভ্রান্ত করে চলেছে। (সিকি—শিক্ষিত বা তার চেয়েও কম, কারণ তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানের নামও জানে না)। ঐ তরুণীর কাছে (যে রবীন্দ্রনাথের মুখ কালি দিয়ে ঢেকে দিতে চেয়েছিল) সবচেয়ে লজ্জাজনক হলো, একটা রিকশাচালক পরে পানি এনে সেই কালি তুলে ফেলে। রিকশাচালককে অনেকে ব্রাত্য মনে করেন, কিন্তু তিনি প্রমাণ করলেন তার চেতনায়ও রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সত্যিই বাঙালি হিসাবে আমরা গর্বিত, এত মানবতাবাদী প্রতিভা আমাদের রয়েছে। দেশের যে রাজনীতিকরা অপরাজনীতি দিয়ে এই সব সত্যকে ঢেকে দেয়ার অপচেষ্টাকারীদের পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করেছে, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, তোমাদের উদ্দেশ্য কোনোদিন সফল হবে না। কারণ রবীন্দ্রনাথ একজন মানবতাবাদী প্রতিভা। তাকে এক ফুৎকারে নেভানো সম্ভব নয়। তার আলো কোটি কোটি মানুষকে প্রতিদিন আলোকিত করে চলেছে।
